জুতাপেটার শিকার নারী শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্ত করার নির্দেশ
জুতাপেটার শিকার নারী শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্ত

রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার দাওকান্দি সরকারি কলেজে বিএনপি নেতার হাতে জুতাপেটার শিকার নারী শিক্ষক আলেয়া খাতুনকে সাময়িক বরখাস্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রবিবার (২৬ এপ্রিল) দুপুরে কলেজ পরিদর্শন করে এ নির্দেশ দেন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার রাজশাহী অঞ্চলের পরিচালক মোহা. আসাদুজ্জামান। একইসঙ্গে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আলেয়া খাতুন ও কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুর রাজ্জাককে এ ঘটনার ব্যাপারে লিখিত জবাব দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ঘটনার পটভূমি

শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই স্থানীয় একটি গ্রুপ এই কলেজ থেকে নিয়মিত মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করে আসছিল। বর্তমান অধ্যক্ষ আব্দুর রাজ্জাক চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় ওই গ্রুপটি তার ওপর ক্ষুব্ধ ছিল। গত বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে ‘সামাদ দারোগা’ নামে পরিচিত সাবেক পুলিশ পরিদর্শক আবদুস সামাদের নেতৃত্বে জয়নগর ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি আকবর আলী, ইউনিয়ন কৃষকদলের সভাপতি জয়নাল আবেদীন, ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সভাপতি আফাজ উদ্দিন ও বিএনপি কর্মী শাহাদত আলীসহ ১০-১২ জন দাওকান্দি সরকারি কলেজে গিয়েছিলেন। তারা মাহফিলের নামে অধ্যক্ষের কাছে বড় অঙ্কের চাঁদা দাবি করেন। অধ্যক্ষ টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে অশালীন ভাষায় কথা বলতে শুরু করেন। বিএনপির নেতারা বলেন, ‘টাকা দিতে পারবি না তো চেয়ারে কেন?’

শিক্ষকের প্রতিবাদ ও হামলা

কলেজের শিক্ষক আলেয়া খাতুন জানান, বিএনপির কর্মীরা অধ্যক্ষের চেয়ার নিয়ে কটূক্তি করলে তিনি প্রতিবাদ জানান। এ সময় বিএনপি কর্মী শাহাদত আলী ওই নারী শিক্ষককে উদ্দেশ্য করে আপত্তিকর ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করেন। রাগের মাথায় শিক্ষক আলেয়া শাহাদতকে একটি চড় মারলে শাহাদত পা থেকে স্যান্ডেল খুলে তাকে সবার সামনে পেটাতে শুরু করেন। এতে তিনি গুরুতর আহত হয়েছেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, খবর পেয়ে শাহাদত আলীর ছেলে লিটন ও কর্মচারী মাহবুব এসে দ্বিতীয় দফা অধ্যক্ষ ও ওই শিক্ষককে মারধর করেছেন। এরপর ৪০-৫০ জন বিএনপি নেতাকর্মী এসে তৃতীয় দফা কলেজ অধ্যক্ষের কার্যালয় ভাঙচুর এবং অধ্যক্ষ ও আলেয়া খাতুনকে মারধর করেন।

শিক্ষা বিভাগের ব্যবস্থা

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার রাজশাহী অঞ্চলের পরিচালক মোহা. আসাদুজ্জামান জানান, তিনি কলেজে গিয়ে দেখেন, অধ্যক্ষ আব্দুর রাজ্জাক ও আলেয়া খাতুন আসেননি। তাদের ফোনও বন্ধ। বিকল্প উপায়ে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জবাব দেওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, ‘এমপিওভুক্ত আলেয়া খাতুন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার একজন শিক্ষক। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তদন্তের স্বার্থে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে দুর্গাপুর মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে তদন্ত করতে বলা হয়েছে। সেই তদন্ত প্রতিবেদন আজ রবিবারের মধ্যে জমা দেওয়ার কথা রয়েছে। সেই তদন্ত প্রতিবেদন এবং অধ্যক্ষ ও প্রদর্শক আলেয়া খাতুনের জমা দেওয়ার প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

বিএনপির আলটিমেটাম

এর আগে গত শনিবার দাওকান্দি সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুর রাজ্জাক ও প্রদর্শক আলেয়া খাতুনকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে অপসারণের জন্য আলটিমেটাম দিয়েছিলেন বিএনপির নেতারা। নগরের সাহেববাজার জিরো পয়েন্ট এলাকার একটি রেস্তোরাঁয় আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এই সময়সীমা দিয়েছিলেন তারা।

পুলিশের অবস্থান

এদিকে আলেয়া খাতুনকে জুতাপেটা করা মৎস্যচাষি ও বিএনপির কর্মী শাহাদত আলীকে খুঁজছে পুলিশ। তার নামে আদালতের একটি গ্রেফতারি পরোয়ানা রয়েছে। গত বৃহস্পতিবার এই গ্রেফতারি পরোয়ানা নিয়েই তিনি কলেজে ঢুকে ওই শিক্ষককে পা থেকে জুতা খুলে পিটিয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।

এ বিষয়ে জানতে অধ্যক্ষ আব্দুর রাজ্জাকের সঙ্গে কোনোভাবেই যোগাযোগ করা যায়নি। ঘটনার দিন তার মোবাইল ভেঙে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তাকে পিটিয়ে আহত করা হয়। রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল সূত্র জানায়, ঘটনার দিন অধ্যক্ষ হাসপাতালে এসে চিকিৎসা নিয়ে চলে গেছেন।

আলিয়া খাতুন জানিয়েছেন, হাসপাতাল থেকে ছুটি নিয়ে তিনি একটি ক্লিনিকে চিকিৎসাধীন। তার শারীরিক অবস্থা এখনও কলেজে যাওয়ার মতো হয়নি। এ ঘটনায় আইনি ব্যবস্থা নেবেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সুস্থ হওয়ার পরেই এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবো।’

দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) পঞ্চনন্দ সরকার বলেন, ‘আগের একটি মামলায় অভিযুক্ত শাহাদত আলীর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি রয়েছে। পুলিশ তাকে খুঁজছে। আর অধ্যক্ষ আব্দুর রাজ্জাক ও শিক্ষক আলেয়া খাতুন এখনও থানায় অভিযোগ দেননি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’