বুনো কাকাতুয়াও অন্যদের দেখে নতুন খাবার খেতে শেখে
বুনো কাকাতুয়াও অন্যদের দেখে নতুন খাবার খেতে শেখে

পরীক্ষার অংশ হিসেবে একটি সালফার-ক্রেস্টেড কাকাতুয়া লাল রঙের বাদাম খাচ্ছে। ছবি: জুলিয়া পেনডর্ফ

বন্ধুদের কী খেলনা আছে বা কী পোশাক আছে, তা লক্ষ করে শিশুরা। এরপর মা-বাবার কাছে আবদার করে ‘আমার ঠিক ওই খেলনাটাই লাগবে’। বড় হওয়ার পরও মানুষের এই অভ্যাস বদলায় না। বড়রাও জনপ্রিয় খাবার বা নতুন ট্রেন্ড অনুসরণ করে অন্যদের দেখাদেখি।

এই অভ্যাস শুধু মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, গবেষকেরাও এটি পরীক্ষা করে দেখেছেন। পিএলওএস জার্নালে প্রকাশিত যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি ও অস্ট্রেলিয়ার গবেষকদের করা এক নতুন গবেষণায় বলা হয়েছে, বুনো কাকাতুয়ারাও নতুন খাবার খাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সঙ্গীদের দেখে নেয়—কে কী করছে, কে কী খাচ্ছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

শহুরে পরিবেশে নতুন খাবারের চ্যালেঞ্জ

শহুরে পরিবেশে বাস করা প্রাণীরা সব সময় নতুন নতুন খাবারের মুখোমুখি হয়। কখনো আবর্জনা, কখনো রাস্তার ধারের গাছের ফল, আবার কখনো বাইরের দেশ থেকে আসা উদ্ভিদ বা অন্য প্রাণী খেতে হয় এদের। পরিবর্তনশীল পরিবেশে টিকে থাকতে হলে নতুন খাবার এদের খেতেই হয়। তবে সমস্যা হলো, অচেনা খাবার খাওয়ার ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই এদের মধ্যে ভয় কাজ করে। কারণ, খাবারটি যদি বিষাক্ত হয়, যদি এতে রোগজীবাণু থাকে? তাহলে তো এদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়বে!

এই ঝুঁকি এড়াতে অনেক প্রাণীই কৌশলের আশ্রয় নেয়। সেটি হলো অন্যদের দেখে শেখা। এরা নিজেদের সঙ্গীদের আচরণ লক্ষ করে। অন্যদের কাজ পর্যবেক্ষণ করে বুঝে নেয়, কোনটা নিরাপদ আর কোনটা অনিরাপদ।

গবেষণার পদ্ধতি ও ফলাফল

এ ধরনের আচরণ আগে কিছু বুনো পাখির মধ্যে দেখা গেছে। পরীক্ষাগারের ইঁদুরের মধ্যেও এই আচরণ দেখা গেছে। কিন্তু প্রাকৃতিক পরিবেশে এই বিষয়টি নিয়ে গবেষণা খুব কম হয়েছে। তাই এবার গবেষকেরা বুনো কাকাতুয়া পাখির আচরণ পর্যবেক্ষণ করেছেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে পাঁচটি আলাদা দলে বাস করে ৭০০ সালফার-ক্রেস্টেড কাকাতুয়া। এই পাখি নিয়ে গবেষণা চালানো হয়েছে। এর মধ্যে দুটি দলের চারটি কাকাতুয়া পাখিকে বিশেষভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এদের লাল বা নীল রং করা বাদাম খেতে শেখানো হয়। শুরুতে এরা এই খাবার খেতে ভয় পাচ্ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে এরা অভ্যস্ত হয়ে ওঠে।

অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে পাঁচটি আলাদা দলে বাস করে ৭০০ সালফার-ক্রেস্টেড কাকাতুয়া। ছবি: এস. বেকার/ফ্লিকার

প্রতিটি দলের জন্য এমন একটি খাদ্য সরবরাহ যন্ত্র বসানো হয়, যেখানে লাল ও নীল দুই রঙের বাদাম রাখা ছিল। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় ধরে এই পরীক্ষা চলতে থাকে।

ফলাফল ছিল অবাক করার মতো। যে দলগুলোতে প্রশিক্ষিত পাখি ছিল, সেখানে অন্য পাখিরা খুব দ্রুতই নতুন খাবার খেতে শুরু করে। কোথাও সাত মিনিটের মধ্যে, কোথাও আবার এক মিনিটেরও কম সময়ে! প্রথম দিন থেকেই এরা দুই রঙের বাদাম খেতে শুরু করে।

অনুকরণপ্রবণতা ও সামাজিক প্রভাব

মজার বিষয় হলো, অল্পবয়সী পাখিরা বেশ অনুকরণপ্রবণ। এরা বেশির ভাগ পাখি যা করছে, সেটাই অনুসরণ করতে চায়। একই আচরণ মানবশিশুদের মধ্যেও দেখা যায়।

কিন্তু যে দলে কোনো প্রশিক্ষিত পাখি ছিল না, সেখানে নতুন খাবার খেতে শুরু করতে সময় লাগে চার দিন। পরে সেই দলে এমন একটি পাখি যোগ দেয়, যে আগে অন্য একটি দলে ছিল এবং বহুবার অন্যদের এই বাদাম খেতে দেখেছে। সেই পাখিটি একবার খাওয়ার সাহস দেখাতেই মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যে আরও ১৫টি পাখি তাকে অনুসরণ করে।

২০ দিনের এই পরীক্ষার শেষে দেখা যায়, পাঁচটি দলের মোট ৩৪৯টি পাখি এই নতুন খাবার খেতে শিখে গেছে। গবেষকেরা আরও একটি বিষয় খেয়াল করেছেন। পাখিরা কাকে অনুসরণ করবে, সেটিও তারা বেছে নেয়। দেখা গেছে, পুরুষ পাখিদের ওপর বেশি প্রভাব ফেলে অন্য পুরুষ পাখি। আর মেয়ে পাখিরা সবাইকে দেখেই শেখে।

মজার বিষয় হলো, অল্পবয়সী পাখিরা বেশ অনুকরণপ্রবণ। এরা বেশির ভাগ পাখি যা করছে, সেটাই অনুসরণ করতে চায়। একই আচরণ মানবশিশুদের মধ্যেও দেখা যায়। অন্যদিকে প্রাপ্তবয়স্ক পাখিরা শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠকে দেখে সিদ্ধান্ত নেয় না। এরা বেশি গুরুত্ব দেয় এদের ঘনিষ্ঠ সঙ্গীরা কী করছে, তার ওপর।

গবেষণায় দেখা গেছে, পুরুষ পাখিদের ওপর বেশি প্রভাব ফেলে অন্য পুরুষ পাখি। আর মেয়ে পাখিরা সবাইকে দেখেই শেখে।

গবেষকদের মতে, অল্পবয়সী পাখিরা যেহেতু বেশি ঘোরাফেরা করে, তাই নতুন জায়গায় গিয়ে দ্রুত নিরাপদ খাবার চেনার জন্য অন্যদের অনুসরণ করা এদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের ক্ষেত্রেও এমনটা ঘটে। অনেকে খাবার খাওয়ার জন্য এমন রেস্তোরাঁ বেছে নেন, যেখানে বেশি ভিড় থাকে।

আরও একটি দিক লক্ষ করা গেছে। কাকাতুয়ারা বাদাম ভাঙার পদ্ধতিও অনেক সময় এদের কাছের সঙ্গীদের কাছ থেকে শেখে। যদিও এই বিষয়টি সরাসরি পরীক্ষা করা হয়নি, তবুও আচরণে এমন ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, কিশোর আলো

সূত্র: সিএনএন ও নিউইয়র্ক টাইমস