বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা: গুণগত সংকট ও উত্তরণের পথ
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা: গুণগত সংকট ও উত্তরণ

বর্তমানে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা উদ্বেগজনক সংকটের আবর্তে নিপতিত। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা, বিশেষত বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনসমূহ আমাদের চোখে আঙুল দিয়া দেখাইয়া দিতেছে এক রূঢ় ও অপ্রিয় সত্য। তাহাদের মতে, বাংলাদেশে শিক্ষার হার কাগজে কলমে বৃদ্ধি পাইলেও গুণমানের দিক হইতে পশ্চাৎপদ। ইহা অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, একজন উচ্চমাধ্যমিক উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর লব্ধ জ্ঞান আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে মাত্র সপ্তম শ্রেণির সমতুল্য বলিয়া বিবেচিত হইতেছে। এই যে বিশাল 'শিক্ষণ ঘাটতি', ইহাতে জাতির মেরুদণ্ড ভাঙিয়া পড়িবার উপক্রম বলিলে কি অত্যুক্তি হইবে?

শিক্ষার মানে অধোগতির মূল কারণ

শিক্ষার মানে এই অধোগতির মূলে রহিয়াছে বহুবিধ কারণ। প্রথমত, মানসম্মত শিক্ষার প্রধান অন্তরায় হইল দক্ষ ও যোগ্য শিক্ষকের অভাব। ইউনেস্কোর এক তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ায় মাধ্যমিক স্তরে দক্ষ শিক্ষকের হারে বাংলাদেশ অবস্থান করিতেছে সর্বনিম্নে। কারণ এই স্তরে ৫৫ শতাংশ শিক্ষক পূরণ করিতে পারিতেছেন না ন্যূনতম দক্ষতার মান। তাহা ছাড়া শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতা, দলীয় রাজনৈতিক প্রভাব এবং পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব এই সংকটকে করিয়াছে আরও ঘনীভূত।

দ্বিতীয়ত, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা আজ কেবল 'সার্টিফিকেট'-সর্বস্ব হইয়া পড়িয়াছে। পরীক্ষার জন্য পড়া নাকি পড়ার জন্য পরীক্ষা-ইহাই হইয়া উঠিয়াছে বড় প্রশ্ন। একমুখী শিক্ষার অভাবে তৈরি হইয়াছে বিশৃঙ্খলা। বেসরকারিকরণের মূল লক্ষ্য-উদ্দেশ্য অনুধাবন করিতে না পারিবার কারণে বৃদ্ধি পাইয়াছে ইহার বাণিজ্যিকীকরণ। সরকারি শিক্ষাব্যবস্থায় তৈরি হইয়াছে অব্যবস্থাপনা। বেসিক শিক্ষা বলিতে গেলে আজ খুবই অবহেলিত। আগের মতো শিক্ষকদের শিখানোর প্রতি আগ্রহ ও আন্তরিকতা তেমন নাই।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বেসরকারি শিক্ষাব্যবস্থায় অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের উপর চাপ ক্রমবর্ধমান। কোচিং, প্রাইভেট টিউটর দিয়াও কুলানো যায় না; কিন্তু কেন, সেই প্রশ্ন কি কেহ করিতেছেন? শিক্ষাবাণিজ্যের কদর্য রূপ লক্ষণীয়। আদর্শ শিক্ষকের সংকট সর্বত্র। ইহা ছাড়া জীবনমুখী ও বাস্তবধর্মী শিক্ষা অনেকটাই অনুপস্থিত। শিক্ষার্থীরা ঘুরপাক খাইতেছে জিপিএ-৫ লাভের গোলকধাঁধায়। ফলে উচ্চশিক্ষিত বেকারগোষ্ঠী গড়িয়া উঠিলেও কর্মবাজারের চাহিদা অনুযায়ী তৈরি হইতেছে না দক্ষ জনশক্তি।

উত্তরণের পথ

শিক্ষাব্যবস্থার এই কাঠামোগত ও দৃষ্টিভঙ্গিগত ব্যর্থতা হইতে উত্তরণ আজ সময়ের দাবি। প্রথমত, নিয়োগ প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করিয়া মেধা ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগ দিতে হইবে। নিশ্চিত করিতে হইবে শিক্ষকদের পর্যাপ্ত বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা। শিক্ষাব্যবস্থাকে একমুখী ও ৯০ শতাংশ সরকারি করা উচিত। মাত্র ১০ শতাংশ থাকিতে পারে বেসরকারি ও দাতব্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। আমরা মনে করি, শিক্ষকের মানোন্নয়নই শিক্ষার মানোন্নয়নের সর্বশ্রেষ্ঠ পথ। তাই তাহাদের মানসম্মত বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা অপরিহার্য।

দ্বিতীয়ত, শিক্ষাব্যবস্থাকে রাজনীতির সংকীর্ণ গণ্ডি হইতে মুক্ত করিয়া একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় শিক্ষানীতির অধীনে আনিতে হইবে। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে যেন শিক্ষানীতি বা পাঠ্যসূচির আমূল পরিবর্তন না ঘটে, তাহা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে পাঠ্যদক্ষতার উপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করিতে হইবে। চতুর্থত, শিক্ষা ও শ্রমবাজারের মধ্যে একটি সুদৃঢ় সংযোগ স্থাপন করিতে হইবে। তাত্ত্বিক শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসার ঘটানো এখন অনিবার্য হইয়া পড়িয়াছে। গবেষণায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের মান তদারকির মাধ্যমে বিশ্ব র‍্যাংকিংয়ে আমাদের অবস্থান সুসংহত করিতে হইবে।

সত্যি বলিতে কি-বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়াইয়া আছে। কেবল পাশের হারের 'সস্তা পরিসংখ্যান' দিয়া জাতির প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নহে। আমাদের এই কথা অনুধাবন করিতে হইবে যে, একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে গুণগত শিক্ষার কোনো বিকল্প নাই। মূলত আমাদের জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থা হইতে হইবে অন্তর্ভুক্তিমূলক, ন্যায়সংগত ও জীবনব্যাপী শেখার সুযোগ প্রদানকারী। কারিকুলামকে আউটকাম ও কমপিটেন্সি বেজড করিয়া শিক্ষার্থীদের বাস্তব দক্ষতা অর্জনে সহায়ক করিয়া তুলিতে হইবে।