মাশরুম খাতের বাধা দূর করতে আইইউবির নতুন পদ্ধতি
মাশরুম খাতে বাধা দূর করতে আইইউবির উদ্ভাবন

দেশের সম্ভাবনাময় মাশরুম খাতের বিকাশে প্রধান দুই বাধা—ক্ষতিকর ছত্রাকের সংক্রমণ এবং বিপণন জটিলতা নিরসনে নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ (আইইউবি)। সোমবার (২৭ এপ্রিল ২০২৬) বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইফ সায়েন্সেস বিভাগের আয়োজনে আধুনিক মাশরুম চাষ পদ্ধতি বিষয়ক এক বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়।

প্রশিক্ষণ কর্মশালায় অংশগ্রহণ

এতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত ২০ জন অভিজ্ঞ মাশরুম চাষি ও উদ্যোক্তা অংশ নিয়ে এই খাতের বিদ্যমান সংকট ও সম্ভাবনার নানা দিক তুলে ধরেন। মাশরুম কেবল পুষ্টিগুণেই সমৃদ্ধ নয়, বরং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আয়ের এক বড় উৎস হতে পারে। তবে উদ্যোক্তারা দীর্ঘদিন ধরে ছত্রাকের সংক্রমণের কারণে ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। একটি মাত্র স্পন ব্যাগ থেকে সংক্রমণ ছড়িয়ে পুরো খামারের ফলন নষ্ট হওয়ার ঘটনা প্রায়ই ঘটে।

নতুন উদ্ভাবনী পদ্ধতি

এই সমস্যা সমাধানে আইইউবির লাইফ সায়েন্সেস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. জীবুন্নাহার খন্দকার গত তিন বছরের গবেষণায় একটি নতুন উদ্ভাবনী পদ্ধতি তৈরি করেছেন। এই পদ্ধতিটি ক্ষতিকর ছত্রাকের বিস্তার রোধ করে ফলন বাড়াতে সক্ষম এবং এটি পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ। কর্মশালার কারিগরি সেশনে তিনি এই পদ্ধতির বৈজ্ঞানিক দিকগুলো উদ্যোক্তাদের সামনে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেন এবং তাদের মতামতের ভিত্তিতে পদ্ধতিটিকে আরও যুগোপযোগী করার আশ্বাস দেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বিশেষ অতিথির বক্তব্য

অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী পর্বে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কৃষি ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব রেজাউল করিম সিদ্দিক। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, গত ৪০ বছরেও মাশরুম বাংলাদেশের তৃণমূল মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে পারেনি। সাধারণ মানুষের মনে এটি খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করা নিয়ে এখনও সংশয় কাজ করে। উন্নত বীজের অভাব এবং বিপণন ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে মাশরুম এখনও কেবল উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তের খাবারের তালিকায় সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। তৃণমূল পর্যায়ে এর জনপ্রিয়তা বাড়াতে প্রচার ও সঠিক বাজারজাতকরণ প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

উদ্যোক্তাদের অভিজ্ঞতা

বগুড়ার ‘প্রিয়জন মাশরুম ফাউন্ডেশন’-এর প্রতিষ্ঠাতা জামাল উদ্দিন আহমেদ তার দীর্ঘ ২০ বছরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে এক উদ্বেগজনক তথ্য দেন। তিনি জানান, মাশরুম চাষে উদ্যোক্তা ঝরে পড়ার হার প্রায় ৯৯.৯ শতাংশ। এক সময়ের লক্ষাধিক উদ্যোক্তার মধ্যে এখন মাত্র গুটিকয়েক জন টিকে আছেন। ২০০৮ সাল থেকে সামাজিক দায়বদ্ধতা নিয়ে কাজ করা এই উদ্যোক্তা জানান, এক একটি পরিবার প্রতি মাসে মাত্র পাঁচ হাজার টাকার মাশরুম খেলে অনেক কঠিন রোগ থেকে মুক্তি পেতে পারে। তবে এই খাতের বিকাশে উদ্যোক্তাদের মধ্যে ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগের অভাব এবং সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক নিবিড় তত্ত্বাবধানের ঘাটতি রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। মাশরুম যেহেতু অত্যন্ত পচনশীল, তাই টিস্যু কালচার থেকে শুরু করে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে একটি শক্তিশালী চেইন বজায় রাখা জরুরি।

বিপণন ও ই-কমার্স

কর্মশালায় টেকসই বিপণন ও ই-কমার্সের গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করেন আইইউবির হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বিভাগের প্রধান ড. ইকরামুল হাসান। তিনি উদ্যোক্তাদের বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে পারস্পরিক প্রতিযোগিতার চেয়ে সহযোগিতার ওপর বেশি জোর দেওয়ার পরামর্শ দেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে কীভাবে স্বতন্ত্র ব্র্যান্ড গড়ে তোলা যায় এবং নতুন ক্রেতা তৈরি করা যায়, সে বিষয়ে তিনি বাস্তবধর্মী দিকনির্দেশনা প্রদান করেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বক্তব্য

অনুষ্ঠানে আইইউবির উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. ড্যানিয়েল ডব্লিউ. লুন্ড, স্কুল অব এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড লাইফ সায়েন্সেস-এর ডিন ড. কে আয়াজ রাব্বানী এবং লাইফ সায়েন্সেস বিভাগের প্রধান ড. মো. মাহমুদুল হাসান সোহেল বক্তব্য রাখেন। বক্তারা মাশরুম চাষকে একটি ‘জ্ঞানভিত্তিক ব্যবসা’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, নিয়মিত আধুনিক প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি গ্রহণ করার মাধ্যমেই এই শিল্পকে লাভজনক করে তোলা সম্ভব। প্রশিক্ষণ শেষে অংশগ্রহণকারী উদ্যোক্তারা হাতে-কলমে আধুনিক চাষাবাদের কৌশল শেখার পাশাপাশি আইইউবির এই নতুন উদ্ভাবনকে স্বাগত জানান।