দ্রুত পরিবর্তনশীল এই বিশ্বে শিক্ষা আর কেবল পাঠ্যবইয়ের গণ্ডিতে আটকে নেই। প্রয়োজন সৃজনশীলতা, সহনশীলতা ও বৈশ্বিক দক্ষতার সমন্বয়। ফ্রোবেল স্কুলস—যার অন্তর্ভুক্ত ফ্রোবেল প্লে স্কুল (চট্টগ্রাম), ফ্রোবেল প্লে স্কুল–ঢাকা এবং ফ্রোবেল একাডেমি; এই পরিবর্তনের অগ্রভাগে থেকে একটি সামগ্রিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করেছে, যা মূলত উদ্ভাবন ও মানবিক যত্নের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে।
লক্ষ্যভিত্তিক এক দৃষ্টিভঙ্গি
ফ্রোবেলের যাত্রা শুরু হয় ২০০৩ সালে, চট্টগ্রামে ফ্রোবেল প্লে স্কুল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে, যা ছিল শহরের প্রথম প্রি-স্কুলগুলোর একটি। প্রারম্ভিক শৈশব শিক্ষার পথিকৃৎ ফ্রিডরিখ ফ্রোবেলের দর্শন থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে এই প্রতিষ্ঠান বিশ্বাস করে শিশুরা খেলাধুলা, অনুসন্ধান ও সৃজনশীলতার মাধ্যমে সবচেয়ে ভালো শেখে।
২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ফ্রোবেল একাডেমি, যার লক্ষ্য ছিল মূলধারার শিক্ষায় অন্তর্ভুক্তিকে আরও শক্তিশালী করা। একটি সাহসী উদ্যোগ হিসেবে শুরু হওয়া এই প্রতিষ্ঠান এখন চট্টগ্রাম ও ঢাকাজুড়ে বিস্তৃত একটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে, যেখানে প্রারম্ভিক শিক্ষা থেকে এ লেভেল পর্যন্ত শিক্ষার সুযোগ রয়েছে।
বৈশ্বিক মানে একাডেমিক উৎকর্ষ
ফ্রোবেল স্কুলস আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী একটি ধারাবাহিক শিক্ষাকাঠামো প্রদান করে। চট্টগ্রাম ও ঢাকার ফ্রোবেল প্লে স্কুলগুলো কেমব্রিজ আর্লি ইয়ার্স কারিকুলাম অনুসরণ করে, যেখানে খেলাধুলাভিত্তিক ও কাঠামোবদ্ধ শিক্ষার সমন্বয় রয়েছে। প্লে গ্রুপ, নার্সারি, লোয়ার ও আপার কিন্ডারগার্টেন লেভেলে শিশুদের বয়সোপযোগী শিক্ষাক্রমে অংশগ্রহণের সুযোগ থাকে।
২০২৩ সালে প্রতিষ্ঠিত ফ্রোবেল প্লে স্কুল–ঢাকা ক্যাম্পাসে প্রকৃতিনির্ভর শিক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এখানে রয়েছে লাইট ল্যাব, সেন্সরি আউটডোর প্লে এরিয়া ও ওপেন কোর্টইয়ার্ড রিডিং স্পেস। এ ছাড়া এখানে আর্লি ইন্টারভেনশন সেন্টারের মাধ্যমে শিশুদের বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা হয়।
এখানে ‘জলি ফনিক্স’ পদ্ধতিতে ইংরেজি আর ‘জোডো গ্যান’ পদ্ধতিতে গণিত শেখানো হয়। অর্থাৎ এখানে পড়াশোনা হয় অর্থবহ কার্যক্রমের মাধ্যমে। পাশাপাশি মাইন্ডফুলনেস, ব্রেন জিম, যোগব্যায়াম, সংগীত, নৃত্য, শিল্পকলা, কারাতে ও খেলাধুলায় সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়, যা সামাজিক-আবেগিক দক্ষতা (এসইএল) গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
প্রাইমারি থেকে এ লেভেল
ফ্রোবেল একাডেমিতে গ্রেড ১ থেকে আইজিসিএসই/ও লেভেল এবং এ লেভেল পর্যন্ত শিক্ষার সুযোগ রয়েছে, যা কেমব্রিজ অ্যাসেসমেন্ট ইন্টারন্যাশনাল এডুকেশনের মানদণ্ড অনুযায়ী পরিচালিত হয়। এখানে একাডেমিক উৎকর্ষের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্রিটিক্যাল থিঙ্কিং, প্রবলেম সলভিং স্কিলস ও গ্লোবাল অ্যাওয়ারনেস গড়ে তোলা হয়।
এই প্রতিষ্ঠানের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো স্টিমস (STEMS) প্রোগ্রাম, যেখানে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল, শিল্প, গণিত ও ক্রীড়াকে হাতে-কলমে শিক্ষার মাধ্যমে একত্র করা হয়। শিক্ষার্থীরা কৃষিকাজ, টেকসই উন্নয়ন, কাঠের কাজ, রান্না, মৃৎশিল্প, ডিজিটাল প্রিন্টিং ও স্টেম এক্সপ্লোরেশনে অংশ নেয়।
এ ছাড়া রয়েছে রোবোটিকস ল্যাব, স্টেম ও মেকারস্পেস, ম্যাথ ল্যাব, দুই তলাবিশিষ্ট লাইব্রেরি, উইগল রুম, এনরিচমেন্ট সেন্টার, বাস্কেটবল কোর্ট ও ফুটবল মাঠ। এমনকি ক্যাম্পাসে থাকা দুটি পোনি শিক্ষার্থীদের প্রকৃতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াতে সহায়তা করছে।
শিক্ষার্থীদের কমিউনিটি সার্ভিস কার্যক্রমেও যুক্ত করা হয় এখানে। যেমন এতিমখানায় সহায়তা, বৃদ্ধাশ্রমে সময় দেওয়া বা বস্তির স্কুলের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলা। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে সচেতনতা, রিসাইক্লিং, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও রেইনওয়াটার হারভেস্টিং কার্যক্রমেও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়।
অন্তর্ভুক্তি ও সুস্থতার প্রতিশ্রুতি
ফ্রোবেল স্কুলস অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এখানে অকুপেশনাল থেরাপি, স্পিচ থেরাপি, এনরিচমেন্ট প্রোগ্রাম, আর্লি ইন্টারভেনশন ও ভোকেশনাল ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে প্রতিটি শিশুকে তার প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা দেওয়া হয়। এর ফলে প্রত্যেক শিক্ষার্থী তার নিজস্ব সক্ষমতা অনুযায়ী বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায়।
স্বীকৃতি ও সাফল্য
ফ্রোবেল স্কুলস তাদের উৎকর্ষের জন্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন পুরস্কার অর্জন করেছে, যার মধ্যে রয়েছে ব্রিটিশ কাউন্সিল টিচার্স রিকগনিশন অ্যাওয়ার্ড (২০২৫), ব্রিটিশ কাউন্সিল ইনক্লুশন অ্যাওয়ার্ড (২০২৫), লাক্স এডুকেশন অ্যাওয়ার্ডস (২০২৫) এবং বাংলাদেশ ব্র্যান্ড ফোরাম ইনোভেশন অ্যাওয়ার্ডস (২০২১–২০২৩)।
বাংলাদেশে শিক্ষার নতুন সংজ্ঞা
ফ্রোবেল স্কুলস কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, এটি একটি যত্নশীল ও শক্তিশালী কমিউনিটি; যেখানে শিশুদের আত্মবিশ্বাসী, সহানুভূতিশীল ও দক্ষ নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা হয়। আন্তর্জাতিক মান ও স্থানীয় প্রাসঙ্গিকতা, একাডেমিক উৎকর্ষ ও আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা, অন্তর্ভুক্তি ও সৃজনশীলতার সমন্বয়ে ফ্রোবেল বাংলাদেশে শিক্ষার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে।



