বাংলাদেশে যুবকদের মধ্যে ডায়াবেটিসের উদ্বেগজনক হার: ৬৬% জানেনই না
যুবকদের ডায়াবেটিস: ৬৬% অজান্তেই আক্রান্ত

বাংলাদেশে যুবকদের মধ্যে ডায়াবেটিসের উদ্বেগজনক হার: ৬৬% জানেনই না

প্রথাগতভাবে ডায়াবেটিসকে প্রাপ্তবয়স্কদের রোগ হিসেবে দেখা হলেও এখন এটি শিশু, কিশোর ও তরুণদের মধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে। বিশ্বজুড়ে তরুণ বয়সে টাইপ-১ ও টাইপ-২ ডায়াবেটিসের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে, যা একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশে এই পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক, যেখানে গবেষণায় দেখা গেছে, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত যুবকদের মধ্যে ৬৬ দশমিক ৩ শতাংশই জানেনই না যে তারা শরীরে এই রোগটি বহন করছেন।

গবেষণার মূল ফলাফল

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের উদ্যোগে দেশব্যাপী অসংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব বিষয়ক তিনটি গবেষণা পরিচালিত হয়েছে। ‘যুব বয়সে ডায়াবেটিস, গর্ভকালীন ডায়াবেটিস (জিডিএম) এবং পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম’ বিষয়ক এই জাতীয় গবেষণায় অর্থায়ন করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা। গবেষণাগুলো ২০২৪ সালের মার্চ থেকে ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত দেশের ৮ বিভাগের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় পরিচালিত হয়।

প্রথম গবেষণায় দেখা যায়, ১০ থেকে ৩৪ বছর বয়সি কিশোর ও তরুণদের মধ্যে ১৮ দশমিক ৪ শতাংশ প্রি-ডায়াবেটিসে ভুগছেন, যারা ডায়াবেটিস আক্রান্তের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছেন। একই বয়সসীমায় ৪ দশমিক ৫ শতাংশ যুবক টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। ডায়াবেটিসের হার কিশোরদের তুলনায় তরুণ প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে বেশি (৭ দশমিক ৫ শতাংশ বনাম ১ দশমিক ৩ শতাংশ) এবং গ্রামের তুলনায় শহরে বেশি (৬ দশমিক ২ শতাংশ বনাম ৩ দশমিক ২ শতাংশ)।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ঝুঁকির কারণ ও প্রভাব

গবেষণায় ঝুঁকির প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে কম শারীরিক পরিশ্রম, তামাক ব্যবহার, স্থূলতা বা মেদ, উচ্চ রক্তচাপ এবং রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা বৃদ্ধি। অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস অন্ধত্ব, হৃদরোগ, কিডনি রোগ, স্ট্রোক, মাড়ির রোগ ও পঙ্গুত্বের মতো কঠিন রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। গবেষকরা ব্যাখ্যা করেন, ইনসুলিন হরমোনের অভাব বা কার্যকারিতা কমে গেলে রক্তের গ্লুকোজ কোষে পৌঁছাতে পারে না, ফলে রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ বেড়ে যায়, যা ডায়াবেটিস নামে পরিচিত।

নারীদের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত উদ্বেগ

গবেষণায় নারীদের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত উদ্বেগজনক তথ্যও উঠে এসেছে। ১৮ দশমিক শূন্য শতাংশ নারী গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে ভুগছেন, যার মধ্যে ২ দশমিক ৭ শতাংশের গর্ভাবস্থায় প্রথম ডায়াবেটিস শনাক্ত হয়েছে। আক্রান্ত নারীদের ২০ দশমিক ৭ শতাংশের গর্ভাবস্থায় হাইপারগ্লাইসেমিয়া পাওয়া গেছে, অর্থাৎ রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি।

এছাড়া, নারীদের মধ্যে ৬ দশমিক ৯ শতাংশ পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (পিসিওএস) নামক সাধারণ হরমোনজনিত সমস্যায় ভুগছেন। পিসিওএস-এর ফলে অনিয়মিত মাসিক, মুখে বা শরীরে অতিরিক্ত লোম, ব্রণ, চুল পড়া, হঠাৎ ওজন বৃদ্ধি ও প্রজনন সমস্যা দেখা দিতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাপ্তবয়স্ক পিসিওএস রোগীদের মধ্যে মেটাবলিক সিনড্রোম কিশোরীদের তুলনায় অনেক বেশি (৩৩ দশমিক ৩ শতাংশ বনাম ৮ দশমিক শূন্য শতাংশ)।

গবেষকদের সুপারিশ

গবেষক দলের সদস্য ডা. মাশফিকুল হাসান যুগান্তরকে বলেন, তিনটি গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে প্রাথমিক পর্যায়ে স্ক্রিনিং, জনসচেতনতা বৃদ্ধি, প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ ও নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবায় এন্ডোক্রাইন কেয়ারকে আরও শক্তিশালীভাবে যুক্ত করা জরুরি। তিনি তরুণদের মধ্যে আগেভাগে ডায়াবেটিস শনাক্তকরণ ও জীবনধারাভিত্তিক প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমের প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেন।

গবেষণার ফলাফল ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক চিকিৎসা সাময়িকী ‘এন্ডোক্রাইনোলজি অ্যান্ড ডায়াবেটিস’ ও ‘জার্নাল অব রিপ্রোডাক্টিভ মেডিসিন অ্যান্ড বায়োলজি’তে প্রকাশিত হয়েছে। তৃতীয় গবেষণাটি প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে। এই গবেষণাগুলো বাংলাদেশে যুবক ও নারীদের মধ্যে ডায়াবেটিস ও সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য সমস্যার গুরুত্বপূর্ণ চিত্র তুলে ধরেছে, যা ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্য নীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।