ময়মনসিংহের ঐতিহাসিক এস কে হাসপাতালের গৌরবময় ইতিহাস
ময়মনসিংহের এস কে হাসপাতালের ইতিহাস ও অবদান

ময়মনসিংহ অঞ্চলের চিকিৎসাসেবার ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলো এস কে হাসপাতাল বা সূর্যকান্ত হাসপাতাল। এর নান্দনিক স্থাপত্যশিল্পের ছোঁয়ায় নির্মিত দালানগুলো চোখে লেগে থাকার পাশাপাশি পৌরাণিক কালের অমলিন এক ইতিহাস মনে করিয়ে দেয়।

হাসপাতালের পটভূমি ও নির্মাণ

এই হাসপাতালের পেছনে জড়িয়ে আছে মুক্তাগাছার জমিদার শশীকান্তসহ অন্য রাজাদের অনন্য অবদান এবং ব্রিটিশ ভারতের সুনিপুণ স্থাপত্যকীর্তি। এটি এস কে হাসপাতাল নামেই অঞ্চলজুড়ে বেশি পরিচিত। হাসপাতালের প্রকল্পটি স্থাপিত হয় ১৭ বিঘা ১২ কাঠা ৬ ছটাক জমির ওপর। ১৯১৫ খ্রিষ্টাব্দে হাসপাতালের ভবন নির্মাণকাজ শুরু হয় এবং ১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দে নির্মাণ সমাপ্ত হয়। স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, রাজা–জমিদার, জেলা প্রশাসন, জেলা বোর্ড, পৌরসভা ও ইউরোপীয় সাহেবদের অর্থ ও বদান্যতায় সেবামূলক এ প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে।

নামকরণ ও ওয়ার্ড নির্মাণ

এর আগে ১৯০৮ খ্রিষ্টাব্দে সূর্যকান্ত মারা যান। তাঁর স্মরণে ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দে হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা পর্ষদ এই হাসপাতালের নাম রাখে ‘সূর্যকান্ত হাসপাতাল’। একে একে শুরু হয় দানপর্ব আর গড়ে ওঠে বিভিন্ন ওয়ার্ড। ঐতিহাসিক ব্যক্তিদের নামে নামকরণ করা হয় ওয়ার্ডগুলো—বিদ্যাময়ী ওয়ার্ড, দীনমনি ওয়ার্ড, সতিশ আউটডোর ও ডিসপেনসারি, ধরনীকান্ত ওয়ার্ড, আলেকজান্ডার ম্যাকেঞ্জি আই ওয়ার্ড, চন্দ্রকান্ত তর্কালঙ্কার ওয়ার্ড ইত্যাদি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অর্থসংস্থান ও সম্প্রসারণ

সে সময় সরকারি অনুদান ও বিভিন্ন মনীষীর কাছ থেকে পাওয়া সর্বমোট অর্থের পরিমাণ ছিল ২,১২,০০০ (দুই লাখ বারো হাজার) টাকা, যা হাসপাতালের নির্মাণকাজসহ সামগ্রিক উন্নয়নে ব্যয় করা হয়। ১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দে চালু হয় লিটন মেডিকেল স্কুল, যার ফলে হাসপাতালও বর্ধিত করতে হয়। সময়ের প্রয়োজনে ও জনস্বার্থে চিকিৎসক, নার্স, কর্মচারী, ওষুধপথ্য এবং যন্ত্রপাতি আরও ব্যাপক হারে বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে, যার ফলে বাধ্য হয়ে ১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দে ময়মনসিংহের চরপাড়ায় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল চালু করা হয়। তবে এই ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের পূর্ববর্তী তথা বৃহত্তর ময়মনসিংহের জন্য অমলিন এক ইতিহাস হিসেবে একমাত্র এস কে হাসপাতালই বিদ্যমান ছিল।

চিকিৎসাসেবা ও কালাজ্বর গবেষণাকেন্দ্র

১৯৬০ থেকে ১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দের তৎকালীন এক রিপোর্ট অনুযায়ী, আবাসিক ৩৭,৩৫৭ জন ও অনাবাসিক ৩,৪৬,৯৬৮ জন রোগী চিকিৎসাসুবিধা পেয়েছিল। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে এই হাসপাতালেই প্রথম কালাজ্বর গবেষণাকেন্দ্র স্থাপন করা হয়। ২০১২ সালের ২ ডিসেম্বর তৎকালীন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ক্যাপ্টেন (অব.) মজিবুর রহমান ফকির এটি উদ্বোধন করেন, যার নাম করা হয় সূর্যকান্ত কালাজ্বর গবেষণাকেন্দ্র। এটি বাংলাদেশ থেকে কালাজ্বর নির্মূলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

বর্তমান অবস্থা

বর্তমান সময়ে এস কে হাসপাতাল সেবা দিয়ে যাচ্ছে যথাক্রমে ডায়রিয়া, টি বি, টিটেনাস, বসন্ত ও ডিপথেরিয়া রোগের জন্য। তবে এ হাসপাতাল মূল হাসপাতালের অঙ্গীভূত একটি প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে এটি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অধীনে একটি সংক্রামক ব্যাধি ইউনিট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। যদিও মূল ভবনটি অনেক পুরোনো হয়ে গেছে, তবু ঐতিহাসিক মূল্যের কারণে এটি শহরের অন্যতম ‘হেরিটেজ’ বা ঐতিহ্যবাহী নিদর্শন হিসেবে স্বগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে।