চা বাগান থেকে আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়: কুসুম মুন্ডার অদ্বিতীয়া যাত্রা
চা বাগান থেকে আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়: কুসুম মুন্ডার গল্প

প্রথম আলো ট্রাস্টের ‘অদ্বিতীয়ার গল্প’ অনুষ্ঠানের এই পর্বে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কুসুম মুন্ডা। তিনি বর্তমানে চট্টগ্রামের এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনে (এইউডব্লিউ) স্নাতক প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। অনুষ্ঠানের শুরুতেই কুসুমকে স্বাগত জানিয়ে জিজ্ঞাসা করা হয় তাঁর বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে। কুসুম জানান, তিনি ভালো আছেন এবং অনুষ্ঠানের আয়োজকদেরও খোঁজ নেন।

অদ্বিতীয়া বৃত্তির সন্ধান

প্রথম আলো ট্রাস্ট জানতে চায়, চা বাগানের নিভৃত অঞ্চল থেকে কীভাবে তিনি আন্তর্জাতিক মানের এই বিশ্ববিদ্যালয়ের খবর পেয়েছিলেন। কুসুম বলেন, ইন্টারমিডিয়েট লেভেলে পড়ার সময় তিনি এইউডব্লিউ সম্পর্কে জানতে পারেন। এলাকার কয়েকজন দাদা, বিশেষ করে বিজয় দাদা, তাঁকে জানান যে চট্টগ্রামে মেয়েদের জন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয় আছে যেখানে পাঁচ বছরের ফুল ফ্রি স্কলারশিপে পড়ার সুযোগ রয়েছে। এর আগে তিনি জানতেনই না যে তাঁর মতো মেয়েদের জন্য এত বড় একটি সুযোগ আছে। অদ্বিতীয়া বৃত্তি সম্পর্কে জানতে পেরে তিনি মনে করেন, এটি চা বাগান থেকে আসা মেয়েদের জন্য এক বিশাল আশীর্বাদ। এই সহযোগিতা পাওয়ার পর তাঁর আত্মবিশ্বাস অনেক বেড়ে যায়।

শৈশবের কঠিন পথ

ছোটবেলার গল্প বলতে গিয়ে কুসুম জানান, চা বাগানের জীবন সাধারণ জীবনের চেয়ে অনেক আলাদা। একটি সংবাদপত্রের শিরোনাম ছিল, ‘১৭০ টাকা দিয়ে চলে কুসুমের পরিবার’। বর্তমান যুগে মাত্র ১৭০ টাকা মজুরিতে ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া মেনটেইন করা যায় না, সেখানে পড়াশোনার কথা চিন্তা করা ছিল বিলাসিতা। তাঁর পড়াশোনা শুরু হয় বাগানের ‘নির্মল শিক্ষাকেন্দ্র’ নামের একটি প্রাইমারি স্কুলে। প্রাথমিক পর্যায়ে খুব অসুবিধা না হলেও হাই স্কুলে উঠলে সমস্যা শুরু হয়। স্কুল ছিল অনেক দূরে, হেঁটে যেতে হতো। মা-বাবা টিফিনের জন্য মাত্র ১০ টাকা দিতেন, যা তিনি খরচ না করে জমিয়ে রাখতেন ভালো খাতা-কলম কেনার জন্য। প্রাইভেট পড়ার সামর্থ্য না থাকায় বাগানের কোচিং সেন্টার ও নিজের চেষ্টাতেই মাধ্যমিক পর্যন্ত এসেছেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বিজ্ঞান পছন্দের পেছনে স্বপ্ন

চা বাগানের সীমাবদ্ধ পরিবেশে বিজ্ঞান বেছে নেওয়া ছিল সাহসী সিদ্ধান্ত। কুসুম জানান, স্কুলের শিক্ষকেরা বলতেন বিজ্ঞান নিয়ে পড়লে ডাক্তার হওয়া যায়। তখন থেকেই তাঁর স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হওয়া। কিন্তু বিজ্ঞানের বিষয়গুলো বোঝার জন্য গাইডেন্স বা প্রাইভেট টিউটরের সামর্থ্য তাঁর বাবা-মায়ের ছিল না। তিনি স্কুলের স্যারদের অনুরোধ করতেন সাহায্য করার জন্য। ক্লাস নাইনে পড়ার সময় তিনি প্রচণ্ড পরিশ্রম করতেন। সারা দিন বাড়ির কাজ করার পর রাতে হারিকেনের আলোতে পড়াশোনা করতেন। অনেক সময় পড়তে পড়তেই বই নিয়ে ঘুমিয়ে পড়তেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল টপার হওয়া, ভালো রেজাল্ট করা।

অসুস্থতা ও লড়াই

এই যাত্রায় এক ভয়াবহ অসুস্থতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কুসুম বলেন, অতিরিক্ত পড়াশোনার চাপে ক্লাস টেনে থাকাকালীন তিনি ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েন। অসুস্থতা এতটাই গুরুতর ছিল যে তিনি এসএসসি পরীক্ষাই দিতে পারেননি। তাঁর বাবা-মা চা বাগানের শ্রমিক হয়েও তাঁকে বাঁচানোর জন্য সবটুকু উজাড় করে দিয়েছিলেন। জমি, গাছ, গরু—সব বিক্রি করে তাঁর চিকিৎসা করিয়েছেন। প্রায় ২০-৩০ জন ডাক্তার দেখানো হয়েছিল, কিন্তু কেউ রোগ ধরতে পারছিলেন না। টানা দুই বছর তিনি শয্যাশায়ী ছিলেন। কিন্তু মনের জেদ ছিল যে তাঁকে পড়তেই হবে। অসুস্থ অবস্থায় শুয়ে শুয়েই পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতেন। শেষ পর্যন্ত পরীক্ষা দিতে যাওয়ার সময় মা সঙ্গে যেতেন পাছে তিনি রাস্তায় পড়ে না যান। এভাবেই অনেক কষ্ট করে এসএসসি ও এইচএসসি পার করেন।

স্বপ্ন পরিবর্তনের কারণ

ছোটবেলার স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হওয়া, কিন্তু এখন তিনি বিসিএস দিয়ে শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন। কুসুম বলেন, বাস্তবতা অনেক সময় স্বপ্ন বদলে দেয়। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেলেও আর্থিক অবস্থা বিবেচনা করে ভর্তি হতে পারেননি। সবশেষে ফুল ফ্রি স্কলারশিপ পেয়ে এইউডব্লিউতে আসেন। শিক্ষকতাকে বেছে নেওয়ার কারণ হলো, তিনি অনুভব করেছেন তাঁর চা বাগানের মানুষ শিক্ষার দিক থেকে অনেক পিছিয়ে আছে। ডাক্তার হতে না পারলেও শিক্ষক হয়ে তিনি কমিউনিটির অনেক অভাবী মেধাবী শিক্ষার্থীর পাশে দাঁড়াতে পারবেন। তিনি চান তাঁর মাধ্যমে বাগানে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে পড়ুক।

ইংরেজি ভাষার চ্যালেঞ্জ

এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন একটি আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়। ক্লাসরুম থেকে রুমমেট—সবই আন্তর্জাতিক এবং ভাষা মাধ্যম ইংরেজি। বাংলা মিডিয়াম থেকে গিয়ে এই ইংরেজি পরিবেশে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেওয়া ছিল কঠিন। কুসুম বলেন, প্রথম দিকে ক্লাসে শিক্ষকেরা ইংরেজিতে লেকচার দিলে তাঁর মনে হতো সব মাথার ওপর দিয়ে যাচ্ছে। তিনি ক্লাসগুলো ফোনে রেকর্ড করে এনে বারবার শুনতেন। তবে তিনি দমে যাননি। নিজে নিজে ছাদের ওপর গিয়ে ইংরেজিতে কথা বলার প্র্যাকটিস করতেন, ভিডিও করতেন এবং অন্যদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করতেন। এখন তিনি নিজেকে ইংরেজি দক্ষতায় ১০ এর মধ্যে ৮ দেবেন।

ভবিষ্যতের জন্য পরামর্শ

যারা ভবিষ্যতে প্রতিকূল পরিবেশ থেকে এমন আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে আসবে, তাদের জন্য কুসুমের পরামর্শ—শুরুটা কঠিন হলেও হাল ছাড়া যাবে না। সবার সঙ্গে মেলামেশা করা এবং বিশেষ করে ইংরেজি বলার অভ্যাস করাটা খুব জরুরি। ভয় না পেয়ে মানুষের সঙ্গে কথা বললে বন্ডিং তৈরি হয় এবং পরিবেশটা সহজ হয়ে যায়। চেষ্টা করলে যেকোনো পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া সম্ভব।

প্রথম আলো ট্রাস্ট কুসুমকে ধন্যবাদ জানিয়ে তাঁর শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন সফল হওয়ার শুভকামনা জানায়। কুসুমের জীবনযুদ্ধের গল্প সবার জন্য এক বড় শিক্ষা।