বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতি: আদর্শের সংগ্রাম থেকে ক্ষমতার লড়াইয়ে রূপান্তর
বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতি: আদর্শ বনাম ক্ষমতার দ্বন্দ্ব

বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতির বিবর্তন: আদর্শ থেকে ক্ষমতার পথে

একটা সময় ছিল যখন বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতি মানেই ছিল আদর্শিক সংগ্রাম ও সমাজ বদলানোর লড়াই। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং পরবর্তী গণ-আন্দোলন—সবক্ষেত্রেই ছাত্রসমাজ ছিল অগ্রণী ভূমিকায়। তখনকার ছাত্রনেতারা শুধু সংগঠনের নেতাই ছিলেন না, তারা ছিলেন সমাজের বিবেক ও নৈতিক কণ্ঠস্বর। তাদের রাজনীতি ছিল একটি দৃঢ় বিশ্বাস থেকে উদ্ভূত, যা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস জোগাতো।

ক্ষমতার কেন্দ্রে জড়িয়ে পড়া রাজনীতি

কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় এসে সেই চিত্র আমূল বদলে গেছে। এখন বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতির একটি বড় অংশ সরাসরি জড়িয়ে গেছে ক্ষমতার কেন্দ্রের সঙ্গে। অনেক ক্ষেত্রে ছাত্রসংগঠনগুলো মূল রাজনৈতিক দলের 'এক্সটেনশন' বা সম্প্রসারণ হিসেবে কাজ করছে। ফলে আদর্শের জায়গা সংকুচিত হয়ে এসেছে, আর তার স্থান দখল করেছে ক্ষমতা, প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণের রাজনীতি। এই পরিবর্তন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের মৌলিক চরিত্রকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

ক্যাম্পাস জীবনে রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রভাব

বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে সিট পাওয়া থেকে শুরু করে ক্যাম্পাসে টিকে থাকার অনেক বিষয়ই এখন রাজনৈতিক পরিচয়ের ওপর নির্ভরশীল। নতুন শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে প্রথমেই যে বাস্তবতার মুখোমুখি হয়, তা হলো 'কোন দলে?' এই জটিল প্রশ্ন। নিজের মতাদর্শ গড়ে তোলার আগেই অনেক শিক্ষার্থীকে বাধ্য হয় কোনো না কোনো রাজনৈতিক ছাতার নিচে আশ্রয় নিতে। এটা এক অদ্ভুত দ্বন্দ্ব—রাজনীতি শেখার জায়গায় রাজনীতির শিকার হওয়া।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ভিন্নমত দমন ও সহিংসতার বৃদ্ধি

আদর্শভিত্তিক রাজনীতির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো মতের ভিন্নতা সহ্য করার ক্ষমতা। কিন্তু বর্তমানে সেই জায়গাটিই সবচেয়ে বেশি সংকুচিত হয়ে পড়েছে। ভিন্নমত মানেই শত্রু—এই ধারণা ক্যাম্পাসে ক্রমশ প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। ফলে আলোচনা ও সমালোচনার জায়গা কমে যাচ্ছে, আর তার বদলে বাড়ছে দমন-পীড়ন, হুমকি ও সহিংসতা। যে ক্যাম্পাস হওয়ার কথা ছিল মুক্ত চিন্তার ক্ষেত্র, সেটি অনেক সময় নিয়ন্ত্রিত চিন্তার আখড়ায় পরিণত হচ্ছে।

সুবিধাভোগ ও নৈতিকতার সংকট

ক্ষমতার রাজনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সুবিধাভোগ। ছাত্ররাজনীতির মাধ্যমে অনেকেই ভবিষ্যতের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার গড়ে তোলে, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু যখন সেই ক্যারিয়ার গড়ার জন্য নীতি-নৈতিকতা বিসর্জন দিতে হয়, তখনই সমস্যা শুরু হয়। টেন্ডার, দখল, প্রভাব বিস্তার—এসব শব্দ যখন ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে যায়, তখন প্রশ্ন জাগে: এটা কি আদর্শের রাজনীতি, নাকি ক্ষমতার ব্যবসা?

আদর্শিক সংগ্রামের অবশিষ্ট চেতনা

তবে পুরো চিত্রটাই যে অন্ধকার, তা বলা যাবে না। এখনো অনেক শিক্ষার্থী আছেন, যারা সত্যিকারের আদর্শ নিয়ে রাজনীতি করতে চান। তারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলেন, ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক পরিবেশ চান এবং স্বচ্ছতা কামনা করেন। কিন্তু তাদের সংখ্যা কম, এবং তারা অনেক সময় প্রভাবশালী গোষ্ঠীর কাছে কোণঠাসা হয়ে পড়েন। এই পরিস্থিতির একটি বড় কারণ হলো রাজনৈতিক দলের সরাসরি হস্তক্ষেপ।

রাজনৈতিক দলের হস্তক্ষেপ ও নিয়ন্ত্রণ

বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যখন জাতীয় রাজনীতির মাঠে পরিণত হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই সেখানে ক্ষমতার লড়াই প্রবেশ করে। ফলে ছাত্ররাজনীতি আর স্বাধীন থাকে না; তা হয়ে যায় নিয়ন্ত্রিত, পরিচালিত এবং অনেক ক্ষেত্রে ব্যবহৃত। এই হস্তক্ষেপ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনকেও ক্ষুণ্ণ করছে, যা শিক্ষার পরিবেশের জন্য হুমকিস্বরূপ।

সমাধানের পথ: মুক্ত চিন্তার জায়গা ফিরিয়ে আনা

তাহলে সমাধান কোথায়? প্রথমত, বিশ্ববিদ্যালয়কে তার মৌলিক চরিত্রে ফিরিয়ে আনতে হবে একটি মুক্ত চিন্তার জায়গা হিসেবে। ছাত্ররাজনীতি থাকবে, কারণ সেটি প্রয়োজন। কিন্তু সেই রাজনীতি হতে হবে আদর্শভিত্তিক, অংশগ্রহণমূলক ও সহনশীল। ভিন্নমতকে দমন না করে, তাকে জায়গা দিতে হবে আলোচনা ও বিতর্কের মাধ্যমে।

ছাত্রসংগঠনকে স্বাধীনতা দেওয়ার আহ্বান

দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত ছাত্রসংগঠনগুলোকে কিছুটা স্বাধীনতা দেওয়া। তাদেরকে কেবল 'ক্যাডার' হিসেবে না দেখে, ভবিষ্যৎ নেতা হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ দিতে হবে। কারণ, বিশ্ববিদ্যালয়ে যে রাজনীতির চর্চা হবে, সেটিই ভবিষ্যতের জাতীয় রাজনীতিকে প্রভাবিত করবে এবং গুণগত মান নির্ধারণ করবে।

শিক্ষার্থীদের সচেতনতা ও দায়িত্ব

সবশেষে দায়িত্বটা শিক্ষার্থীদেরও। তারা যদি সচেতন হয়, যদি প্রশ্ন করতে শেখে এবং যদি অন্ধ অনুসরণ না করে, তাহলেই পরিবর্তন সম্ভব। রাজনীতি মানে শুধু ক্ষমতা নয়, দায়িত্বও। এই বোধ যদি ফিরে আসে, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতিও তার হারানো মর্যাদা ফিরে পেতে পারে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে জাগ্রত চেতনা ভবিষ্যতের জন্য আশার আলো দেখায়।

চিরন্তন দ্বন্দ্ব ও ভবিষ্যতের প্রশ্ন

বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতি আদর্শ আর ক্ষমতার মধ্যকার এক চিরন্তন দ্বন্দ্ব। কিন্তু এই দ্বন্দ্বে যদি ক্ষমতা সব সময় জিতে যায়, তাহলে হারবে শুধু রাজনীতি নয়, হারবে একটি জাতির ভবিষ্যৎও। তাই এখনই সময় প্রশ্ন তোলার: আমরা কোন বিশ্ববিদ্যালয় চাই? আদর্শের, নাকি ক্ষমতার? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি আমাদের সমাজের অগ্রগতির জন্য।