হারিকেন জ্বালিয়ে পড়া তানভীর বিসিএসে পররাষ্ট্র ক্যাডারে প্রথম
হারিকেন জ্বালিয়ে পড়া তানভীর পররাষ্ট্র ক্যাডারে প্রথম

নেত্রকোনার তানভীর রহমান ৪৭তম বিসিএসে প্রথমবার অংশ নিয়েই পররাষ্ট্র ক্যাডারে প্রথম হয়েছেন। রোববার (২৮ জুন) প্রকাশিত ফলাফলে এই সাফল্যে আনন্দে মাতোয়ারা নেত্রকোনা সদর উপজেলার রায়দুম বাগড়া গ্রাম। গর্বিত পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও এলাকাবাসী।

শৈশবের কষ্ট ও অধ্যবসায়

একসময় সন্ধ্যা নামলেই তানভীরের পড়ার সঙ্গী ছিল হারিকেন। এলাকায় বিদ্যুৎ ছিল না, স্কুলে যেতে প্রতিদিন হাঁটতে হতো প্রায় পাঁচ কিলোমিটার পথ। অভাব-অনটনের সেই দিনগুলো পেরিয়ে তিনি আজ দেশের কূটনৈতিক সেবার মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে পৌঁছেছেন।

তানভীর রহমান নেত্রকোনা সদর উপজেলার রায়দুম বাগড়া গ্রামের বাসিন্দা মো. আব্দুর রহমান ও রিনা পারভীনের ছেলে। বাবা নেত্রকোনার শামছুদ্দিন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। তিন ভাই-বোনের মধ্যে তানভীর সবার বড়।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পরিবারের গর্ব ও আবেগ

ছেলের সাফল্যে আবেগাপ্লুত বাবা মো. আব্দুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, "রেজাল্টের খবর শোনার পরই আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করেছি। আমার আর চাওয়ার কিছু নেই। যা চেয়েছি, তার চেয়েও বেশি পেয়েছি।"

তিনি আরও বলেন, "ছোটবেলা থেকেই তানভীর খুব মনোযোগী ছিল। শুধু পড়াশোনা নয়, খেলাধুলাতেও আগ্রহ ছিল। গ্রামের বাড়ি থেকে স্কুলের দূরত্ব ছিল প্রায় পাঁচ কিলোমিটার। প্রতিদিন হেঁটেই যেত। তখন এলাকায় বিদ্যুৎ ছিল না। হারিকেন কিংবা মোমবাতির আলোয় রাত পর্যন্ত পড়াশোনা করেছে। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও কখনো স্বপ্ন দেখা বন্ধ করেনি।"

মা রিনা পারভীন বলেন, "আমাদের ছিল একটি ছোট টিনশেড ঘর। সেই ঘরেই সবাই মিলে থাকতাম, খেতাম, পড়াশোনা করতাম। অনেক কষ্টের জীবন ছিল। কিন্তু আমার ছেলে কখনো হাল ছাড়েনি। ছোটবেলা থেকেই সময়ের মূল্য বুঝতো। আড্ডা বা অকারণে সময় নষ্ট করত না। তার নিষ্ঠা, শৃঙ্খলা ও কঠোর পরিশ্রমই আজকের এই সাফল্য এনে দিয়েছে।"

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

শিক্ষাজীবন ও প্রস্তুতি

তানভীরের শিক্ষাজীবনও কৃতিত্বে ভরা। ২০১৯ সালে টাঙ্গাইলের মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেন। পরে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ভর্তি হন। ২০২৫ সালে স্নাতক শেষ করে বর্তমানে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার পাশাপাশি নিয়মিত বিসিএসের প্রস্তুতি নিয়েছেন তানভীর। প্রথমবার পরীক্ষায় অংশ নিয়েই পররাষ্ট্র ক্যাডারে প্রথম হওয়ার এই সাফল্য অনেকের কাছে বিস্ময়কর হলেও পরিবারের ভাষ্য, এটি দীর্ঘদিনের পরিকল্পিত প্রস্তুতি, শৃঙ্খলা ও কঠোর পরিশ্রমের ফল।

অনুপ্রেরণা ও ভবিষ্যৎ

তানভীরের ছোটবোন সাদিয়া ভাইয়ের অধ্যবসায় সম্পর্কে বলেন, "ভাই ছোটবেলা থেকেই নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপন করতেন। নিজের লক্ষ্য সম্পর্কে সব সময় সচেতন ছিলেন। তাই তার এই সাফল্যে আমরা বিস্মিত নই, বরং গর্বিত।"

এলাকাবাসীর মতে, একজন শিক্ষক পরিবারের সন্তান হয়েও দেশের অন্যতম প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় এমন সাফল্য অর্জন প্রমাণ করে—স্বপ্ন পূরণে অর্থ নয়, প্রয়োজন ইচ্ছাশক্তি, অধ্যবসায় ও কঠোর পরিশ্রম।

তাদের প্রত্যাশা, দেশের পররাষ্ট্র সেবায় দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে তানভীর রহমান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল করবেন। একই সঙ্গে তার এই অর্জন নেত্রকোনাসহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের বড় স্বপ্ন দেখতে অনুপ্রাণিত করবে।