বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক, পিএইচডি শিক্ষার্থী, তাঁর সঙ্গে দেশে ছুটি কাটিয়ে চীনে ফিরছিলাম। বিমানবন্দরের অভিবাসন কর্মকর্তা জানতে চাইলেন, কোথায় যাচ্ছি। আমরা বললাম, চীনে পড়াশোনা করতে। তিনি বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘চীনেও পড়াশোনা হয় নাকি?’ তাঁর বিস্ময় আমাকে ভাবিয়েছিল। সেই প্রশ্নের জবাবই যেন এই লেখার মূল বিষয়।
প্রথম বিস্ময়: পরিচিতি অনুষ্ঠানে সাংস্কৃতিক পার্থক্য
২০২৪ সালে চীনা সরকারের বৃত্তি নিয়ে শিয়ামেন বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে স্নাতকোত্তর করতে যাই। চীন নিয়ে আমাদের অনেকের ধারণা গড়ে ওঠে দূর থেকে শোনা গল্পের ভিত্তিতে। কিন্তু শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করার পর সেই ধারণার অনেকটাই পাল্টে যায়। প্রথম বিস্ময়ের মুখোমুখি হই পরিচিতি অনুষ্ঠানে (ওরিয়েন্টেশন)। আগে থেকেই জানানো হয়েছিল ফরমাল পোশাক পরে যেতে হবে। বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা থেকে আমি স্যুট-কোট পরে হাজির হলাম। গিয়ে দেখি, পুরো মাঠে আমিই একমাত্র স্যুটেড-বুটেড মানুষ। অন্যরা সাধারণ পোশাকে স্বচ্ছন্দ। সাংস্কৃতিক পার্থক্যের প্রথম পাঠ সেখানেই।
শিক্ষকদের আন্তরিকতা ও ব্যক্তিগত মনোযোগ
শিক্ষকদের আচরণও আমাকে মুগ্ধ করেছে। প্রথম দিন শ্রেণিকক্ষে ঢুকতেই শিক্ষক আমাকে নাম ধরে স্বাগত জানালেন। পরে জানলাম, ভর্তি পরীক্ষার সাক্ষাৎকার তিনিই নিয়েছিলেন এবং আমার কথা তাঁর মনে ছিল। শিক্ষার্থীর প্রতি এই ব্যক্তিগত মনোযোগ আমার কাছে নতুন অভিজ্ঞতা ছিল।
ক্যাশলেস সমাজের চ্যালেঞ্জ
চীন প্রায় পুরোপুরি নগদবিহীন (ক্যাশলেস) সমাজে পরিণত হয়েছে। ব্যাংক হিসাব খুলতে আমাদের এক সপ্তাহের মতো সময় লেগেছিল। ফলে খাবার কেনা থেকে শুরু করে নিত্যদিনের কাজেও ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যানটিনে নগদ টাকা নেওয়া হতো না। অনেক সময় অন্যদের অনুরোধ করতে হয়েছে আমাদের হয়ে অর্থ পরিশোধের জন্য। কখনো কখনো না খেয়েই ফিরে আসতে হয়েছে। ব্যাংক হিসাব চালু হওয়ার পর অবশ্য সবকিছু সহজ হয়ে যায়।
শ্রেণিকক্ষে মুক্ত বিতর্কের সংস্কৃতি
আমার স্বভাব বরাবরই প্রশ্ন করা এবং তর্কে অংশ নেওয়ার। অনেকেই সাবধান করেছিলেন, চীনের শ্রেণিকক্ষে নাকি বেশি প্রশ্ন করা ভালো চোখে দেখা হয় না। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা ছিল ভিন্ন। প্রায় প্রতিটি আলোচনায় অংশ নিয়েছি, মতামত দিয়েছি, শিক্ষকদের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছি। কোথাও বিরূপ প্রতিক্রিয়া পাইনি। বরং তাঁরা যুক্তি শুনতে আগ্রহী ছিলেন।
বহুসংস্কৃতির সহপাঠীদের আন্তরিকতা
আমাদের মূল শ্রেণিতে ছিল পাঁচজন শিক্ষার্থী—ইন্দোনেশিয়া, মিয়ানমার, ঘানা, এল সালভাদরের এবং বাংলাদেশ থেকে আমি নিজে। আমি ছিলাম একমাত্র পুরুষ ও একমাত্র মুসলিম। সহপাঠীদের আন্তরিকতা আমাকে মুগ্ধ করেছে। বাইরে খেতে গেলে তারা নিজেরাই হালাল খাবারের রেস্তোরাঁ খুঁজে বের করত। ভিন্ন সংস্কৃতি ও ধর্মের হওয়া সত্ত্বেও আমাদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ গড়ে ওঠে।
শিক্ষকদের সংবেদনশীলতা
শিক্ষকদের মধ্যেও এই সংবেদনশীলতা ছিল। একবার মধ্যাহ্নভোজের সময় একজন অধ্যাপক আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘হাসান, তোমার জন্য তো হালাল খাবার লাগবে।’ (ওহ হাসান, ইউ আর হালাল!) ওনার বলার ভঙ্গিমায় মুহূর্তেই হাসির রোল পড়ে যায়। আন্তরিকতার সেই মুহূর্তগুলো বিদেশের মাটিকেও আপন করে তুলেছিল।
নন-ট্রেডিশনাল সিকিউরিটি কোর্সের অভিজ্ঞতা
বিশেষভাবে মনে আছে অপ্রচলিত নিরাপত্তা (নন–ট্রেডিশনাল সিকিউরিটি) বিষয়ে একটি পাঠক্রমের কথা। শিক্ষক তিনটি ভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন দিতেন। একটি এক পক্ষের, আরেকটি বিপরীত পক্ষের এবং তৃতীয়টি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের। প্রতিবেদন পড়া, প্রামাণ্যচিত্র দেখা, দলীয় আলোচনা এবং শেষে নিজস্ব বিশ্লেষণ লিখে জমা দেওয়া ছিল পাঠের ধাপ। শিক্ষক নিজে খুব কম কথা বলতেন। বরং শিক্ষার্থীদের ভাবতে, প্রশ্ন করতে ও বিতর্ক করতে উৎসাহ দিতেন।
রমজানে ক্লাসের অদ্ভুত অভিজ্ঞতা
রমজান মাসে এই পাঠক্রমে একটি অদ্ভুত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলাম। বিকেলে তিন ঘণ্টার ক্লাসে বিশ্বের নানা দেশের পথের খাবার (স্ট্রিট ফুড) নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র দেখানো হতো। রোজা রেখে বিশাল পর্দায় সুস্বাদু খাবারের দৃশ্য দেখা সহজ ছিল না। ঈদের পর যখন ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় শিক্ষক জানতে পারলেন, সে সময় রমজান চলছিল, তখন তিনি দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন। এই ছোট ঘটনাও তাঁর মানবিক দিকটি তুলে ধরেছিল।
তুলনামূলক রাজনীতি ও নিজ দেশের রাজনীতি বোঝা
তুলনামূলক রাজনীতি (কমপ্যারেটিভ পলিটিকস) বিষয়ে আরেকটি পাঠক্রমে প্রত্যেকে নিজ দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা তুলে ধরত। আমরা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের ফলাফল নিয়েও পূর্বাভাস দিয়েছিলাম। এতে অন্য দেশের রাজনীতি বোঝার পাশাপাশি নিজের দেশের ব্যবস্থাকেও নতুনভাবে দেখার সুযোগ তৈরি হয়েছিল।
চীনা দৃষ্টিভঙ্গির সাথে পরিচিতি
তবে সবচেয়ে বেশি নাড়া দিয়েছিল বৈশ্বিক রাজনৈতিক অর্থনীতিতে চায়নার ভূমিকা (চায়না’স রোল ইন গ্লোবাল পলিটিক্যাল ইকোনমি) বিষয়ে একটি পাঠক্রম। আমার ধারণা ছিল, চীনে ক্লাসরুমে চীনা দৃষ্টিভঙ্গিই বেশি গুরুত্ব পাবে। কিন্তু পাঠ্যসূচির বড় অংশ ছিল পাশ্চাত্য তত্ত্বভিত্তিক। একদিন চীনের বৈশ্বিক উদ্যোগ নিয়ে আলোচনায় আমি বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি (রিয়ালিজম) থেকে যুক্তি দিই যে রাষ্ট্রের প্রতিটি পদক্ষেপের পেছনে স্বার্থ কাজ করে। একই কথা সত্য চীনের ক্ষেত্রেও। অধ্যাপক পাল্টা বলেন, চীনা ভাবনায় বিশ্বকে একটি বৃহৎ পরিবারের মতো দেখা হয়। পরে তিনি আমাদের পরিচয় করিয়ে দেন ‘তিয়ানশিয়া’ ধারণার সঙ্গে, যার অর্থ ‘আকাশের নিচে সবাই এক’। আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে দেখার এক ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি আমার সামনে উন্মোচিত হয়। পশ্চিমা রাষ্ট্রব্যবস্থার ধারণার পাশাপাশি চীনা চিন্তার জগৎও যে রয়েছে, তা নতুন করে উপলব্ধি করি।
শেষ কথা: শিক্ষা মানে নতুন চোখে দেখা
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা সম্ভবত এটিই ছিল যে শ্রেণিকক্ষ মানে শুধু পাঠ্যপুস্তক নয়। এটি প্রশ্ন করার জায়গা, দ্বিমত প্রকাশের জায়গা এবং নতুন চোখে পৃথিবীকে দেখার জায়গা। সেখানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী একসঙ্গে শেখে, তর্ক করে এবং নিজের ধারণাকে নতুন করে যাচাই করে। তাই সেই অভিবাসন কর্মকর্তার প্রশ্নের উত্তরে আজ আমি নিশ্চিন্তে বলতে পারি, হ্যাঁ, চীনেও পড়াশোনা হয়। শুধু পড়াশোনা নয়, ভাবনার নতুন জানালাও সেখানে খুলে যায়।
*লেখক: মাহবুবুল হাসান, শিক্ষার্থী, শিয়ামেন ইউনিভার্সিটি, চায়না



