শৈশবে দুরারোগ্য ব্যাধির চিকিৎসার কারণে প্রজনন সক্ষমতা হারানো অসংখ্য পুরুষের জন্য আশার নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান। এক যুগান্তকারী গবেষণায় দেখা গেছে, বয়ঃসন্ধির আগেই সংরক্ষণ করে রাখা অণ্ডকোষের টিস্যু ১৬ বছর পর পুনরায় দেহে প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি আবারও শুক্রাণু উৎপাদনে সক্ষম হয়েছেন।
চিকিৎসা ইতিহাসে এটিই প্রথম ঘটনা, যেখানে শৈশবে হিমায়িত করে রাখা টিস্যু পুনঃপ্রতিস্থাপনের মাধ্যমে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রজনন ক্ষমতা আংশিকভাবে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান।
বর্তমানে ২৭ বছর বয়সী ওই ব্যক্তি মাত্র ১০ বছর বয়সে ‘সিকেল সেল’ রোগে আক্রান্ত হন। রোগটির চিকিৎসার অংশ হিসেবে তাকে উচ্চমাত্রার কেমোথেরাপি নিতে হয়েছিল। তবে চিকিৎসার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় ভবিষ্যতে প্রজনন সক্ষমতা হারানোর আশঙ্কা থাকায় চিকিৎসকেরা আগেভাগেই তার অণ্ডকোষের টিস্যুর নমুনা সংগ্রহ করে হিমায়িত অবস্থায় সংরক্ষণ করেন।
গবেষণার গুরুত্ব ও প্রতিক্রিয়া
গবেষণাটিকে ‘বড় প্রাপ্তি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন বেলজিয়ামের ‘ভ্রিজে ইউনিভার্সিটি ব্রাসেলস’-এর অধ্যাপক এলেন গুসেনস। তিনি বলেন—‘এই সাফল্যের ফলে আরও অনেক মানুষ এখন নিজেদের সন্তান লাভের স্বপ্ন দেখতে পারবেন। বিশেষ করে যেসব রোগীর টিস্যু আগে থেকেই প্রজনন ব্যাংকে সংরক্ষিত রয়েছে, তাদের জন্য এটি নতুন আশার আলো।’
কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপির মতো চিকিৎসা ক্যান্সার কিংবা সিকেল সেল আক্রান্ত শিশুদের জীবন বাঁচাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও এসব চিকিৎসার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় অনেক রোগী স্থায়ীভাবে প্রজনন ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন।
সাধারণত বয়ঃসন্ধির পর পুরুষদের শুক্রাণু সংরক্ষণ করে ভবিষ্যতে আইভিএফ পদ্ধতিতে ব্যবহারের সুযোগ থাকে। কিন্তু বয়ঃসন্ধির আগের শিশুদের ক্ষেত্রে শুক্রাণু তৈরি না হওয়ায় সেই সুযোগ কার্যত থাকে না।
এই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতেই ২০০২ সালে বেলজিয়ামের একটি ক্লিনিক প্রথমবারের মতো শিশুদের অণ্ডকোষের টিস্যু সংরক্ষণ বা ‘টিস্যু ব্যাংকিং’ কার্যক্রম শুরু করে। এই অপরিণত টিস্যুর মধ্যে বিশেষ ধরনের স্টেম সেল থাকে, যা ভবিষ্যতে শুক্রাণু উৎপাদনের ভিত্তি হিসেবে কাজ করতে পারে।
এছাড়া টিস্যুতে থাকা ‘সারটোলি কোষ’ শুক্রাণুর বৃদ্ধি ও পুষ্টি জোগাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
প্রাথমিক পর্যায় থেকে সাফল্য
অধ্যাপক গুসেনস অতীতের সেই সময়ের কথা স্মরণ করে বলেন—‘তখন এ গবেষণা একেবারেই প্রাথমিক পর্যায়ে ছিল। এসব পদ্ধতি শুধু প্রাণীদের ওপর পরীক্ষা করা হচ্ছিল।’
তিনি আরও বলেন—‘আমরা তখন রোগীদের পরিবারকে স্পষ্ট করেই জানিয়েছিলাম যে, ভবিষ্যতে এ টিস্যু ব্যবহার করে প্রজনন ক্ষমতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে কি না, তার কোনো নিশ্চয়তা আমরা দিতে পারছি না।’
সময়ের পরিক্রমায় সেই প্রাথমিক পর্যায়ের রোগীদের অনেকেই এখন বিশের কোঠায় পৌঁছেছেন এবং নিজেদের পরিবার গঠনের কথা ভাবছেন। তাদের মধ্যেই একজন হচ্ছেন এই গবেষণার প্রথম সফল রোগী, যার দেহে সংরক্ষিত টিস্যু পুনরায় প্রতিস্থাপন করা হয়েছে।
২০০৮ সালে সিকেল সেল রোগের চিকিৎসার অংশ হিসেবে বোনম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্টের আগে ওই রোগীকে উচ্চমাত্রার কেমোথেরাপি দেওয়া হয়, যাতে তার শরীরের পুরোনো রক্তকণিকাগুলো ধ্বংস করা যায়।
চিকিৎসার ঠিক আগে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তার একটি অণ্ডকোষ অপসারণ করা হয় এবং সেটিকে ছোট ছোট অংশে ভাগ করে হিমায়িত অবস্থায় সংরক্ষণ করা হয়।
গত বছর চিকিৎসকেরা সেই সংরক্ষিত টিস্যুর চারটি অংশ তার অবশিষ্ট অণ্ডকোষে এবং আরও চারটি অংশ অণ্ডকোষের চামড়ার নিচে প্রতিস্থাপন করেন। এক বছর পর সেসব টিস্যু আবার সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণার ফলাফল একটি প্রি-প্রিন্ট পেপারে প্রকাশিত হয়েছে, যদিও এটি এখনও বিশেষজ্ঞদের আনুষ্ঠানিক পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে যায়নি।
ফলাফল ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
গবেষণায় দেখা গেছে, অণ্ডকোষের ভেতরে স্থাপন করা টিস্যুর দুটি অংশ থেকে পরিপক্ক শুক্রাণু উৎপন্ন হয়েছে। সেই শুক্রাণুগুলো সংগ্রহ করে বর্তমানে হিমায়িত অবস্থায় রাখা হয়েছে। তবে গবেষকেরা জানিয়েছেন, এসব টিস্যু সরাসরি শুক্রাণু নালীর সঙ্গে যুক্ত নয়। ফলে শুক্রাণু স্বাভাবিকভাবে বীর্যের সঙ্গে মিশতে পারবে না।
এ কারণে ভবিষ্যতে সন্তান নেওয়ার জন্য কৃত্রিম প্রজনন প্রযুক্তি বা আইভিএফ-ই প্রধান ভরসা হবে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।
অধ্যাপক গুসেনস বলেন—‘সংগ্রহ করা শুক্রাণুগুলো দেখতে স্বাভাবিক ছিল। তবে এগুলো ডিম্বাণু নিষিক্ত করতে সক্ষম কি না, সেটি এখনও পরীক্ষা করে দেখা বাকি।’
‘ইউনিভার্সিটি অফ এডিনবরা’র ‘রিপ্রোডাক্টিভ হেলথ সেন্টার’ এর শিশু এন্ডোক্রিনোলজিস্ট অধ্যাপক রড মিচেলও একই ধরনের পরীক্ষা চালাচ্ছেন।
২০১৪ সাল থেকে সেখানে অণ্ডকোষের টিস্যু সংরক্ষণ শুরু হয়েছে। অক্সফোর্ড ও লন্ডনের গবেষকদের সহযোগিতায় এখন পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের এক হাজারেরও বেশি রোগীর নমুনা হিমায়িত করে রাখা হয়েছে।
এই অগ্রগতিকে ‘নীতিগত সাফল্যের প্রমাণ’ হিসেবে উল্লেখ করে অধ্যাপক মিচেল বলেন—‘মানুষের ক্ষেত্রে এ পদ্ধতি কার্যকর হতে পারে— এখন তার বাস্তব প্রমাণ পাওয়া গেছে। এটি সত্যিই বিস্ময়কর।’
তিনি জানান, খুব শিগগিরই তার ক্লিনিকেও প্রথম টিস্যু প্রতিস্থাপনের কাজ শুরু হবে।
মিচেলের ভাষায়—‘আমি সবসময় বিশ্বাস করতাম এটি সম্ভব। যদি আপনি টিস্যু হিমায়িত করে কোষগুলো জীবিত রাখতে পারেন, তাহলে তাদের কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনাও থাকা উচিত। কারণ আপনি সেই টিস্যুকে আবার এমন এক প্রাকৃতিক পরিবেশে ফিরিয়ে দিচ্ছেন, যা তাকে সক্রিয় করতে পারে। বৈজ্ঞানিকভাবে বিষয়টি যৌক্তিক হলেও বাস্তবে তা ঘটতে দেখা এখনও অবিশ্বাস্য।’
বিশ্বব্যাপী প্রভাব
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে তিন হাজারেরও বেশি রোগীর অণ্ডকোষের টিস্যু বিভিন্ন ব্যাংকে সংরক্ষিত রয়েছে। শুধু যুক্তরাজ্যেই ধারণা করা হয়, প্রতি বছর প্রায় ২০০ রোগী ভবিষ্যতে এ প্রযুক্তি থেকে উপকৃত হতে পারেন।
এদিকে ২৭ বছর বয়সী ওই তরুণ এখন ভাবছেন, তিনি কি আরও শুক্রাণু সংগ্রহের জন্য দ্বিতীয়বার টিস্যু প্রতিস্থাপন করাবেন, নাকি খুব শিগগিরই আইভিএফ পদ্ধতির মাধ্যমে পরবর্তী ধাপে এগিয়ে যাবেন।



