শিক্ষা সংস্কারে ধারাবাহিকতার অভাব: গবেষণাভিত্তিক নীতি ও প্রাথমিক শিক্ষার শক্তিশালীকরণ জরুরি
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা বিগত সময়ে তথাকথিত নানা সংস্কারের মধ্য দিয়ে গেছে। কখনো নতুন কারিকুলাম, কখনো মূল্যায়নপদ্ধতির পরিবর্তন, আবার কখনো আন্তর্জাতিক মডেল অনুসরণের চেষ্টা—সব মিলিয়ে একটি ধারাবাহিকতা তৈরি না হয়ে বরং একটি বিচ্ছিন্ন, পরীক্ষামূলক প্রবণতা দৃশ্যমান হয়েছে। নীতিনির্ধারকেরা প্রায়ই উন্নত দেশের উদাহরণ টেনে এনে দ্রুত ফল পাওয়ার আশায় বিভিন্ন মডেল গ্রহণের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, শিক্ষা কোনো ‘প্লাগ অ্যান্ড প্লে’ ব্যবস্থা নয়, এটি গভীর সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে জড়িত। আমরা চাইলেই উন্নত দেশের একটা ব্যবস্থা বাংলাদেশের মতো একটি অনুন্নত ও পিছিয়ে পড়া দেশে চাপিয়ে দিয়ে তার সাফল্য কামনা করতে পারি না। কেননা তা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় সেই আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক অবকাঠামো আমরা এখনো তৈরি করতে পারিনি।
ধারাবাহিকতার অভাব ও রাজনৈতিক প্রভাব
নীতির ধারাবাহিকতার অভাব শিক্ষা সংস্কারের একটি প্রধান বাধা। শিক্ষানীতি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া, যার ফলাফল তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান হয় না। কিন্তু আমাদের নীতিনির্ধারণের প্রক্রিয়ায় প্রায়ই দেখা যায়, রাজনৈতিক সময়সূচি ও তাৎক্ষণিক সাফল্যের চাপে দ্রুত পরিবর্তনের দিকে ধাবিত হওয়া। ফলে একটি কারিকুলাম ঠিকমতো বাস্তবায়িত হওয়ার আগেই আরেকটি নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। কোনো একটি পরিকল্পনা যদি দেশের জন্য ভালো হয়, তাকে চলমান রাখার ইতিবাচক মনোভাব রাখতে হবে। একটি নীতিমালা কেবল বিগত সরকারের আমলে হয়েছে বলেই তাকে বাতিল করতে হবে, সেই ধ্যানধারণা থেকে আমাদের সরে আসতে হবে। ইতিবাচক পরিকল্পনার রাজনীতিকরণ হলো আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতার অন্যতম একটি কারণ।
আন্তর্জাতিক উদাহরণ থেকে শিক্ষা
বিশ্বের কয়েকটি উন্নত দেশ, বিশেষ করে ফিনল্যান্ড ও চীনের দিকে তাকালে দেখা যায় যে তাদের শিক্ষা সংস্কার রাতারাতি হয়নি; বরং কয়েক দশক ধরে একটি সুসংহত, গবেষণাভিত্তিক এবং শিক্ষককেন্দ্রিক নীতির মাধ্যমে তা গড়ে উঠেছে। একইভাবে সিঙ্গাপুর তাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে ধাপে ধাপে রূপান্তর করেছে। এই তিনটি দেশই তাদের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রাথমিক শিক্ষার প্রতি অধিক জোর দিয়েছে। এর সঙ্গে রয়েছে মাধ্যমিক শিক্ষার সঙ্গে ভোকেশনাল বা কারিগরি শিক্ষার প্রতি মনোযোগ এবং উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত উদ্ভাবনের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা। চীনের উদাহরণে দেখা যায়, তারা শিক্ষাব্যবস্থাকে সরাসরি তাদের জাতীয় অর্থনৈতিক কৌশলের সঙ্গে যুক্ত করে শুধু দক্ষ মানবসম্পদই তৈরি করেনি; বরং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করেছে।
প্রাথমিক শিক্ষার শক্তিশালীকরণের প্রয়োজনীয়তা
সংস্কারের সূচনা হতে হবে প্রাথমিক শিক্ষাকে কেন্দ্র করে, প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে। সরকারের গতানুগতিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে প্রাথমিক শিক্ষাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়; বরং আমাদের প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নের সংস্কারের উদ্যোগ এখনই শুরু করতে হবে। কেননা প্রাথমিক শিক্ষাই হলো সেই ভিত্তি, যার ওপর পুরো শিক্ষাব্যবস্থা দাঁড়িয়ে থাকে। যদি প্রাথমিক শিক্ষায় গুণগত মান নিশ্চিত না করা যায়, তাহলে শিক্ষার উচ্চস্তরের সংস্কার টেকসই হবে না। প্রাথমিক শিক্ষায় বিনিয়োগ মানে কেবল অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়; বরং শিক্ষক প্রশিক্ষণ, পাঠ্যপুস্তকের মানোন্নয়ন ও শিক্ষার্থীর শেখার অভিজ্ঞতাকে অর্থবহ করে তোলা।
- শিক্ষক প্রশিক্ষণ: শিক্ষকদের দক্ষতার উন্নয়নে পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। বাংলাদেশের প্রান্তিক এলাকায় শিক্ষকদের দক্ষতার সঙ্গে শহুরে শিক্ষকদের দক্ষতার একটি বড় পার্থক্য দৃশ্যমান।
- কারিকুলাম পুনর্মূল্যায়ন: প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার কারিকুলামের পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। প্রযুক্তিনির্ভর বিষয় যুক্ত করার সময় গ্রাম ও শহরের বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে দক্ষতা ও প্রযুক্তিগত বৈষম্য দেখা দেয়।
- বৈষম্য কমানো: গ্রাম ও শহরের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে বৈষম্য কমাতে কেন্দ্রীয়ভাবে বিশেষ নজর দিতে হবে। শহর এলাকার বাইরের বিদ্যালয়গুলোর অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও প্রযুক্তিগত সুবিধার সমবণ্টন নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
- শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা: শিক্ষকদের বেতনসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার বিষয়টির দিকে সরকারের জরুরি পদক্ষেপ হাতে নেওয়া প্রয়োজন। প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতন কম হওয়ার কারণে সংসার চালানোর জন্যই পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তাঁদের যুক্ত থাকতে হয়, যা শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করে।
গবেষণাভিত্তিক নীতি ও শিক্ষা কমিশন গঠন
এখন আমাদের করণীয় হবে পূর্ববর্তী ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি গবেষণাভিত্তিক শিক্ষা নীতি সংস্কারে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে উদ্যোগ নেওয়া। আর সেটি শুরু হতে পারে একটি পৃথক ও সার্বভৌম শিক্ষা কমিশন গঠন করার মাধ্যমে। এই কমিশন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা তৈরি করে ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারে এবং রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত থেকে শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ করতে পারে। গবেষণাভিত্তিক নীতি তৈরির মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে উপযুক্ত সংস্কার বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে, যা টেকসই উন্নয়নের দিকে নিয়ে যাবে।



