সিঁড়ি ভাঙলেই হাঁটু ব্যথা: কারণ ও প্রতিকার
সিঁড়ি ভাঙলেই হাঁটু ব্যথা: কারণ ও প্রতিকার

হাঁটাচলা করার সময়ে হাঁটুর ব্যথা ততটা ভোগায় না। অথচ সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করার সময়েই যত গণ্ডগোল। সিঁড়ি ভাঙতে গেলেই হাঁটুতে যন্ত্রণা হয়। আর্থ্রাইটিসের ব্যথায় যারা কাতর, তারা হাঁটতে পারলেও সিঁড়ি ভাঙতে গেলেই নাজেহাল হয়ে পড়েন। কেন এমন হয়?

সিঁড়ি ভাঙলে কেন হাঁটু ব্যথা হয়?

শুধু বাত থাকলে বা মালাইচাকির কোনো সমস্যা থাকলেই যে তা হবে, তেমনটি নয়। অনেক সুস্থ মানুষও যতটা দ্রুত হাঁটতে পারেন, ততটা তাড়াতাড়ি সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করতে পারেন না। কারণ সিঁড়ি ভাঙতে গেলেই হাঁটু বিদ্রোহ ঘোষণা করে বসে। হয় মটমট শব্দ, না হলে ভীষণ যন্ত্রণা।

খেয়াল করে দেখবেন—যিনি বাতের রোগী, তিনি দিব্যি কয়েক কদম ঠিকমতো হাঁটতে পারলেও সিঁড়ি ভাঙতে পারেন না। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে গেলেই যেন চাবুকের মতো ব্যথা কষায় হাঁটুতে। অতএব যত গোলমাল সেই হাঁটুরই। যত ব্যথাবেদনা সবই সেই সিঁড়ি ভাঙার সময়েই কেন হয়, তার কারণ জটিল। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এর ব্যাখ্যা আছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

হাঁটুর জয়েন্টের গঠন

দাঁড়িয়ে থাকা, হাঁটাচলা, শোয়াবসা— সবার জন্যই হাঁটুর ওপরেই নির্ভর করতে হয়। হাঁটুর জয়েন্ট অনেকটা দরজার কবজার মতো। দরজার কবজার তো একটি লক থাকে, কিন্তু হাঁটুর কবজার তিনটা লক— ফিমার (কোমর থেকে হাঁটু পর্যন্ত পায়ের হাড়), টিবিয়া (হাঁটু থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত পায়ের হাড়) এবং এই দুইয়ের মাঝে থাকে কার্টিলেজ ও মালাইচাকি। পাতলা ফাইবার দিয়ে তৈরি কার্টিলেজ স্নায়ুহীন। হাঁটুর হাড়ে এটি অনেকটা কুশন বা নরম বালিশের মতো কাজ করে। অর্থাৎ ঘর্ষণ প্রতিরোধ করে। কার্টিলেজ নষ্ট হয়ে গেলে ফিমার ও টিবিয়ার মধ্যে সরাসরি ঘষা লাগে। শুরু হয় যন্ত্রণা। সিঁড়ি ভাঙতে গেলে এই ঘর্ষণ বেশি হয়, ফলে ব্যথা হয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মালাইচাকির ভূমিকা

তবে এখানে মালাইচাকিরও বড় ভূমিকা আছে। জনস হপকিন্স মেডিসিনের গবেষকরা জানাচ্ছেন, সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামার সময়ে যাদের হাঁটুর ব্যথা বেশি হয়, ধরে নিতে হবে তাদের মালাইচাকিরও সমস্যা আছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় যাকে বলা হয়— ‘প্যাটেলোফিমোরাল পেন সিনড্রোম’।

হাঁটুর সামনের দিকে চাকতির মতো গোলাকার ছোট হাড়টিকে বলে মালাইচকি বা প্যাটেলা। এটির কাজ হলো কোয়াড্রিসেপ পেশিকে ধরে রাখা ও সেই অঞ্চলের লিগামেন্টগুলোর ভারসাম্য বজায় রাখা। যাতে চলাফেরা, ওঠাবসা, দাঁড়ানো, সিঁড়ি ভাঙা, দৌড়ানোর মতো কাজগুলো সঠিকভাবে করা যায়।

মালাইচাকি যদি বিকল হতে থাকে বা তার কার্যক্ষমতা কমতে থাকে, তখন এই কাজগুলো করতে সমস্যা হবে। বয়সজনিত, জন্মগত ও দুর্ঘটনার কারণে অথবা কোনো অসুখ-বিসুখের জন্য মালাইচাকির সমস্যা তৈরি হতে পারে। এমন হলে অস্থিসন্ধির লিগামেন্টগুলো ঠিকমতো কাজ করতে পারবে না। এতে হাঁটুর ওপর চাপ বেশি পড়বে এবং ঘর্ষণ বেশি হবে। ফলে যন্ত্রণা হবে।

কাদের বেশি হয়?

এ সমস্যায় সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হন তিরিশের কোঠার বা তার চেয়েও কমবয়সি নারী ও খেলোয়াড়রা। দীর্ঘক্ষণ একই জায়গায় বসে থাকা বা দাঁড়িয়ে থাকা, ভারি ওজন তুলতে গিয়ে আঘাত, জিমে গিয়ে শরীরচর্চা করার সময়ে চোট লাগার কারণে মালাইচাকির কার্টিলেজ বা তরুণাস্থির আস্তরণ রুক্ষ হয়ে যায়। ফলে ফিমারের তলার অংশে ঘষা লেগে কার্টিলেজের ক্ষতি হয়। কমবয়সিদের ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়ার প্রবণতা বেশি। এ কারণেও সমস্যা শুরু হয়।

আর হয় বয়স্কদের। তবে সেটি বয়সজনিত কারণে হাড়ের ক্ষয়ের জন্য হতে পারে। অস্টিও-আর্থ্রাইটিস থাকলে হাঁটু ফুলে যায়, পেশির ক্ষয়ের ফলে সমস্যা শুরু হয়। অতিরিক্ত ওজনও দায়ী হতে পারে। হাঁটু শরীরের ওজন ঠিকমতো ধরে রাখতে পারে না। ফলে অসম চাপে কার্টিলেজের ক্ষয় হয়। ক্রমাগত এই ক্ষয় মেরামত করতে শরীর আর কার্টিলেজ তৈরি করতে পারে না। তার পরিবর্তে হাড় তৈরি করে। যাকে বলে 'অস্টিওফাইটিক গ্রোথ'। এই হাড় সহজেই ভেঙে যায় এবং হাঁটুতে যন্ত্রণা হয়। তাই হাঁটু ভালো রাখতে শরীরের ওজনও নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি।