রাজধানীর একটি স্বনামধন্য ও সেবামূলক হাসপাতালে একসঙ্গে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনা নিঃসন্দেহে হৃদয়বিদারক এবং গভীর উদ্বেগের বিষয়। এটি কেবল একটি হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ দুর্ঘটনার খবর নয়, বরং আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার নিরাপত্তা, জবাবদিহি এবং মানবিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। যে স্থান মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা, সেখানে সদ্য পৃথিবীর আলো দেখা কয়েকটি প্রাণের এমন অস্বাভাবিক মৃত্যু কোনোভাবেই সাধারণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না।
একটি শিশুর জন্ম শুধু একটি পরিবারের নয়, একটি সমাজেরও আনন্দের উপলক্ষ। দীর্ঘ প্রতীক্ষা, স্বপ্ন ও প্রত্যাশা ঘিরে পরিবারের মানুষ নতুন অতিথিকে বরণ করে নেওয়ার প্রস্তুতি নেন। অথচ যে পরিবারগুলো সন্তানের মুখে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছিল, তাদেরই কেউ হাসপাতাল থেকে ফিরেছেন অপার শূন্যতা বুকে নিয়ে। সন্তানকে কোলে করে ঘরে ফেরার পরিবর্তে কবরস্থানে পৌঁছে দেওয়ার এই নির্মম বাস্তবতা ভাষায় প্রকাশের অতীত। এ শোক ব্যক্তিগত হলেও এর অভিঘাত সামাজিক। কারণ, এমন ঘটনা মানুষের নিরাপত্তাবোধ ও আস্থার ভিত্তিকেই নাড়িয়ে দেয়।
ঘটনার পর প্রাথমিকভাবে এসি বা গ্যাস লিকেজের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। তবে এ পর্যায়ে কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যেমন সমীচীন নয়, তেমনই সম্ভাব্য কারণগুলোকে হালকাভাবে দেখারও সুযোগ নেই। যদি টেকনিক্যাল ত্রুটি হয়ে থাকে, তাহলে প্রশ্ন উঠবে— এ ধরনের ঝুঁকি প্রতিরোধে নিয়মিত তদারকি, যন্ত্রপাতির নিরাপত্তা পরীক্ষা এবং ঝুঁকি মূল্যায়ন কতটা কার্যকর ছিল? বিশেষত নবজাতক ও সংকটাপন্ন রোগীদের ওয়ার্ডে পরিবেশগত নিরাপত্তা, গ্যাসলাইন, বিদ্যুৎ ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিশ্চিতে সর্বোচ্চ সতর্কতা থাকা উচিত। সেখানে সামান্য অবহেলাও ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। এ কারণেই এই ঘটনাকে নিছক ‘দুর্ভাগ্যজনক দুর্ঘটনা’ হিসেবে ব্যাখ্যা দিয়ে দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।
একটি হাসপাতালের ভেতরে একসঙ্গে ছয় নবজাতকের মৃত্যু ঘটলে তা কেবল ঘটনার কারণ অনুসন্ধানের বিষয় নয়; বরং এর পেছনে কোনও কাঠামোগত দুর্বলতা, দায়িত্বে অবহেলা, তদারকির ঘাটতি কিংবা নিরাপত্তা ব্যবস্থার ব্যর্থতা ছিল কি না, তা গভীরভাবে অনুসন্ধান করা জরুরি। এ ঘটনায় স্বভাবতই তদন্তের কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় বহু ক্ষেত্রেই তদন্ত কমিটি গঠন হয়, রিপোর্ট জমা পড়ে, অথচ প্রকৃত দায় নির্ধারণ বা কার্যকর জবাবদিহি দৃশ্যমান হয় না। ফলে এই ঘটনায় কেবল আনুষ্ঠানিক বা নামকাওয়াস্তে তদন্ত জনমনে গ্রহণযোগ্য হবে না। প্রয়োজন একটি শক্তিশালী, নিরপেক্ষ ও বহুমাত্রিক তদন্ত, যেখানে চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি হাসপাতাল নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ, বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার, মেকানিক্যাল ও ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার এবং স্বাধীন পর্যবেক্ষকদের সম্পৃক্ত করা হবে। তদন্তে শুধু মৃত্যুর তাৎক্ষণিক কারণ নয়, বরং প্রতিরোধযোগ্য কোনও ব্যর্থতা ছিল কিনা— সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় আনতে হবে।
তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতে যদি কর্তব্যে অবহেলা, গাফিলতি বা নিরাপত্তা মান রক্ষায় ব্যর্থতার প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এমন ঘটনায় কেবল শোক প্রকাশ বা প্রশাসনিক ব্যাখ্যা যথেষ্ট নয়। কারণ, একটি হাসপাতালের দায়িত্ব শুধু চিকিৎসা দেওয়া নয়— রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও তার মৌলিক দায়িত্ব। একইসঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর প্রতি রাষ্ট্র ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দায় রয়েছে। ক্ষতিপূরণ এখানে কেবল আর্থিক সহায়তার বিষয় নয়— এটি একটি স্বীকৃতি যে, একটি অপূরণীয় ক্ষতি ঘটেছে এবং সেই ক্ষতির দায় সমাজ ও প্রতিষ্ঠান এড়িয়ে যেতে পারে না। পরিবারগুলোর জন্য উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ, মানসিক সহায়তা এবং প্রয়োজনীয় কাউন্সেলিং নিশ্চিত করা জরুরি।
এখানে আরেকটি বাস্তবতা বিশেষভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। আদ-দ্বীন হাসপাতাল দীর্ঘদিন ধরে একটি সেবামূলক ও অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করেছে। তুলনামূলক কম ব্যয়ে চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ থাকায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ভিড়ও সেখানে বেশি। ফলে এমন হাসপাতালে রোগীর চাপ, অবকাঠামোর ব্যবহার এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা আরও বেশি সংবেদনশীলতার সঙ্গে পরিচালিত হওয়া প্রয়োজন। জনসমাগম বেশি, এই বাস্তবতা মাথায় রেখে নিয়মিত প্রযুক্তিগত নিরীক্ষা, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং জরুরি প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থার মান আরও শক্তিশালী হওয়া উচিত।
এই ঘটনার তদন্ত শেষ হওয়ার পর দায়িত্ব শেষ হয়ে যাবে— এমন ভাবা ঠিক হবে না। বরং তদন্তের সুস্পষ্ট ফলাফলের ভিত্তিতে সরকারকে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোর জন্য বাধ্যতামূলক নিরাপত্তা নির্দেশিকা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষত নবজাতক ইউনিট, নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ), গ্যাস ও অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং জরুরি ঝুঁকি মোকাবিলা প্রটোকল বিষয়ে নিয়মিত নিরাপত্তা অডিট বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। একইসঙ্গে হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় একটি প্রতিরোধমূলক নিরাপত্তা সংস্কৃতি গড়ে তোলাও সময়ের দাবি।
এই ট্র্যাজেডিকে যদি কেবল একটি ‘দুর্ঘটনা’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে সময়ের সঙ্গে চাপা দেওয়া হয়, তবে তা হবে ভবিষ্যতের আরও বিপদের বীজ বপন। বরং এটিকে একটি সতর্কসংকেত হিসেবে নিয়ে স্বাস্থ্য খাতের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা চিহ্নিত করা, কার্যকর সংস্কার করা এবং কঠোর জবাবদিহি নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রধান অগ্রাধিকার।
লেখক: মানবাধিকার কর্মী



