বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দীর্ঘদিন ধরে দেশের উচ্চশিক্ষার প্রধান ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। প্রতি বছর লাখো শিক্ষার্থী কঠোর প্রতিযোগিতার মাধ্যমে এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পায়, আর সেই সুযোগ অর্জনের মধ্য দিয়ে তাদের জীবনের এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়। কিন্তু এই নতুন যাত্রার শুরুতেই তারা এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়—যা অনেক ক্ষেত্রেই তাদের স্বপ্ন ও প্রত্যাশার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আবাসন সংকট, অ্যাকাডেমিক পরিবেশের নানা অসঙ্গতি, সিনিয়রদের প্রভাব, শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন এবং সাম্প্রতিক সময়ে ডিজিটাল প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার—সব মিলিয়ে উচ্চশিক্ষার চিত্র আজ অনেক বেশি জটিল ও বহুমাত্রিক হয়ে উঠেছে।
আবাসন সংকট: শিক্ষার্থীদের প্রথম বাধা
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরপরই বেশিরভাগ শিক্ষার্থীর প্রথম যে সমস্যাটি সামনে আসে—তা হলো আবাসনের সংকট। এটি কেবল একটি প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা নয়, বরং শিক্ষার্থীদের অ্যাকাডেমিক জীবনের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলা একটি গভীর সংকট। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের তথ্য অনুযায়ী দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রায় ৬০ শতাংশ শিক্ষার্থী কোনও ধরনের আবাসিক সুবিধা পায় না। অর্থাৎ বেশিরভাগ শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে মেস বা ভাড়া বাসায় থাকতে হয়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানে যেখানে হাজার হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে, সেখানে মাত্র প্রায় ১৮ শতাংশ শিক্ষার্থী হলে থাকার সুযোগ পায়। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও একই ধরনের চিত্র দেখা যায়, যেখানে বেশিরভাগ শিক্ষার্থীকে ক্যাম্পাসের বাইরে থাকতে বাধ্য হতে হয়।
এই আবাসন সংকট শুধু থাকার জায়গার অভাব নয়, এটি শিক্ষার্থীদের মানসিক স্থিতি ও পড়াশোনার ধারাবাহিকতার ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি প্রতিদিনের যাতায়াত, নিরাপত্তা, বাড়তি খরচ এবং অনিশ্চয়তা শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, যারা হলে থাকতে পারে তারা আবার অতিরিক্ত ভিড়ের মধ্যে বসবাস করে। নির্ধারিত চার জনের কক্ষে সাত থেকে আট জন বা তারও বেশি শিক্ষার্থীর বসবাস, এমনকি কোনও কোনও ক্ষেত্রে ১৫ থেকে ২০ জন পর্যন্ত অবস্থান করার ঘটনাও রয়েছে। এমন পরিবেশে মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করা অত্যন্ত কঠিন। ফলে শিক্ষাজীবনের শুরুতেই অনেক শিক্ষার্থী পিছিয়ে পড়ে, যা পরবর্তীকালে তাদের আত্মবিশ্বাস ও অ্যাকাডেমিক পারফরম্যান্সে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
সিনিয়রদের প্রভাব ও নেতিবাচক পরিবেশ
এই বাস্তবতার মধ্যেই শিক্ষার্থীরা আরেকটি জটিল সামাজিক ও মানসিক চাপে পড়ে, যা আসে সিনিয়রদের কাছ থেকে। প্রতিটি বিভাগেই এমন কিছু সিনিয়র থাকে, যারা নিজেদের অভিজ্ঞতা নতুন শিক্ষার্থীদের কাছে এমনভাবে উপস্থাপন করে, যাতে ভয়, অনিশ্চয়তা এবং নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়। কোন শিক্ষক কঠোর, কোন কোর্সে ফেল করার সম্ভাবনা বেশি, কোন বিষয় এড়িয়ে চলা উচিত—এসব নিয়ে তারা এমন এক পরিবেশ তৈরি করে, যা নতুন শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাসকে নষ্ট করে দেয়। যারা নিজেরা ভালো ফল করতে পারেনি, তাদের মধ্যেই এই প্রবণতা বেশি দেখা যায়। ফলে নতুন শিক্ষার্থীরা অনেক সময় শুরু থেকেই নিজেদের সীমাবদ্ধ ভাবতে শুরু করে এবং চেষ্টা করার আগেই হাল ছেড়ে দেয়।
শর্টকাট শিক্ষার প্রবণতা
এই পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত হয় আরেকটি উদ্বেগজনক প্রবণতা, যা হলো শর্টকাট-নির্ভর শিক্ষার দিকে ঝোঁক। কিছু শিক্ষার্থী পড়াশোনার গভীরতার পরিবর্তে সহজ পথে ভালো ফলাফল অর্জনের চেষ্টা করে। তারা এমন শিক্ষক খোঁজে যারা কম ক্লাস নেন, সিলেবাস সম্পূর্ণভাবে পড়ান না কিংবা সহজে বেশি নম্বর দেন। এই প্রবণতা শিক্ষার মৌলিক উদ্দেশ্যকে দুর্বল করে দেয়। শিক্ষা তখন আর জ্ঞান অর্জনের প্রক্রিয়া থাকে না, বরং নম্বর অর্জনের প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়। এর ফলে নীতিবান ও দায়িত্বশীল শিক্ষকদের অনেক সময় অপছন্দ করা হয়, এমনকি তাদের বিরুদ্ধে নেতিবাচক মনোভাব তৈরি করা হয়।
ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রভাব
এই পুরো প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক সময়ে আরেকটি নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে, যা হলো ডিজিটাল প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার। ইন্টারনেট, স্মার্টফোন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন শিক্ষার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। শ্রেণিকক্ষের বাইরেও শিক্ষার বিস্তার ঘটেছে, তথ্যের প্রাচুর্য বেড়েছে এবং জ্ঞান অর্জনের সুযোগ আগের যেকোনও সময়ের তুলনায় অনেক বেশি উন্মুক্ত হয়েছে। ইউনেস্কো এবং ওইসিডির বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে উচ্চশিক্ষা পর্যায়ের একটি বড় অংশের শিক্ষার্থী নিয়মিতভাবে ডিজিটাল টুল ব্যবহার করছে এবং এআই-নির্ভর সহায়তা গ্রহণের প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থী অ্যাসাইনমেন্ট প্রস্তুতিতে এআই ব্যবহার করছে, যদিও তাদের অনেকেই এই ব্যবহারের সীমা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা রাখে না।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই পরিবর্তন একদিকে যেমন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে, অপরদিকে নতুন ধরনের বৈষম্যও তৈরি করেছে। শহরাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা দ্রুত ডিজিটাল শিক্ষার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে, অনলাইন রিসোর্স, ভিডিও লেকচার এবং বিভিন্ন এআই টুল ব্যবহার করছে। অপরদিকে গ্রামীণ অঞ্চলে এখনও ইন্টারনেটের গতি, ডিভাইসের প্রাপ্যতা এবং ডিজিটাল দক্ষতার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ফলে একই দেশের মধ্যে শিক্ষার সুযোগে একটি নতুন বৈষম্য তৈরি হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে আরও বড় সামাজিক বিভাজনের কারণ হতে পারে।
ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ধরনকেও পরিবর্তন করেছে। পিডিএফ-নির্ভর পড়াশোনা এখন খুবই সাধারণ একটি বিষয়। স্মার্টফোনে বই পড়ার সুবিধা শিক্ষার্থীদের জন্য নিঃসন্দেহে উপকারী, বিশেষ করে যেখানে মুদ্রিত বই সহজে পাওয়া যায় না। কিন্তু একইসঙ্গে এই ডিভাইসগুলোতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভিডিও এবং বিনোদনের অন্যান্য মাধ্যম থাকার কারণে মনোযোগ বারবার বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, স্ক্রিনে দীর্ঘ সময় পড়াশোনা করলে তথ্য দ্রুত স্ক্যান করার প্রবণতা বাড়ে, কিন্তু গভীরভাবে বোঝার ক্ষমতা কমে যেতে পারে। এর ফলে শিক্ষার্থীরা অনেক তথ্য পড়লেও তা দীর্ঘমেয়াদে মনে রাখতে পারে না।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার এই পরিবর্তনকে আরও জটিল করেছে। এখন এআই শুধু তথ্য সরবরাহ করে না, বরং ধারণা ব্যাখ্যা করা, লেখা তৈরি করা এবং সমস্যার সমাধান করে দেওয়ার মতো কাজও করছে। এতে সময় বাঁচে এবং শেখার প্রাথমিক বাধা কমে, কিন্তু একইসঙ্গে একটি ঝুঁকিও তৈরি হয়। যদি শিক্ষার্থী নিজে চিন্তা করার পরিবর্তে প্রস্তুত উত্তর গ্রহণে অভ্যস্ত হয়ে যায়, তাহলে তার বিশ্লেষণী দক্ষতা ধীরে ধীরে কমে যেতে পারে। হার্ভার্ড গ্র্যাজুয়েট স্কুল অব এডুকেশনের গবেষকদের মতে, প্রযুক্তি তখনই কার্যকর যখন তা চিন্তাকে প্রসারিত করে, প্রতিস্থাপন করে না।
নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধের গুরুত্ব
এই পুরো বাস্তবতার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তা হলো—প্রযুক্তি নিজে সমস্যা নয়, বরং এর ব্যবহারই মূল বিষয়। অনেক শিক্ষার্থীই জানে না কখন এআই ব্যবহার সহায়ক এবং কখন তা অ্যাকাডেমিক অসদাচরণের পর্যায়ে পড়ে। একইভাবে অনেক শিক্ষকও নতুন এই বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে গিয়ে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছেন। প্রচলিত মূল্যায়ন পদ্ধতি অনেক ক্ষেত্রে আর কার্যকর থাকছে না, কারণ শিক্ষার্থীর নিজস্ব কাজ এবং প্রযুক্তির সহায়তায় তৈরি কাজের পার্থক্য নির্ণয় করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
এদিকে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু ক্ষেত্রে শিক্ষকদের হয়রানির ঘটনাও বেড়েছে, যা অ্যাকাডেমিক পরিবেশকে আরও অস্থির করে তুলছে। কোনও অভিযোগ থাকলে তা যথাযথ প্রক্রিয়ায় সমাধান করা উচিত, কিন্তু যখন তা ব্যক্তিগত আক্রমণে রূপ নেয়, তখন তা পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়। এতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা একটি সুস্থ শিক্ষাব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যেও একটি বিষয় বারবার সামনে আসে, তা হলো—নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধের গুরুত্ব। যে বিষয়েই পড়াশোনা করা হোক না কেন, একজন শিক্ষার্থীর প্রথম পরিচয় হওয়া উচিত একজন সৎ ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে। শুধুমাত্র ডিগ্রি অর্জন নয়, বরং জ্ঞান, সততা এবং মানবিক মূল্যবোধই একজন শিক্ষিত মানুষের প্রকৃত পরিচয় বহন করে।
সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজন
প্রযুক্তি শিক্ষাকে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে, ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা কমিয়েছে এবং ব্যক্তিগত গতিতে শেখার সুযোগ তৈরি করেছে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্যও নতুন নতুন সহায়ক প্রযুক্তি তৈরি হয়েছে। অনেক দেশে ইতোমধ্যে পাঠ্যক্রমে এআই লিটারেসি অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে, যাতে শিক্ষার্থীরা প্রযুক্তিকে বোঝে এবং দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করতে শেখে।
বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি হলো একটি সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করা। শুধু প্রযুক্তি সরবরাহ করাই যথেষ্ট নয়, বরং তার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা দরকার। একইসঙ্গে আবাসন সংকটের মতো মৌলিক সমস্যাগুলোর সমাধানও জরুরি। নতুন হল নির্মাণ, অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষার্থীদের জন্য স্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন—এসব বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
মোটকথা, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় আজ এক পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে পুরোনো কাঠামোগত সংকট, অপরদিকে নতুন প্রযুক্তিগত বাস্তবতা—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তথ্যের সহজলভ্যতা যেন জ্ঞানের গভীরতাকে প্রতিস্থাপন না করে, বরং তাকে সমৃদ্ধ করে—এই লক্ষ্য অর্জনেই এখন সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। একজন শিক্ষার্থী যদি সততা, দায়িত্ববোধ এবং সচেতনতার সঙ্গে এই পথচলায় এগিয়ে যেতে পারে, তবেই এই পরিবর্তন তার জন্য সুযোগে পরিণত হবে, আর সেই সুযোগই একদিন দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের ভিত্তি হয়ে উঠবে।
লেখক: অধ্যাপক, পরিসংখ্যান বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়



