উচ্চশিক্ষায় সরকারি-বেসরকারি বিতর্কের বাইরে আসার সময় এসেছে
উচ্চশিক্ষায় সরকারি-বেসরকারি বিতর্কের বাইরে আসার সময়

শিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর একটি বিতর্কিত বক্তব্যের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে নতুন করে যে বিতর্ক শুরু হয়েছে, সেটি আমাদের উচ্চশিক্ষা নিয়ে কিছু জরুরি প্রশ্ন সামনে এনেছে। এই বিতর্কে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, প্রশাসক, সাবেক শিক্ষার্থী এবং সংশ্লিষ্ট অনেকেই অংশ নিচ্ছেন। কেউ কেউ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য ও অবদান সামনে আনছেন, আবার কেউ কেউ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক অগ্রগতি, বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক মানের কথা বলছেন।

এই আলোচনা স্বাভাবিক এবং প্রয়োজনীয়। কিন্তু সমস্যা হয় তখন, যখন বিতর্কটি শিক্ষার মান, গবেষণা, অ্যাকাডেমিক স্বাধীনতা, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা কিংবা উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ নিয়ে না গিয়ে কে বড়, কে ছোট, কোনটি ‘আসল’ বিশ্ববিদ্যালয় আর কোনটি নয়, এমন মর্যাদার লড়াইয়ে পরিণত হয়।

বিতর্কের স্বরূপ ও প্রয়োজনীয়তা

বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যখন সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে বিতর্ক করে, সেটি এক ধরনের তরুণ বয়সের আবেগ, পরিচয়বোধ এবং প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবে দেখা যায়। কিন্তু শিক্ষক, প্রশাসক ও নীতিনির্ধারকদের কাছ থেকে আমরা আরও পরিণত, উদার এবং কাঠামোগত আলোচনার প্রত্যাশা করি। কারণ তাঁদের দায়িত্ব শুধু নিজেদের প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা রক্ষা করা নয় বরং গোটা উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও উন্নত করার পথ খোঁজা।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে, এবং ডেনমার্ক, যুক্তরাজ্য ও আমেরিকার তিনটি ভিন্ন শিক্ষা ব্যবস্থায় পড়ার অভিজ্ঞতা থেকে আমার বিনীত পর্যবেক্ষণ হলো— বাংলাদেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বলেন আর প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় বলেন, দুই ক্ষেত্রেই বড় ধরনের কাঠামোগত সংকট আছে। কোথাও সংকটটি ঐতিহ্যের আড়ালে ঢাকা পড়ে, কোথাও সেটি কর্পোরেট ভাষা ও অবকাঠামোর আড়ালে চাপা থাকে। পার্থক্য অনেক সময় ধরনে, কিন্তু সমস্যার গভীরতা দুই জায়গাতেই আছে।

আমরা গবেষণা, র‌্যাঙ্কিং, আন্তর্জাতিক মান, আউটকাম, গ্লোবাল ভিজিবিলিটি, এসব নিয়ে অবশ্যই আছে। কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, গবেষণা উৎপাদন, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর প্রকাশনা, ল্যাব সুবিধা, বৈশ্বিক সংযোগ, এসবকে হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও মনে রাখা জরুরি যে র‌্যাঙ্কিংয়ের প্রতিযোগিতা কখনও কখনও কর্পোরেট প্রতিযোগিতার মতো হয়ে যায়। কার মেয়াদে বিশ্ববিদ্যালয় কত ওপরে উঠলো, কে কত বেশি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেল, এসব হিসাব সামনে আসে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এর সঙ্গে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত মানোন্নয়ন, চিন্তার স্বাধীনতা, গবেষণার গভীরতা এবং জ্ঞানচর্চার পরিবেশ কতটা তৈরি হচ্ছে?

একাডেমিক স্বাধীনতা ও কাঠামোগত সংকট

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় একাডেমিক ফ্রিডম এখনও দুর্বল। শিক্ষকের নিরাপত্তা নিশ্চিত নয়। শিক্ষার্থীর স্বাধীন চিন্তার জায়গা সংকুচিত। অনেক ক্ষেত্রে নিয়োগে বৈষম্য আছে, রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্টতা আছে, ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ আছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে আবার ট্রাস্টি বোর্ডের অতিরিক্ত ক্ষমতা, কর্পোরেট চাপ, চাকরির অনিশ্চয়তা এবং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন আছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে আছে আমলাতান্ত্রিক জড়তা, রাজনৈতিক দখলদারি, আবাসন সংকট, গবেষণা তহবিলের অভাব এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কের ভাঙন।

অথচ আমরা এসব মৌলিক প্রশ্ন নিয়ে যথেষ্ট কথা বলি না। আমরা বরং আটকে থাকি কোন বিশ্ববিদ্যালয় বেশি মর্যাদাবান, কোনটি বেশি পুরোনো, কোনটি বেশি আধুনিক, কোনটি বেশি আন্তর্জাতিক, সেই প্রতিযোগিতায়।

গবেষণা ডিগ্রি ও নীতি জটিলতা

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকার সময় আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি টিমের সঙ্গে ইউজিসির আলোচনায় কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলাম। আলোচনার বিষয় ছিল, অন্তত নর্থ সাউথ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো কিছু সক্ষম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে বাংলাদেশে পিএইচডি প্রোগ্রাম চালু এবং গবেষণা তত্ত্বাবধানের অনুমতি দেওয়া যায় কি না। যুক্তিটি ছিল সহজ— এই প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেক ক্ষেত্রে ল্যাব সুবিধা, শিক্ষকদের মান, গবেষণা পরিবেশ এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো শক্তিশালী।

প্রায় দুই বছর এই প্রক্রিয়া চলেছিল। এর মধ্যে অন্তত এক বছর আমি সরাসরি আলোচনার অংশ ছিলাম। নর্থ সাউথ এই অ্যাডভোকেসির জন্য আন্তরিকভাবে চেষ্টা করেছিল। কিন্তু অভিজ্ঞতা থেকে মনে হয়েছে, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় এখনও একটি গভীর প্রাতিষ্ঠানিক অনীহা আছে, বিশেষ করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে গবেষণা ডিগ্রি দেওয়ার ক্ষেত্রে। অনেক সময় এই অনীহার পেছনে মান নিয়ন্ত্রণের যুক্তি থাকে, যা অবশ্যই বিবেচ্য। কিন্তু একই সঙ্গে ক্ষমতার ভারসাম্য, প্রাতিষ্ঠানিক একচেটিয়তা এবং পুরোনো বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক মানসিকতাও কাজ করে বলে মনে হয়।

ফলে দেখা যায়, অনেক নতুন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় পিএইচডি দেওয়ার অনুমতি পেয়ে যায়, অথচ সক্ষমতায় এগিয়ে থাকা কিছু বড় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সেই স্বীকৃতি পায় না। এখানে প্রশ্নটি পাবলিক বনাম প্রাইভেট নয়। প্রশ্নটি হলো, মানদণ্ড কি সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে? যদি কোনও প্রতিষ্ঠান গবেষণার পরিবেশ, শিক্ষক, ল্যাব, তহবিল এবং অ্যাকাডেমিক কাঠামোর দিক থেকে প্রস্তুত থাকে, তবে সেটি সরকারি না বেসরকারি, এই পরিচয় কি একমাত্র সিদ্ধান্তের ভিত্তি হওয়া উচিত?

মূল্যায়নের মানদণ্ড ও ভবিষ্যৎ লক্ষ্য

আমার আলাদা করে কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি অন্ধ পক্ষপাত নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর, নর্থ সাউথ, ব্র্যাক, আইইউবি, ইস্ট ওয়েস্ট বা অন্য যে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল্যায়ন হওয়া উচিত তাদের প্রকৃত অবদান, গবেষণা, শিক্ষার মান, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর পরিবেশ এবং সামাজিক দায়িত্বের ভিত্তিতে। পুরোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু ঐতিহ্য একা ভবিষ্যৎ তৈরি করে না। আবার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভবন, ইংরেজি ভাষা, আন্তর্জাতিক র‌্যাঙ্কিং বা কর্পোরেট উপস্থাপনাও একা মানের নিশ্চয়তা দেয় না।

একটা বিষয় খুব পরিষ্কারভাবে মনে রাখা দরকার— জ্ঞান কখনও সরকারি-বেসরকারি ভেদাভেদ করে না। ভালো পরিবেশ পেলে জ্ঞান সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও বিকশিত হয়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও বিকশিত হয়। আর পরিবেশ খারাপ হলে, পুরোনো গৌরব, চকচকে অবকাঠামো, বড় বিজ্ঞাপন, কিংবা র‌্যাঙ্কিংয়ের ভাষা দিয়ে শিক্ষার্থীদের বেশিদিন ধরে রাখা যায় না।

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ধুঁকে ধুঁকে প্রায় রুগ্ন হয়ে পড়েছে। ইনোভেশন নেই, শিক্ষকের নিরাপত্তা নেই, অ্যাকাডেমিক স্বাধীনতা কোণঠাসা, কাজের সুযোগ সীমিত, গবেষণার অর্থায়ন দুর্বল, নিয়োগে বৈষম্য আছে, রাজনৈতিক প্রভাব আছে, কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণ আছে, ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ আছে। এগুলোই আমাদের আসল আলোচনার বিষয় হওয়া উচিত।

আচ্ছা, ধরেই নিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বা জাহাঙ্গীরনগর নর্থ সাউথ ও ব্র্যাকের থেকে বড়। আবার কেউ যদি মনে করেন নর্থ সাউথ বা ব্র্যাক এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমান মানের, সেটিও বিতর্কের বিষয় হতে পারে। কিন্তু তাতে মূল প্রশ্নের কতটা সমাধান হয়? একটি দেশের জন্য কোনটা বেশি আনন্দের? একটি বা দুটি বড় বিশ্ববিদ্যালয় থাকা, নাকি অন্তত বিশটি বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি হওয়া? বাংলাদেশের মতো জনবহুল, তরুণ এবং উচ্চশিক্ষামুখী দেশে আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত বহু শক্তিশালী বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করা। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় শক্তিশালী হবে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ও শক্তিশালী হবে। ঢাকার বাইরে বিশ্ববিদ্যালয় শক্তিশালী হবে। গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি হবে। শিক্ষাদানকেন্দ্রিক বিশ্ববিদ্যালয় থাকবে। কারিগরি ও পেশাভিত্তিক উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান উন্নত হবে। এই বহুমাত্রিক উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাই একটি দেশের জন্য স্বাস্থ্যকর।

উপসংহার

তাই সরকারি বনাম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংকীর্ণ বিতর্কের বাইরে আসা দরকার। প্রশ্ন হওয়া উচিত, কোন প্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীদের ভালোভাবে প্রস্তুত করছে, কোথায় শিক্ষক নিরাপদ, কোথায় গবেষণা সম্ভব, কোথায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আছে, কোথায় নিয়োগ স্বচ্ছ, কোথায় শিক্ষার্থীরা শুধু ডিগ্রি নয়, চিন্তা করার ক্ষমতা অর্জন করছে? শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীরাই ঠিক করে নেবে কোন প্রতিষ্ঠান তাদের সময়, শ্রম, টাকা এবং ভবিষ্যতের যোগ্য। শিক্ষক ও নীতিনির্ধারকদের কাজ হলো সেই বিচারকে সহজ করা, বিভ্রান্ত করা নয়।

একটু উদার হতে শিখি। ক্ষতি তো নেই।

লেখক: গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক