রুসলান হোসেনের ফিটনেস যাত্রা: শূন্য থেকে বাংলাদেশের ফিটনেস ইন্ডাস্ট্রি গড়ার গল্প
তরুণ ও নবীন পেশাজীবীদের জন্য ক্যারিয়ার গঠনে বইয়ের শিক্ষার চেয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া দিকনির্দেশনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রয়োজনীয়তা মাথায় রেখে প্রথম আলো ডটকম ও প্রাইম ব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে বিশেষ পডকাস্ট শো লিগ্যাসি উইথ এমআরএইচ: সিজন-২ আয়োজন করা হয়েছে। এই শোতে সফল তরুণদের স্বপ্ন, শেখার অভিজ্ঞতা ও ভুল থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প তুলে ধরা হচ্ছে। দ্বাদশতম পর্বে অতিথি হিসেবে অংশ নিয়েছেন রুসলানস স্টুডিওর প্রতিষ্ঠাতা রুসলান হোসেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ রিদওয়ানুল হকের সঞ্চালনায় এই পর্বে আলোচনার বিষয় ছিল ডিসিপ্লিন, ট্রান্সফরমেশন এবং শূন্য থেকে বাংলাদেশের ফিটনেস ইন্ডাস্ট্রি গড়ার গল্পে রুসলান হোসেন।
শৈশবের অভিজ্ঞতা ও ফিটনেস যাত্রার শুরু
রুসলান হোসেন শৈশবে জাংক ফুডের প্রতি প্রবল ঝোঁক রাখতেন, যার ফলে তাঁর ওজন স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি ছিল। পডকাস্টের শুরুতেই সঞ্চালক জানতে চান, কীভাবে তিনি এই অভ্যাস থেকে বেরিয়ে ফিটনেসের দিকে ঝুঁকলেন? উত্তরে রুসলান বলেন, যখন আমি স্কুলে পড়তাম, তখন বেশ ওভারওয়েট ছিলাম। বন্ধুরা আমাকে নিয়ে মজা করত, যা আমাকে লুকের গুরুত্ব সম্পর্কে ভাবতে বাধ্য করে। এছাড়া, আমি ফিট ছিলাম না এবং আমার মা আমার ফিটনেস নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এই দুই বিষয় আমাকে পরিবর্তনের দিকে ঠেলে দেয় এবং সেখান থেকেই আমার ফিটনেস যাত্রা শুরু হয়।
ফিটনেসের সংজ্ঞা ও ব্যক্তিগত ট্রান্সফরমেশন
ফিটনেসের সংজ্ঞা সম্পর্কে রুসলান হোসেন বলেন, আমার কাছে ফিটনেস মানে শুধু পেশিবহুল শরীর নয়, বরং এটি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে টিকে থাকার ক্ষমতা—সারভাইভাল অব দ্য ফিটেস্ট। তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, ফিটনেস একজন মানুষকে যেকোনো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে সাহায্য করে এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা তৈরি করে। ২০০৯ সালে মা-বাবার ডাইনিংরুম থেকে ফিটনেস স্টুডিও শুরু করার গল্প শোনান তিনি। রুসলান বলেন, আমার ট্রান্সফরমেশনটা শুধু শরীরের ছিল না, পুরো লাইফস্টাইলই বদলে যায়। বন্ধুদের উৎসাহে আমি স্টুডিও শুরু করার চিন্তা করি। তখন বাংলাদেশে নিউট্রিশন নিয়ে সচেতনতা কম ছিল এবং মেয়েদের জন্য ভালো মানের জিমের অভাব ছিল। বাবা-মায়ের সম্মতিতে পাশের একটি রুম ব্যবহার করে রুসলানস স্টুডিওর যাত্রা শুরু হয়।
স্টুডিওর সাফল্য ও ক্লায়েন্টদের প্রতিক্রিয়া
স্টুডিওর শুরুর সময় ক্লায়েন্টদের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে রুসলান হোসেন বলেন, আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি। বেশির ভাগ ক্লায়েন্ট করপোরেট সেক্টরের ছিল এবং তাঁদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা দারুণ ছিল। জায়গার সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও আমি কাউকে ফিরিয়ে দিইনি, প্রয়োজনে ভোরবেলাতেও ট্রেনিং দিয়েছি। বন্ধুদের কাছ থেকে প্রচুর উৎসাহ পেয়েছি, যা আমাকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। তিনি ব্যক্তিগত ট্রেইনারের কাছ থেকে শেখা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোও শেয়ার করেন: সঠিক পরিকল্পনা, ধারাবাহিকতা ও আন্তরিকতা। আজ করলাম, কাল করলাম না—এভাবে কোনো কিছু অর্জন করা যায় না।
কোয়ালিটির উপর জোর ও ফিটনেস ইন্ডাস্ট্রির সম্ভাবনা
রুসলান হোসেন কেন সীমিতসংখ্যক ক্লায়েন্ট নিয়ে কাজ করতে পছন্দ করেন, সে বিষয়ে তিনি বলেন, আমি কোয়ান্টিটির চেয়ে কোয়ালিটিকে বেশি গুরুত্ব দিই। কম মানুষ নিয়ে কাজ করলে প্রত্যেকের জন্য আলাদা করে সময় দেওয়া যায় এবং তাঁদের প্রয়োজন অনুযায়ী পরিকল্পনা করা সম্ভব হয়, যা দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই ফলাফল দেয়। বর্তমান সময়ে তরুণদের মধ্যে ফিটনেস নিয়ে আগ্রহ বাড়ার কারণ হিসেবে তিনি সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব, প্রতিযোগিতা ও সচেতনতাকে দায়ী করেন। ফিটনেসে নিউট্রিশনের ভূমিকা সম্পর্কে রুসলান বলেন, নিউট্রিশন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নিজের শরীরের ধরন বুঝে সঠিক খাবার খাওয়া জরুরি। বাংলাদেশে ফিটনেস ইন্ডাস্ট্রির সম্ভাবনা নিয়ে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন: আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো জনশক্তি। এটাকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও এই সেবা ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব।
ফিটনেসকে সহজলভ্য করার আহ্বান
আলোচনার শেষ পর্যায়ে রুসলান হোসেন বলেন, অনেকেই ফিটনেসকে ব্যয়বহুল মনে করেন, কিন্তু ধারণাটি সঠিক নয়। চাইলেই ফিট থাকা সম্ভব। হাঁটা, ফ্রি-হ্যান্ড এক্সারসাইজ বা ইউটিউব থেকে তথ্য নিয়ে ফিটনেস জার্নি শুরু করা যায়। আমরা নিজেরাই ফিটনেসকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে ব্যয়বহুল করে ফেলি। ডায়েটও খুব ব্যয়বহুল নয়; ভাত, ডাল, স্থানীয় খাবারের মতো সহজলভ্য উপাদান ব্যবহার করে সঠিক পরিমাণে খেলে ডায়েট মেইনটেইন করা সম্ভব। এই পর্বটি গত রোববার প্রথম আলোর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে প্রচারিত হয়, যা তরুণদের জন্য অনুপ্রেরণাদায়ক গল্প হিসেবে কাজ করছে।



