নিজের বাড়িতে গড়া মধু গবেষণাকেন্দ্রে সৈয়দ মুহাম্মদ মঈনুল আনোয়ার অণুবীক্ষণযন্ত্রে এক ফোঁটা মধুর দিকে গভীর মনোযোগে তাকিয়ে আছেন। পাশে দুটি ছোট কাচের বোতল। একটিতে শর্ষে ফুলের আর অন্যটিতে সুন্দরবনের খলিশা ফুলের মধু। দুই মধুর পার্থক্য দেখাতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘মধু শুধু স্বাদের বিষয় নয়, এরও আছে বৈজ্ঞানিক ভাষা।’ আলমারি থেকে সাবধানে আরেকটি বোতল বের করে আনেন। ভেতরে ২৫ বছরের পুরোনো খলিশা ফুলের মধু। কাচের ভেতর এখনো স্থির হয়ে আছে ঘন কালচে রং, অটুট আছে ঘ্রাণও। বোতলটি হাতে নিয়ে তিনি বলেন, ‘মধুর প্রকৃত পরিচয় বোঝা যায় এর উৎস ও মান যাচাইয়ের মধ্য দিয়ে, শুধু বোতল দেখে নয়। দীর্ঘ বছর ধরে মধু নিয়ে অনুসন্ধান করছি। কোনটি খাঁটি, কোনটি ভেজাল—এখন তা বলে দিতে পারি সহজেই।’
গবেষণাকেন্দ্রের সূচনা
সেই অনুসন্ধানের গল্পই ছড়িয়ে আছে মঈনুল আনোয়ারের চারপাশে। ঠিক প্রাতিষ্ঠানিক কোনো গবেষণাগার যেমন এটি নয়, তেমনি আবার সাধারণ বাড়িও নয়। চট্টগ্রাম শহরের জয় পাহাড় আবাসিক এলাকার এক কোণে গাছপালায় ঘেরা একটি বাড়িতে গড়ে উঠেছে ‘আল্ওয়ান মধু জাদুঘর ও গবেষণাকেন্দ্র’। খাঁটি মধু আসলে কীভাবে চেনা যায়—এ প্রশ্ন থেকেই ছোট্ট এই পরীক্ষাগারটির শুরু। রিফ্র্যাক্টোমিটার, মাইক্রোস্কোপ, পিএইচ মিটারসহ নানা যন্ত্রপাতি কিনেছেন। শুরুতে এগুলোর ব্যবহার তাঁর জানা ছিল না। চট্টগ্রাম কলেজের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগে গিয়ে পরাগরেণু দেখে মধুর উৎস শনাক্ত করার কৌশল শেখেন। পরে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠানের ল্যাব সহকারী ও অভিজ্ঞ প্রশিক্ষকদের কাছ থেকে যন্ত্রপাতি চালানোয় হাতেখড়ি। আজ সেখানে রয়েছে বিভিন্ন অঞ্চলের নানা সময়ে সংগ্রহ করা ৭২ ধরনের মধুর নমুনা।
বাড়ির উঠানে মৌচাষ
সম্প্রতি তাঁর বাড়িতে গিয়েছিলাম। ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে মৌমাছির ছোট ছোট ঝাঁক। উঠানের এক পাশে সার করে রাখা কাঠের বাক্স। কোনোটি থেকে মৌমাছি বের হচ্ছে, কোনোটিতে ঢুকছে। উঠানের চারপাশে সুন্দরী, খলিশা, পশুর, কাঁকড়া, বাইন, কালি লতা—সুন্দরবনের পরিচিত সব গাছ। প্রথম দেখায় বোঝা কঠিন, চট্টগ্রাম শহরে আছি। মনে হবে, যেন হঠাৎ সুন্দরবনে এসে পড়েছি। ২০১৫ সালের দিকে গড়া এই ‘সুন্দরবন’–এর বিভিন্ন গাছ দেখালেন মঈনুল আনোয়ার। ব্যাখ্যা করলেন কোন গাছে কোন মৌমাছি বেশি আসে, কোন ফুলের মধুর স্বাদ কেমন। এরপর নিয়ে আসেন এই ছোট গবেষণাকক্ষে।
বাবার অসুখ
২০০৩ সালে মঈনুল আনোয়ারের বাবা অসুস্থ হয়ে পড়েন। চিকিৎসকের পরামর্শে দরকার হয় মধু। বাজারে গিয়ে দেখলেন, বেশির ভাগ মধুই পুরোনো বোতলে বিক্রি হচ্ছে। কোথাও বিশুদ্ধতার নিশ্চয়তা নেই। অনেক খুঁজেপেতে যে বোতলটি শেষে কিনে আনেন, পরে জানতে পারেন, সেটিও ছিল ভেজাল। ঘটনাটি তাঁকে নাড়া দেয়। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে পবিত্র, আবার খাদ্যগুণ আর চিকিৎসাগত কারণেও প্রয়োজনীয়, এমন একটি পণ্য নিয়ে কেন এত আস্থাহীনতায় ভুগবেন মানুষ—প্রশ্নটি তাঁর মাথায় ঘুরতে থাকে। সিদ্ধান্ত নিলেন, খাঁটি মধু নিয়ে কাজ করবেন।
চাকরি ছেড়ে মধুর পথে
১৯৯৮ সালে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে স্নাতক করে তখন একটি বায়িং হাউসে চাকরি করেন মঈনুল আনোয়ার। মধুর ব্যবসা করবেন বলে সেই চাকরি ছেড়ে দিলেন। পরিচিতদের কেউ কেউ উদ্বিগ্ন হয়ে পরামর্শ দিয়েছিলেন, ‘মধু নিয়ে ব্যবসা করে টিকে থাকা কঠিন।’ ২০০৪ সালে বেকার অবস্থাতেই বিয়ে করেন। অনিশ্চয়তার ভেতরেই শুরু হয় নতুন জীবন। বাবা, মা ও স্ত্রী তাঁকে সাহস দিতেন।
গবেষণার পথে
শুধু মাঠে ঘুরে ঘুরে মধু সংগ্রহেই থেমে থাকেননি মঈনুল আনোয়ার। দ্রুত বুঝে যান, মধু চিনতে হলে পড়াশোনাও জরুরি। বিএসটিআইয়ের মানদণ্ড ঘেঁটেছেন। বিদেশি গবেষণা জার্নাল সংগ্রহ করেছেন। বই পড়েছেন। বিদেশে থাকা বন্ধুদের কাছে কাপড় বা উপহার নয়, মধুবিষয়ক বই পাঠাতে বলতেন। মৌমাছির জীবনচক্র, ফুলভেদে মধুর পার্থক্য, রাসায়নিক গঠন—সবকিছু নিয়েই শুরু হয় তাঁর গবেষণা।
মধুর খোঁজে সুন্দরবন
খাঁটি মধুর সন্ধানে চলে যান সিরাজগঞ্জ। বিস্তীর্ণ শর্ষে খেতের পাশে মৌচাষিদের অস্থায়ী বসতিতে কয়েক দিন কাটান মঈনুল আনোয়ার। কাছ থেকে দেখেন মৌচাষিদের কঠোর পরিশ্রম ও টিকে থাকার লড়াই। সেখানেই স্থানীয় মাদ্রাসাশিক্ষক আবদুল আহাদের সঙ্গে পরিচয়। তাঁর কাছ থেকে প্রথমবারের মতো মৌচাষ ও মৌমাছির আচরণ নিয়ে হাতে-কলমে ধারণা পান। সেই সফরে সংগ্রহ করেছিলেন প্রায় ২০ কেজি মধু। সেটা ছিল ২০০৫ সাল। কিন্তু তাঁর অনুসন্ধান থেমে থাকেনি। কয়েকজন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে সুন্দরবনের মধু সংগ্রহ করলেও উৎস সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য দিতে পারেননি তাঁরা। এরপর বিভিন্ন সূত্র ধরে চলে যান সাতক্ষীরার সীমান্তঘেঁষা অঞ্চলে। সেখানে এক মহাজনের সঙ্গে পরিচয়। কিন্তু ওই মহাজনও মধুর সঙ্গে চিনির শিরা মিশিয়ে বিক্রি করেন। ঘটনাটি তাঁকে হতাশ করে। স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় চলে গেলেন মৌয়ালদের গ্রামে। নৌকায় চড়ে ঢুকে পড়েন সুন্দরবনের গভীরে। সেই প্রথম কাছ থেকে দেখেন বনজীবী মৌয়ালদের কঠিন জীবন। ঝুঁকি আর অনিশ্চয়তার ভেতর মধু সংগ্রহের লড়াই।
প্রাতিষ্ঠানিক রূপ
মধু নিয়ে কাজ করতে করতে একসময় বুঝলেন, কাজটাকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে। সেখান থেকেই জন্ম নেয় ‘আল্ওয়ান এন্টারপ্রাইজ’। চট্টগ্রাম নগরের ভিআইপি টাওয়ারে এখন প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয়। সেখানে সাজানো থাকে নানা ধরনের মধু। শর্ষে, কালিজিরা, ধনিয়া, লিচু, সুন্দরবনের গরান ও গেওয়া ফুলের মধু কিনতে ভিড় করেন ক্রেতারা। বছরে আয় ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা।
মৌমাছি ও মধু
২০১৭ সালে ঢাকায় জাতীয় মৌ মেলায় গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক আহসানুল হকের সঙ্গে পরিচয়। মধু নিয়ে জনসচেতনতা তৈরিতে মঈনুল আনোয়ারের আগ্রহ অধ্যাপক আহসানুল হককে বিশেষভাবে মুগ্ধ করে। এ উদ্যোগের অংশ হিসেবে তাঁরা একসঙ্গে ‘মৌমাছি ও মধু’ নামে একটি ফেসবুকভিত্তিক সংগঠন গড়ে তোলেন। পরে ২০১৯ সালে ঢাকায় প্রথম জাতীয় মৌ সম্মেলন আয়োজনেও যুক্ত ছিলেন তাঁরা। অধ্যাপক আহসানুল হক বললেন, মধু নিয়ে ব্যবসা করেন, এমন মানুষ অনেক আছেন। কিন্তু মধুর উৎস, মৌমাছির জীবনচক্র, পরাগরেণু ও মান—এসব বিষয়ে যে ধরনের ব্যক্তিগত অনুসন্ধান মঈনুল আনোয়ার করেছেন, তা সত্যিই বিরল।
পুরস্কার ও আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণ
মঈনুল আনোয়ারের অর্জনও উল্লেখযোগ্য। কৃষি মন্ত্রণালয়ের জাতীয় মৌ মেলায় তিনি ২০১৮ ও ২০১৯ সালে প্রথম পুরস্কার অর্জন করেন। প্রথমবার খাঁটি মধু চেনার পদ্ধতি উপস্থাপন করে, দ্বিতীয়বার বৈচিত্র্যময় মধু ও মৌমাছিজাত পণ্য প্রদর্শন করে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তাঁর অংশগ্রহণ রয়েছে। গত ৬ থেকে ১০ এপ্রিল তিনি নেপালের অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড ফরেস্ট্রি ইউনিভার্সিটিতে আয়োজিত ইন্টারন্যাশনাল বি–কিপিং কনফারেন্সে অংশ নেন। সেখানে তিনি সুন্দরবনের মধুর জিআই স্বীকৃতি বিষয়ে যুক্তি তুলে ধরেন। পাশাপাশি একটি প্রদর্শনীতেও অংশ নেন।
শিক্ষার্থীদের জন্য শেখার জায়গা
মঈনুল আনোয়ারের জাদুঘর ও গবেষণাকেন্দ্র এখন শিক্ষার্থীদের জন্যও একটি শেখার জায়গা হয়ে উঠেছে। চলতি বছর চট্টগ্রাম কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের স্নাতক তৃতীয় বর্ষের ছয় শিক্ষার্থী তাঁর কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। তিন মাস তাঁরা হাতে-কলমে মধু ও মৌমাছি বিষয়ে ব্যবহারিক জ্ঞান অর্জন করেন। মঈনুল আনোয়ারের কাজ এখন আর শুধু মধু সংগ্রহ বা বিপণনে সীমাবদ্ধ নেই। মধুকে ঘিরে একটি পূর্ণাঙ্গ জ্ঞানভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলতে চান তিনি, যেখানে একই সূত্রে যুক্ত থাকবে মৌচাষি, গবেষক ও ভোক্তা।



