অর্থাভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি অনিশ্চিত শুভ কুমার শীল, চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজের মেধাবী শিক্ষার্থী
অর্থাভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি অনিশ্চিত শুভ কুমার শীল

অর্থাভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি অনিশ্চিত শুভ কুমার শীলের সংগ্রামী গল্প

চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজের মেধাবী শিক্ষার্থী শুভ কুমার শীল গুচ্ছভুক্ত ২০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৫–২০২৬ শিক্ষাবর্ষের স্নাতক প্রথম বর্ষের সি ইউনিটের (বাণিজ্য) ভর্তি পরীক্ষায় দশম স্থান অর্জন করেছেন। এছাড়াও, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে সি ইউনিটে ৪০৪তম ও বি ইউনিটে ৪৪২তম স্থান পেয়েছেন তিনি। কিন্তু দারিদ্র্য ও আর্থিক সংকটের কারণে তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

জটিল রোগ ও আর্থিক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও সাফল্য

শুভ কুমার শীল এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ–৫ না পেলেও কখনো হাল ছাড়েননি। ‘নাজাল অবস্ট্রাকশন’ নামের একটি জটিল রোগে গুরুতর অসুস্থতা সত্ত্বেও তাঁর অদম্য অধ্যবসায় তাকে হাজারো ভর্তি-ইচ্ছুক শিক্ষার্থীর থেকে এগিয়ে রেখেছে। তবে, অর্থের অভাবে তিনি এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারবেন কি না, তা নিয়ে গভীর দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। তাঁর স্বপ্ন হলো ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করে পরবর্তীতে জুডিশিয়াল সার্ভিসে যোগদান করা।

পারিবারিক পটভূমি ও শিক্ষাজীবন

শুভ কুমার চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার মুন্সিগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা। তিনি নরসুন্দর (নাপিত) নারায়ণ কুমার শীলের ছোট ছেলে। তাঁর মা লক্ষ্মী রানী শীল একজন গৃহবধূ এবং বড় ভাই প্রণয় কুমার শীল বেকার। বাবার ক্ষৌরকর্মের কাজ (সেলুন) থেকে উপার্জিত অর্থেই চার সদস্যের সংসার চলে। এই অভাবের সংসারে বড় ভাইয়ের পড়াশোনা থেমে গেলেও শুভ কুমার টিউশনি করে নিজের পড়াশোনার খরচ জোগাড় করে আসছেন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

তিনি ২০২২ সালে আলমডাঙ্গার মুন্সিগঞ্জ মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে বাণিজ্য বিভাগে জিপিএ–৪.৬১ পেয়ে এসএসসি এবং ২০২৪ সালে চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজ থেকে বাণিজ্য বিভাগে জিপিএ–৪.০৮ পেয়ে এইচএসসি পাস করেছেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

স্বাস্থ্য সমস্যা ও চিকিৎসার সংকট

পিছিয়ে পড়া পরিবারে জন্ম নেওয়া শুভ কুমার দীর্ঘদিন ধরে ‘নাজাল অবস্ট্রাকশন’ নামের জটিল রোগে ভুগছেন। প্রায় এক যুগ ধরে তিনি নাক দিয়ে শ্বাস নিতে পারেন না এবং মুখ দিয়েই শ্বাস গ্রহণ ও ছাড়তে হয়। চিকিৎসকদের মতে, নাকের হাড় বাঁকা বা নাকের ভেতরের মধ্যবর্তী পর্দা বাঁকা থাকায় এই সমস্যা হয়েছে। তাঁকে নিয়মিত চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হচ্ছে এবং খুব শিগগির আরও একবার অস্ত্রোপচার করা প্রয়োজন বলে জানানো হয়েছে।

শুভ কুমার বলেন, ‘২০১৫ সালে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় এক দুর্ঘটনায় আমার নাকের হাড় বাঁকা হয়ে যায়। তারপর নাক দিয়ে শ্বাসপ্রশ্বাস অনেকাংশে বন্ধ হয়ে যায়। ২০২২ সালে অস্ত্রোপচার করার পর পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। মাঝেমধ্যে যন্ত্রণা বাড়ে। ওষুধ না খেলে রাতে ঘুমাতে পারি না। চিকিৎসকেরা আবার অস্ত্রোপচার করার পরামর্শ দিয়েছেন, কিন্তু অর্থাভাবে তা করা হচ্ছে না।’

অর্থনৈতিক সংকট ও সহযোগিতার অভাব

শুভ কুমার তাঁর সংগ্রামের কথা তুলে ধরে বলেন, ‘অর্থাভাবে সেভাবে কোচিং করতে পারিনি। চরম প্রতিকূলতার মধ্যে বন্ধুদের সহযোগিতা নিয়ে পড়াশোনা করেছি। বর্তমান অবস্থায় একটু সহযোগিতা পেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হতো।’

তিনি আরও জানান, ‘বাবার সেলুনের আয়ে সংসার চালানো হিমশিম অবস্থা। এক পিসির (ফুফু) সহযোগিতা, উপবৃত্তির অর্থ ও নিচের শ্রেণির শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়িয়ে পড়ালেখার খরচ চালিয়ে এসেছি। সহযোগিতা দিয়ে আসা পিসি সম্প্রতি জটিল রোগে অপারেশন করায় তাঁর কাছ থেকে আর সহযোগিতা নেওয়া হয়নি।’

যাতায়াত খরচের অভাবে ঠিকমতো কলেজে যেতে না পারা এবং পাঠ্যবই–খাতার অভাব তাঁর দৈনন্দিন সমস্যা ছিল। তবে, সংকটের সময় সরকারি আদর্শ মহিলা কলেজের শিক্ষক মাসুদ পারভেজ, কলেজের এক বড় ভাই তৌফিক এবং বন্ধু সাগরের কাছ থেকে তিনি সহযোগিতা পেয়েছেন। এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ও পড়াশোনার খরচের অনিশ্চয়তা তাঁর জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।