দক্ষ শিক্ষকের অভাবে পিছিয়ে বাংলাদেশ: দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন হার
দক্ষ শিক্ষকের অভাবে পিছিয়ে বাংলাদেশ: দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন

শিক্ষা একটি জাতির মেরুদণ্ড—এই কথা বহুবার উচ্চারিত হলেও বাস্তবতার নিরিখে এর গভীরতা আজ আরও বেশি অনুভূত হচ্ছে। কারণ, একটি দেশের উন্নয়ন, মানবসম্পদ গঠন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির ভিত্তি নির্ভর করে মানসম্মত শিক্ষার ওপর। আর সেই মানসম্মত শিক্ষার কেন্দ্রে রয়েছেন শিক্ষক। দক্ষ, প্রশিক্ষিত ও যোগ্য শিক্ষক ছাড়া একটি কার্যকর শিক্ষাব্যবস্থা কল্পনা করা যায় না। অথচ সাম্প্রতিক বিভিন্ন পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে দক্ষতাসম্পন্ন শিক্ষকের হারে বাংলাদেশ সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ায় শিক্ষক দক্ষতার তুলনামূলক চিত্র

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর তুলনামূলক চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মালদ্বীপ, নেপাল, ভুটান ও শ্রীলঙ্কা শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। মালদ্বীপে দক্ষ শিক্ষকের হার প্রায় শতভাগের কাছাকাছি। নেপাল ও ভুটান ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষাবান্ধব নীতির কারণে ভালো অবস্থানে রয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশে এই হার উদ্বেগজনকভাবে কম।

পিছিয়ে পড়ার কারণসমূহ

এই পিছিয়ে পড়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। প্রথমত, শিক্ষক প্রশিক্ষণের ঘাটতি। দেশের বহু শিক্ষক এখনো আধুনিক শিক্ষণপদ্ধতি, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা এবং শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক পাঠদানে পর্যাপ্ত দক্ষ নন। প্রশিক্ষণব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক শিক্ষক পুরোনো ও মুখস্থনির্ভর পদ্ধতির বাইরে যেতে পারছেন না। ফলে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা ও বিশ্লেষণী ক্ষমতা বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

দ্বিতীয়ত, শিক্ষক নিয়োগে দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের অসংগতি ও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে যোগ্যতার চেয়ে প্রভাব বা অন্যান্য বিষয় গুরুত্ব পায়। এতে প্রকৃত মেধাবীরা শিক্ষকতায় আসতে নিরুৎসাহিত হন। একটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হলে শিক্ষক নিয়োগে শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

তৃতীয়ত, শিক্ষকদের আর্থিক ও সামাজিক মর্যাদার প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। উন্নত দেশগুলোতে শিক্ষকতা একটি সম্মানজনক ও আকর্ষণীয় পেশা হলেও বাংলাদেশে অনেক ক্ষেত্রেই তা নয়। কম বেতন, সীমিত সুযোগ-সুবিধা এবং পেশাগত অনিশ্চয়তা অনেক মেধাবী তরুণকে শিক্ষকতা থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। ফলে দীর্ঘ মেয়াদে শিক্ষা ক্ষেত্রে দক্ষ জনবলের সংকট আরও বাড়ছে।

এ ছাড়া প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতেও বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা এখনো অনেকাংশে পিছিয়ে। বিশ্ব যখন স্মার্ট শিক্ষা, ডিজিটাল ক্লাসরুম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে, তখন দেশের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই মৌলিক প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর অভাব রয়েছে। শিক্ষকেরা প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ না হলে শিক্ষার্থীরাও আধুনিক বিশ্বের চাহিদা অনুযায়ী প্রস্তুত হতে পারে না।

দক্ষ শিক্ষকের অভাবে জাতীয় উন্নয়নে প্রভাব

এই পরিস্থিতির প্রভাব শুধু শিক্ষা ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অদক্ষ শিক্ষক মানে দুর্বল শিক্ষাব্যবস্থা, আর দুর্বল শিক্ষাব্যবস্থা মানে অদক্ষ মানবসম্পদ। ফলে কর্মসংস্থান, গবেষণা, উদ্ভাবন ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় দেশ পিছিয়ে পড়ে।

সম্ভাব্য সমাধান ও করণীয়

তবে আশার বিষয় হলো, সঠিক পরিকল্পনা ও কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে এই সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। এ জন্য প্রথমেই শিক্ষক প্রশিক্ষণকে আধুনিক ও বাধ্যতামূলক করতে হবে। নিয়মিত প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষণপদ্ধতি প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

একই সঙ্গে শিক্ষকদের আর্থিক ও সামাজিক মর্যাদা বাড়াতে হবে, যাতে মেধাবী তরুণেরা শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নিতে আগ্রহী হয়। গ্রামীণ ও শহুরে শিক্ষাব্যবস্থার বৈষম্য কমিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে।

দক্ষ শিক্ষকই একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণ করেন। তাই শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধি শুধু শিক্ষা খাতের উন্নয়নের বিষয় নয়; এটি জাতীয় উন্নয়নের পূর্বশর্ত। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশ যদি এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তবে দক্ষ শিক্ষকের সংকট কাটিয়ে একটি শক্তিশালী ও আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

মো. আল আমিন, শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়