চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আবাসন-খাদ্য-যাতায়াত সংকটে শিক্ষার্থীরা
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ত্রিমুখী সংকট

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়–সংলগ্ন ব্যক্তিমালিকানাধীন একটি কটেজে সারি সারি ছোট কক্ষ। সামনে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ময়লা-আবর্জনা। কোথাও স্যাঁতসেঁতে দেয়াল, কোথাও জমে নোংরা পানি। প্রতিটি কক্ষে গাদাগাদি করে থাকছেন দুজন শিক্ষার্থী। একটি বিছানা ও একটি পড়ার টেবিল রাখলেই আর জায়গা থাকে না। ৫০ জনের জন্য মাত্র একটি শৌচাগার, গোসল করতে হয় খোলা জায়গায়।

আবাসন সংকটে ভুগছেন হাজারো শিক্ষার্থী

বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটক দিয়ে ঢুকে ডানে গেলে শাহজালাল হল, তার বিপরীত পাশেই এই কটেজ। হলে আবাসন না পাওয়া শিক্ষার্থীরা বাধ্য হয়ে এখানে ভাড়া নেন। অর্থনীতি বিভাগের চতুর্থ বর্ষের মামুন ইসলাম বলেন, ‘ক্যাম্পাসের পাশের স্যাঁতসেঁতে কটেজে ছোট্ট কক্ষে থাকি। ভাড়া দেড় হাজার টাকা। বাকি টাকা দিয়ে কষ্ট করে মাস চলে। হলে থাকলে এত কষ্ট হতো না।’

একই পরিস্থিতির শিকার বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েক হাজার শিক্ষার্থী। আবাসনসংকটে তারা হলে আসন পাননি। বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত খরচে ক্যাম্পাসের বাইরে মেস, বাসা বা কটেজে থাকছেন। মেস বা বাসার সঙ্গে কটেজের পার্থক্য হলো, এতে রান্নার ব্যবস্থা নেই, শৌচাগারও বাইরে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ক্যাম্পাসের আশপাশের বাসায় থাকা নিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দাদের সংঘাতও হয়। সর্বশেষ গত বছরের আগস্টে সংঘর্ষে প্রায় ২০০ শিক্ষার্থী আহত হন। রাতে বাসায় ঢোকা নিয়ে এক শিক্ষার্থীকে দারোয়ানের মারধরের জেরে এই সংঘর্ষ।

খাবার নিয়েও অসন্তোষ

শুধু আবাসন নয়, খাবার নিয়েও অসন্তোষ। ডাইনিং ও ক্যানটিনে খাবার সরবরাহ হয়। দুই-তৃতীয়াংশ শিক্ষার্থী হলের খাবারের ওপর নির্ভরশীল। বাকিরা আশপাশের হোটেলে খান বা নিজেরা রান্না করেন। মূলত ছাত্রীরাই বেশি রান্না করে খান।

বর্তমানে হলে এক বেলা খাবারে খরচ ৩৫ থেকে ৪৫ টাকা। আগে যা ছিল ৩০ থেকে ৪০ টাকা। ৩৫ টাকায় ইচ্ছা মতো ভাত ও পাতলা ডালের সঙ্গে মুরগি, মাছ, ডিম বা সবজির যেকোনো একটি পদ। ৪৫ টাকায় যেকোনো দুটি পদ।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এ এফ রহমান হলের আবাসিক শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ বিন আমিন বলেন, ‘মুরগি, মাছ বা ডিমের তরকারি নিলে মনে হয় হলুদ পানিতে ভাসছে। মাঝেমধ্যে বাসি খাবার পরিবেশন হয়। একটি মুরগি ১৫ পিস করে দেওয়া হয়, আকারে ছোট।’

হলের বাইরের ভাড়া বাসা বা কটেজে থাকা অনেক শিক্ষার্থী হলে এসে খাবার খান। ফলে ডাইনিংয়ে সব সময় ভিড়। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় রাতের খাবার শুরু হলে লম্বা লাইন, রাত ৯টা পর্যন্ত ভিড় থাকে। অর্থনীতি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের তাওসিফ হোসেন বলেন, ‘টাকার অভাবে বাইরে না খেয়ে হলে খেতে হয়। সম্প্রতি তরকারিতে পোকা পেয়ে অসুস্থ হয়েছি। তবু বাধ্য হয়ে সেখানেই খাচ্ছি।’

যাতায়াতের ভোগান্তি

শাটল ট্রেনই প্রধান বাহন। প্রতিদিন প্রায় ১২ হাজার শিক্ষার্থী যাতায়াত করেন। বগির দরজা-জানালা ভাঙা, ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ যাত্রী, ফ্যান চলে না। তীব্র গরমে ভোগান্তি। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের তৃতীয় বর্ষের তাহিয়া তাবাসসুম বলেন, ‘ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। দুই মাসে অন্তত ১০ শিক্ষার্থীর মাথা ফেটেছে। প্রশাসন কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। যান্ত্রিক ত্রুটিতে সূচি বিপর্যয় হয়।’

পরিস্থিতির পরিবর্তন ও চ্যালেঞ্জ

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আগে ক্যাম্পাস নিয়ন্ত্রণ করত ছাত্রলীগ। বর্তমানে একক সংগঠনের নিয়ন্ত্রণ নেই, বড় সংঘর্ষ হয়নি। তবে শিক্ষককে হেনস্তা, মারামারি, ভাঙচুরের অভিযোগ আছে। চলতি বছরের ১০ জানুয়ারি ভর্তি পরীক্ষার দায়িত্বে থাকা শিক্ষক হাসান মোহাম্মদকে চাকসু নেতারা হেনস্তা করে প্রক্টর অফিসে আটকে রাখেন।

প্রায় ৩৫ বছর পর গত বছরের ১৫ অক্টোবর ছাত্র সংসদ নির্বাচনে শিবির-সমর্থিত প্যানেল ২২টি পদে জয়ী হয়। ইশতেহারে হল সংস্কার, আসন বৃদ্ধি, শাটল আধুনিকায়নের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়নি।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক সুমাইয়া শিকদার বলেন, ‘৫ আগস্টের পর প্রত্যাশা তৈরি হলেও আবাসনসংকট, প্রশাসনিক অস্বচ্ছতা, দলীয়করণ ও শিক্ষা পরিবেশের উন্নয়ন না হওয়ায় তা পূরণ হয়নি।’

জাতীয় ছাত্রশক্তির খান তালাত মাহমুদ বলেন, ‘এখন শিক্ষার্থীরা মতামত প্রকাশ করতে পারেন। তবে সহিংসতা বাড়লে ইতিবাচক পরিবেশ নষ্ট হবে।’

চাকসুর ভিপি মো. ইব্রাহীম বলেন, ‘আবাসন বৃদ্ধির কাজ চলছে। আগামী ছয় মাসের মধ্যে বাস্তবায়নের আশা। শাটল ট্রেন সংস্কারে রেলওয়ের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে।’

আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয়করণ ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ ছিল। অভ্যুত্থান–পরবর্তী সময়েও বিতর্ক থেকেছে। সাবেক উপাচার্য মুহাম্মদ ইয়াহইয়া আখতার প্রায় ৪০০ শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ দেন, যা নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ আছে।

প্রক্টর হোসেন শহীদ সরওয়ার্দী বলেন, ‘২৩ বছরে রাজনৈতিক প্রভাবে চাঁদাবাজি, টেন্ডার–বাণিজ্য ও চাকরির বিনিময়ে অর্থ লেনদেন ছিল। ৫ আগস্টের পর কিছু পরিবর্তন হলেও পুরোনো অভ্যাস বদলায়নি। আমরা নিরাপত্তায় সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।’

উপাচার্য মোহাম্মদ আল-ফোরকান বলেন, ‘আবাসনসংকট প্রধান সমস্যা। অল্প সময়ে সমাধান সম্ভব নয়। নতুন হল নির্মাণের ডিপিপি জমা দেওয়া হয়েছে। রেল সংযোগ সংস্কারে মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। সংঘর্ষ ও ক্লাস বন্ধ কমেছে। উন্নয়নে কাজ চলছে।’