ভুয়া শিক্ষক: জাতির মেরুদণ্ড ভাঙার কারিগর
ভুয়া শিক্ষক: জাতির মেরুদণ্ড ভাঙার কারিগর

‘ভুয়া’ শব্দটির অন্তর্নিহিত অর্থ হলো অসত্য, কৃত্রিম অথবা প্রবঞ্চনামূলক। তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে, যা প্রকৃত গুণ, যোগ্যতা বা সত্তাহীন হওয়া সত্ত্বেও বাহ্যিক আবরণে নিজেকে আসল বলে জাহির করে, তাই ভুয়া। এটি এক প্রকার সামাজিক ও নৈতিক স্খলন, যেখানে শঠতার আশ্রয় নিয়ে অপরের অধিকার হরণ করা হয়। তৃতীয় বিশ্বের অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এই ‘ভুয়া কালচার’ বা জালিয়াতির সংস্কৃতি এক ভয়াবহ ব্যাধিরূপে ছড়িয়ে পড়েছে। এর প্রধান কারণ হলো—সুশাসনের অভাব, জবাবদিহিতার অনুপস্থিতি, চরম অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতির করাল গ্রাস। দরিদ্র ও উন্নয়নশীল সমাজব্যবস্থায় মেধার মূল্যায়নের চেয়ে ক্ষমতার দাপট ও উৎকোচ প্রদান যখন মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়, তখনই ভুয়া সনদের মতো জঘন্য অপরাধের প্রসার ঘটে।

ভুয়া পেশাজীবীর ক্ষতিকর প্রভাব

আমাদের সমাজে ভুয়া লেখক, সাংবাদিক, চিকিৎসক কিংবা প্রকৌশলীর অস্তিত্বের কথা আমরা ভূরি ভূরি শুনে থাকি। তারা নিঃসন্দেহে সমাজের জন্য ক্ষতিকর। একজন ভুয়া চিকিৎসক ভুল চিকিৎসায় রোগীর প্রাণহানি ঘটাতে পারেন, একজন ভুয়া প্রকৌশলীর গাফিলতিতে ভবন ধসে পড়তে পারে; কিন্তু একজন ভুয়া শিক্ষক সমাজের জন্য সর্বাপেক্ষা অধিক বিপজ্জনক ও মারাত্মক। কেননা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হলো সেই পবিত্র আঁতুড়ঘর, যেখান থেকে রাষ্ট্র ও সমাজের সর্বস্তরের পেশাজীবী তৈরি হয়। আজকের যিনি চিকিৎসক, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী কিংবা উচ্চপদস্থ আমলা—তিনিও একদা কোনো না কোনো শিক্ষকের ছাত্র ছিলেন। সুশিক্ষা ও আদর্শের বীজটি শিক্ষকের হাত ধরেই শিক্ষার্থীর অন্তরে রোপিত হয়।

ভুয়া শিক্ষকের দায়

এখন প্রশ্ন হলো, যে শিক্ষক নিজেই ভুয়া ও অযোগ্য, যার নিজের ভিত্তিই জালিয়াতি ও মিথ্যার উপর প্রতিষ্ঠিত, তিনি তার ছাত্রকে কী শিক্ষা প্রদান করবেন? তিনি তো সমাজকে কেবল পঙ্গু ও নীতিহীন একদল বিকলাঙ্গ নাগরিকই উপহার দিতে পারবেন। শিক্ষা যদি জাতির মেরুদণ্ড হয়, তাহলে এই ভুয়া শিক্ষকেরা সেই মেরুদণ্ড সোজা রাখা তো দূরের কথা, বরং একে চিরতরে পঙ্গু করে দেওয়ার কারিগর। এটি একটি প্রজন্মের মেধা ও মননের সুপ্ত হত্যার শামিল।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সম্প্রতি প্রকাশিত জালিয়াতির চিত্র

গতকাল ইত্তেফাকে প্রকাশিত প্রধান শিরোনাম ছিল: ‘দুই স্কুলের ১৪১ শিক্ষকই ‘ভুয়া’। সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) এক প্রতিবেদনে দেশের শিক্ষা খাতের এই করুণ চিত্রটি উন্মোচিত হয়েছে। প্রকাশিত সংবাদে প্রকাশ, রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় এবং ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটের বনপাড়া আদর্শ স্কুল অ্যান্ড কলেজের ১৪১ জন শিক্ষকের নিয়োগ সম্পূর্ণ অবৈধ ও ভুয়া প্রমাণিত হয়েছে। সিদ্ধেশ্বরী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের ১৩৩ জন শিক্ষকের মধ্যে ৬৮ জনই জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন এবং প্রতিষ্ঠানটি থেকে প্রায় ১৫ কোটি টাকা লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। আরও ভয়াবহ চিত্র দেখা গিয়েছে বনপাড়া আদর্শ স্কুল অ্যান্ড কলেজে। সেখানকার ৭৬ জন শিক্ষকের মধ্যে ৭৩ জনেরই নিয়োগ অবৈধ! উক্ত প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ স্বয়ং জাল সনদের অধিকারী এবং তিনি তার স্ত্রী, সন্তান, শ্যালক থেকে শুরু করে নিজের ব্যক্তিগত গাড়িচালক পর্যন্ত—মোট ১১ জন পারিবারিক সদস্যকে জাল সনদে শিক্ষক ও কর্মচারী পদে নিয়োগ দিয়েছেন।

ব্যাপক জালিয়াতি ও অর্থ অপচয়

সমগ্র দেশে এই পর্যন্ত প্রায় দেড় হাজার জাল সনদধারী শিক্ষক চিহ্নিত হয়েছেন এবং তাদের পিছনে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে ৩৭৫ কোটি টাকা অপচয় করা হয়েছে, যা কেবল উদ্বেগজনকই নয়, বরং জাতির জন্য চরম লজ্জার বিষয়! এই ১৪১ জন বা দেড় হাজার শিক্ষকই শেষ কথা নয়, লোকচক্ষুর অন্তরালে এমন আরও বহু ভুয়া শিক্ষক রয়ে গিয়েছেন। কেবল এই শিক্ষকদের বরখাস্ত বা কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান করলেই এই ব্যাধির উপশম হবে না। চাকরিতে যোগদানের সময় কেন এই সনদগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই-বাছাই করা হলো না, সেই প্রশাসনিক অবহেলা ও সিন্ডিকেটের সন্ধান করা আবশ্যক। এই জালিয়াতির সাথে জড়িত শিক্ষা বোর্ড, এনটিআরসিএ কিংবা ম্যানেজিং কমিটির যেই সকল অসাধু কর্মকর্তা রয়েছেন, তাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে। এর পাশাপাশি ভুয়া শিক্ষকদের কাছ থেকে গৃহীত বেতন-ভাতার প্রতিটি পয়সা সরকারি কোষাগারে ফেরত আনা জরুরি।

প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা

একটি জাতিকে ধ্বংস করতে হলে তার শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করাই যথেষ্ট। অতএব, দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করতে এখনই এই ভুয়া শিক্ষক ও তাদের পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করাই বাঞ্ছনীয়।