বার্ধক্য কি অনিবার্য? মানুষ কেন বুড়ো হয়? কেনই-বা এক সময় জীবন থেমে যায়? হাজার বছর ধরে দার্শনিক, চিকিৎসক ও বিজ্ঞানীরা এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে নানা পথে হেঁটেছেন। এবার তাঁরা এমন একটি জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছেন, যেখান থেকে বার্ধক্যের ভেতরটা অনেকটাই দেখা যাচ্ছে।
জিনের ভাষায় বার্ধক্যের মানচিত্র
সাম্প্রতিক সময়ে আধুনিক জীববিজ্ঞান আমাদের হাতে দিয়েছে এক নতুন চাবিকাঠি— ট্রান্সক্রিপটোমিক্স, অর্থাৎ কোষের ভেতরে জিন কীভাবে 'কথা বলে' তার পূর্ণ মানচিত্র। আশ্চর্যের বিষয় হলো— মানুষ থেকে শুরু করে ইঁদুর, বানর কিংবা অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর ক্ষেত্রে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জিনের এই 'কথাবার্তায়' কিছু সর্বজনীন বা অভিন্ন পরিবর্তন দেখা যায়। বিজ্ঞানীরা এগুলোকে বলছেন 'ট্রান্সক্রিপটোমিক হলমার্কস অব এজিং অ্যান্ড মর্টালিটি' অর্থাৎ বার্ধক্য ও মৃত্যুর জিনগত স্বাক্ষর।
যুগান্তকারী গবেষণা নেচার জার্নালে
সম্প্রতি বিশ্বের অন্যতম সেরা বিজ্ঞান সাময়িকী ‘নেচার’ এ প্রকাশিত এক যুগান্তকারী গবেষণায় বিজ্ঞানীরা ইঁদুর, ইঁদুরজাতীয় প্রাণি, বানর এবং মানুষ— এই চার স্তন্যপায়ী প্রাণির শরীরের ১১ হাজারেরও বেশি জিনগত নমুনা বিশ্লেষণ করেছেন। লক্ষ্য ছিল একটাই, বার্ধক্যের সঙ্গে কোন জিনগুলো পরিবর্তিত হয় এবং সেই পরিবর্তনগুলো কি সব প্রাণির মধ্যে একই রকম তা খুঁজে বের করা। উত্তর পেয়েছেন তাঁরা। সেই উত্তর রীতিমতো চমকে দেওয়ার মতো।
শরীরের ভেতরে কী হচ্ছে?
আমাদের শরীরের প্রতিটি কোষে অসংখ্য জিন আছে। বয়স বাড়লে এই জিনগুলোর কার্যক্রমে পরিবর্তন আসে। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কিছু নির্দিষ্ট জিনগত ধারা বারবার ফিরে আসে:
- প্রদাহ-সম্পর্কিত জিনের অতিসক্রিয়তা: বয়স্ক দেহে দীর্ঘমেয়াদি নিম্নমাত্রার প্রদাহ একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য। রোগ না থাকলেও প্রদাহ-সম্পর্কিত জিনগুলো বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে, যা ধীরে ধীরে টিস্যু ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ক্ষতি করে।
- কোষের শক্তি উৎপাদন ব্যবস্থার দুর্বলতা: মাইটোকন্ড্রিয়া— কোষের শক্তিকেন্দ্র সংক্রান্ত জিনগুলোর কার্যকারিতা বয়সের সঙ্গে কমে যায়। এর ফল ক্লান্তি, পেশিশক্তি হ্রাস এবং অঙ্গের কর্মক্ষমতা কমে যাওয়া।
- প্রোটিন রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থার অবনতি: যে জিনগুলো ক্ষতিগ্রস্ত প্রোটিন মেরামত বা অপসারণ করে, সেগুলোর কার্যকারিতা কমে যায়। ফলে কোষে 'জৈব আবর্জনা' জমতে থাকে।
- কোষ বিভাজন ও পুনর্গঠন-সম্পর্কিত জিনের নীরবতা: বয়সের সঙ্গে কোষের পুনর্জন্ম ক্ষমতা কমে যায়। স্টেম সেল ও টিস্যু মেরামতের সঙ্গে জড়িত জিনগুলো ধীরে ধীরে নিস্ক্রিয় হয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার হলো, এই পরিবর্তনগুলো মানুষ থেকে ইঁদুর— সব প্রাণিতে প্রায় একই। অর্থাৎ বার্ধক্য কোনও একটি প্রজাতির সমস্যা নয়, এটি সমস্ত স্তন্যপায়ী প্রাণীর ভাগ্যে লেখা এক সর্বজনীন প্রক্রিয়া।
দুটি জিন, বড় বার্তা
গবেষণায় দুটি বিশেষ জিনের নাম বারবার উঠে এসেছে — CDKN1A এবং LGALS3। কঠিন নাম, কিন্তু কাজ সহজেই বোঝানো যায়। এই দুটি জিনের প্রোটিন রক্তে যখন বেড়ে যায়, তখন মানুষের মৃত্যুঝুঁকি এবং একাধিক রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনাও বেড়ে যায়। ব্রিটেনের বিশাল ‘ইউকে বায়োব্যাংক’ গবেষণায় লক্ষাধিক মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করে এই সংযোগ নিশ্চিত হয়েছে।
এর ব্যবহারিক তাৎপর্য অনেক। ভবিষ্যতে হয়তো একটি সাধারণ রক্ত পরীক্ষাতেই বলা যাবে কারও শরীর কতটা 'জৈবিকভাবে বৃদ্ধ' হয়ে গেছে— বয়স যা-ই হোক না কেন। ৫০ বছর বয়সী একজন মানুষের শরীর হয়তো চল্লিশের মতো সতেজ, আবার কারও ত্রিশেই শরীর বুড়িয়ে যেতে পারে। এই পার্থক্য ধরার চেষ্টাই এই গবেষণার অন্যতম লক্ষ্য।
বার্ধক্যের গতিপথ কি উল্টে দেওয়া সম্ভব?
গবেষকরা কিছু পরীক্ষায় দেখেছেন, বার্ধক্যের এই জিনগত পরিবর্তন আংশিকভাবে উল্টে দেওয়া সম্ভব। প্রাণীদের মধ্যে বার্ধক্যের চিহ্নগুলো কমানো সম্ভব হয়েছে। কোষ পুনরুজ্জীবন বা ‘রিপ্রোগ্রামিং’-এর মাধ্যমে, বিশেষ খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমে এবং র্যাপামাইসিনের মতো কিছু ওষুধের মাধ্যমে। মানুষের ক্ষেত্রে এই পথ এখনো দীর্ঘ, কিন্তু দিকটা দেখা যাচ্ছে। তবে বিজ্ঞানীরা নিজেরাও সতর্ক করছেন— এই গবেষণার সীমাবদ্ধতা আছে। বেশিরভাগ নমুনায় ব্যক্তিবিশেষের মৃত্যু পর্যবেক্ষণ করা হয়নি, বরং গাণিতিক মডেলের মাধ্যমে মৃত্যুঝুঁকি অনুমান করা হয়েছে। এছাড়া প্রদাহের সংকেত সবসময় বার্ধক্যের কারণে নয়, সংক্রমণ বা অন্য রোগের কারণেও বাড়তে পারে। তাই গবেষণার ফলাফল আশাব্যঞ্জক হলেও, উত্তেজনার আগে আরও যাচাইয়ের প্রয়োজন।
মৃত্যুর পূর্বাভাস কি জিন থেকেই পাওয়া যায়?
সবচেয়ে চমকপ্রদ আবিষ্কার হলো— ট্রান্সক্রিপটোমের কিছু নির্দিষ্ট পরিবর্তন মৃত্যুর ঝুঁকির পূর্বাভাস দিতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, নির্দিষ্ট জিন-প্রোফাইল থাকা প্রাণীরা তুলনামূলকভাবে কম আয়ু পায়, এমনকি বয়স একই হলেও। অর্থাৎ, ক্যালেন্ডারের বয়সের চেয়ে 'জৈবিক বয়স' অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ— আর এই জৈবিক বয়স ধরা পড়ে জিনের ভাষায়।
এই জ্ঞান আমাদের কি উপকারে আসতে পারে?
এই গবেষণাগুলোর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। যেমন- বার্ধক্যজনিত রোগ আগে শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে। এতে করে ব্যক্তিভিত্তিক চিকিৎসা আরও বাস্তবসম্মত হবে। সেইসঙ্গে জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস ও ওষুধের মাধ্যমে জৈবিক বয়স বাড়ার প্রক্রিয়াকে ধীর করার কৌশল বের করা যেতে পারে। এমনকি ভবিষ্যতে সুস্থভাবে বেঁচে থাকার সময়কে দীর্ঘায়িত করাও সম্ভব হতে পারে।
আমাদের কী করার আছে?
কিছু সত্য চিরন্তন। পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত ব্যায়াম, সুষম খাবার এবং মানসিক চাপ কমানো — এই চারটি বিষয় এখনও বার্ধক্যকে ধীর করার সবচেয়ে কার্যকর উপায়। নতুন গবেষণা কেবল ব্যাখ্যা করছে কেন এগুলো কাজ করে— শরীরের কোন জিনগুলোকে এই অভ্যাসগুলো প্রভাবিত করে।
বাংলাদেশে জনস্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা এখনও মূলত শিশুমৃত্যু, সংক্রামক রোগ বা মাতৃস্বাস্থ্যকে কেন্দ্র করে— যা স্বাভাবিক এবং জরুরি। কিন্তু দেশে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। ২০৫০ সালের মধ্যে ৬০ বছরের বেশি বয়সীদের সংখ্যা পৌঁছাবে দুই কোটির ঘরে। তাঁরা কীভাবে বার্ধক্য পার করবেন, সেটা এখনই ভাবার সময় এসেছে। এই নতুন গবেষণা তাই শুধু বিজ্ঞানের খবর নয়। এটি আমাদের জন্য একটি আয়না— যেখানে আমাদের ভবিষ্যৎ শরীর দেখা যাচ্ছে এবং সেই শরীরকে একটু বেশি সুস্থ রাখার সম্ভাবনাও।
শেষ কথা নেই
বার্ধক্য আর মৃত্যু কোনও একক রোগ নয়— এটি একটি জটিল, ধীর ও সর্বজনীন জৈব প্রক্রিয়া। ট্রান্সক্রিপটোমিক গবেষণা আমাদের দেখাচ্ছে, জীবনের শেষ অধ্যায়টি হঠাৎ আসে না, বরং জিনের ভেতরে তার প্রস্তুতি শুরু হয় বহু আগেই। দিনে দিনে বিজ্ঞান আরও এগিয়ে যাবে। জিনের এই নীরব কথোপকথন আমরা হয়ত দিনে দিনে আরো স্পষ্ট করে বুঝতে পারবো। বুঝতে পারলে একদিন মানুষ হয়তো শুধুমাত্র বেশি দিন বাঁচবে না, আরও সুস্থ ও সক্রিয় জীবন, আরও আনন্দ উচ্ছল পরমায়ু উপভোগ করতে পারবে।
লেখক: ড. মো. গোলাম মোস্তফা, অধ্যাপক, মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, বাংলাদেশ



