বাংলাদেশে এখন বিশ্বমানের ক্যানসার চিকিৎসা: মাথা-ঘাড়ের ক্যানসার সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য
বাংলাদেশে বিশ্বমানের ক্যানসার চিকিৎসা, মাথা-ঘাড়ের ক্যানসার নিরাময়যোগ্য

বাংলাদেশে বিশ্বমানের ক্যানসার চিকিৎসা: মাথা-ঘাড়ের ক্যানসার এখন সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য

ক্যানসার মানেই জীবনের সমাপ্তি—এই প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বাংলাদেশের চিকিৎসাব্যবস্থায় যুক্ত হয়েছে বিশ্বমানের প্রযুক্তি। বিশেষ করে মাথা ও ঘাড়ের ক্যানসার, যা বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও খাদ্যাভ্যাসের পটভূমিতে আশঙ্কাজনক হারে দেখা যায়, তা এখন সঠিক সময়ে শনাক্তকরণ ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য হয়ে উঠেছে। গত সোমবার এসকেএফ অনকোলজির আয়োজনে 'বিশ্বমানের ক্যানসার চিকিৎসা এখন বাংলাদেশে' শীর্ষক বিশেষ অনলাইন আলোচনার ৬৫তম পর্বে এই আশাবাদ ব্যক্ত করেন টিএমএসএস ক্যানসার সেন্টার, বগুড়ার মেডিক্যাল অ্যান্ড রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট ডা. মো. তৌছিফুর রহমান।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মাথা-ঘাড়ের ক্যানসারের ঝুঁকি

ডা. মো. তৌছিফুর রহমান ব্যাখ্যা করেন যে মাথা ও ঘাড়ের ক্যানসার বলতে সাধারণত মুখগহ্বর, কণ্ঠনালি, জিব, লালা গ্রন্থি ও নাকের পেছনের অংশের ক্যানসারকে বোঝানো হয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ওরাল ক্যাভিটি বা মুখের ক্যানসার সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। তিনি আমাদের দেশের মানুষের তামাক ও তামাকজাত দ্রব্য, যেমন জর্দা, চুন ও সুপারি দিয়ে পান খাওয়ার দীর্ঘমেয়াদি অভ্যাসকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

ঝুঁকির অন্যান্য কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে:

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
  • ধূমপান ও মদ্যপানের অভ্যাস
  • হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাসের (এইচপিভি) সংক্রমণ
  • প্লাস্টিকের পাত্রে গরম খাবার গ্রহণ
  • খাদ্যে ভেজালের উপস্থিতি

তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন যে এই কারণগুলো যেকোনো বয়সেই মাথা-ঘাড়ের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে।

প্রাথমিক লক্ষণ শনাক্তকরণের গুরুত্ব

মাথা ও ঘাড়ের ক্যানসারের ক্ষেত্রে শরীর কিছু নির্দিষ্ট সংকেত প্রদান করে, যা সাধারণ মানুষ অনেক সময় অবহেলা করেন। ডা. তৌছিফুর রহমানের মতে, নিম্নলিখিত লক্ষণগুলো ক্যানসারের প্রাথমিক সতর্কসংকেত হতে পারে:

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
  1. মুখে কোনো দীর্ঘস্থায়ী ঘা যা সহজে সারছে না
  2. গলায় কোনো চাকা বা টিউমার অনুভব করা
  3. কণ্ঠস্বরের আকস্মিক পরিবর্তন
  4. দীর্ঘমেয়াদি কাশি ও ঢোঁক গিলতে অসুবিধা

তিনি জোর দিয়ে বলেন যে প্রথম বা দ্বিতীয় পর্যায়ে রোগ ধরা পড়লে নিরাময়ের হার প্রায় শতভাগ। তাই রোগ নির্ণয়ে বিলম্ব না করে দ্রুত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

অঙ্গ রক্ষায় রেডিয়েশন থেরাপির ভূমিকা

মাথা ও ঘাড়ের অংশে কথা বলা, স্বাদ গ্রহণ বা শ্বাস নেওয়ার মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ 'ফাংশনাল অর্গান' থাকে। ডা. তৌছিফুর রহমান গুরুত্ব দিয়ে বলেন, অনেক ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের চেয়ে রেডিয়েশন থেরাপি বেশি কার্যকর। কারণ, এতে অঙ্গহানি ছাড়াই ক্যানসার নির্মূল করা সম্ভব। বিশেষ করে কণ্ঠনালি বা জিবের ক্যানসারে অঙ্গ প্রিজার্ভ বা সুরক্ষার জন্য রেডিয়েশন এখন অন্যতম প্রধান চিকিৎসা পদ্ধতি।

রেডিয়েশন থেরাপিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন

মাথা ও ঘাড়ের ক্যানসার চিকিৎসায় রেডিয়েশন থেরাপির ভূমিকা অপরিসীম। যেহেতু এই অঞ্চলে স্পর্শকাতর অঙ্গগুলো থাকে, তাই অঙ্গহানি না ঘটিয়ে চিকিৎসায় রেডিয়েশনই এখন প্রধান ভরসা। ডা. তৌছিফুর রহমান বলেন, ২০ বছর আগে যেখানে কেবল সাধারণ এক্স-রে ফিল্ম দেখে টুডি রেডিয়েশন দেওয়া হতো, এখন সেখানে এসেছে থ্রিডি-সিআরটি, আইএমআরটি ও আর্ক থেরাপির মতো আধুনিক প্রযুক্তি।

বিশেষ করে আইএমআরটি প্রযুক্তি এখন অনেক বেশি সুনির্দিষ্টভাবে ক্যানসার আক্রান্ত কোষে আঘাত হানতে পারে। এর আরও আধুনিক সংযোজন হলো 'টমোথেরাপি', যা বর্তমানে বাংলাদেশের কেবল একটি সেন্টারে উপলব্ধ। এটি এআই নির্দেশিত এমন এক পদ্ধতি, যা সুস্থ কোষকে সুরক্ষিত রেখে অত্যন্ত দ্রুত ও নির্ভুলভাবে ক্যানসার কোষ ধ্বংস করতে সক্ষম। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে চিকিৎসার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া অনেক কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।

চিকিৎসা-পরবর্তী যত্ন ও দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতা

রেডিয়েশন-পরবর্তী সময়ে অনেক রোগীর মুখ খুলতে সমস্যা বা খাবার গিলতে অসুবিধা হতে পারে। ডা. তৌছিফুর রহমান এর সমাধানে নিয়মিত 'মাউথ ওপেনিং এক্সারসাইজ' ও লিকুইড থেকে ধীরে ধীরে সলিড খাবার খাওয়ার অভ্যাস করার পরামর্শ দেন। এ ছাড়া মুখ শুকিয়ে যাওয়ার সমস্যা রোধে লেবু বা ভিটামিন সি-জাতীয় লজেন্স ব্যবহারের কথা বলেন তিনি।

থেরাপি চলাকালে পুষ্টি নিশ্চিত করতে প্রয়োজনে 'এনজি টিউব' ব্যবহারের মাধ্যমে শরীরের ওজন ও শক্তি ধরে রাখা জরুরি। রেডিয়েশন চলাকালে মুখে ঘা হওয়া বা শুকনা বোধ করার মতো কিছু সাময়িক সমস্যা হতে পারে, যা সচেতন পরিচর্যার মাধ্যমে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।

ডা. তৌছিফুর রহমান জোর দিয়ে বলেন যে ক্যানসার জয় করার ক্ষেত্রে মানসিক শক্তি হচ্ছে রোগীর প্রধান হাতিয়ার। চিকিৎসা শেষে প্রথম দুই বছর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এ সময়েই রোগ ফিরে আসার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে। তাই প্রতি এক থেকে দুই মাস অন্তর নিয়মিত ফলোআপের মাধ্যমে চিকিৎসকের সংস্পর্শে থাকা জরুরি।

বাংলাদেশের ক্যানসার চিকিৎসার নতুন উচ্চতা

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সরকারের বিকেন্দ্রীকরণ নীতি ও বেসরকারি পর্যায়ে আধুনিক প্রযুক্তির সংযোজন বাংলাদেশের ক্যানসার চিকিৎসাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। বিশ্ব ক্যানসার দিবস ও মাথা-ঘাড়ের ক্যানসার সচেতনতা মাস উপলক্ষে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন নাসিহা তাহসিন। অনুষ্ঠানটি প্রথম আলো ও এসকেএফ অনকোলজির ফেসবুক পেজে সরাসরি সম্প্রচারিত হয়।

ডা. তৌছিফুর রহমানের মতে, সঠিক সচেতনতা, সময়মতো শনাক্তকরণ ও আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তির ব্যবহারই ক্যানসারমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে মূল ভূমিকা পালন করতে পারে। বাংলাদেশের চিকিৎসাব্যবস্থায় এখন যুক্ত হয়েছে এমন সব বিশ্বমানের প্রযুক্তি, যা উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে রোগীদের দিচ্ছে নতুন জীবনের নিশ্চয়তা।