কয়রায় অসমাপ্ত সড়ক প্রকল্পে চরম জনদুর্ভোগ, স্থানীয়দের ক্ষোভ
কয়রায় অসমাপ্ত সড়ক প্রকল্পে চরম জনদুর্ভোগ

খুলনার উপকূলীয় উপজেলা কয়রায় সড়ক উন্নয়নের নামে শুরু হওয়া একাধিক প্রকল্প দীর্ঘদিন ধরে অসমাপ্ত পড়ে থাকায় জনদুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে। কোটি কোটি টাকা বরাদ্দের পরও নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে স্থানীয়দের মধ্যে। কোথাও সড়ক খুঁড়ে ফেলে রাখা হয়েছে, কোথাও ইটের খোয়া ও বালু ছড়িয়ে রেখে কাজ বন্ধ রয়েছে। ফলে বছরের পর বছর ধরে দুর্বিষহ যাতায়াত ব্যবস্থার শিকার হচ্ছেন উপজেলার কয়েক লাখ মানুষ।

স্থানীয়দের অভিযোগ ও দুর্বিষহ অবস্থা

স্থানীয়দের অভিযোগ, উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রকল্প শুরু হলেও বাস্তবে অনেক সড়ক এখন আগের চেয়েও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বর্ষা মৌসুমে কাদা ও জলাবদ্ধতা, আর শুষ্ক মৌসুমে ধুলার কারণে নাজেহাল অবস্থা তৈরি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ছেন শিক্ষার্থী, রোগী, কৃষক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী এবং যানবাহন চালকেরা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে সংস্কারকাজ শুরু হওয়ার পর তা মাঝপথে থেমে আছে। কোথাও পুরোনো কার্পেটিং তুলে ফেলা হয়েছে, কোথাও রাস্তার ওপর খোয়া ও বালু ফেলে রাখা হয়েছে। অনেক স্থানে বড় বড় গর্ত সৃষ্টি হওয়ায় যান চলাচল প্রায় অনিরাপদ হয়ে পড়েছে। বৃষ্টি হলে এসব গর্ত পানিতে তলিয়ে যায়, ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মদিনাবাদ সড়ক: চার বছরেও শেষ হয়নি

কয়রা সদর ইউনিয়নের মদিনাবাদ মাধ্যমিক বিদ্যালয় মোড় থেকে ৪ নম্বর কয়রা গ্রাম পর্যন্ত প্রায় আড়াই কিলোমিটার সড়কের সংস্কারকাজ শুরু হয়েছিল ২০২১ সালের নভেম্বরে। ঘূর্ণিঝড় আম্পানে ক্ষতিগ্রস্ত এ সড়ক সংস্কারের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয় ১ কোটি ২৩ লাখ টাকা। কাজ পায় মেসার্স রাকা এন্টারপ্রাইজ। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও প্রায় চার বছর পার হতে চললেও প্রকল্পটি এখনও অসমাপ্ত।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

স্থানীয় বাসিন্দা রেজয়ানুল ইসলাম বলেন, "এটি তিনটি ইউনিয়নের মানুষের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ সড়ক। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ এই পথ ব্যবহার করেন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সড়কের এমন অবস্থা যে চলাচল করতে গিয়ে চরম ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে।"

বানিয়াখালী-হড্ডা সড়কে ৬ কোটি টাকার প্রকল্প ঝুলে

একই চিত্র দেখা গেছে মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নের বানিয়াখালী থেকে হড্ডা গ্রামের সড়কেও। প্রায় ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ এ সড়কের উন্নয়নকাজ শুরু হয়েছিল ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে। ৬ কোটি ৪৯ লাখ টাকার প্রকল্পটির দায়িত্বে থাকা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মোহাম্মদ ইউনুচ অ্যান্ড ব্রাদার্স নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে পারেনি। ফলে খোঁড়াখুঁড়ি করা সড়কে বালু ছড়িয়ে পড়ে আছে মাসের পর মাস, আর চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে স্থানীয় বাসিন্দাদের।

বানিয়াখালী গ্রামের বাসিন্দা কৃষ্ণপদ মণ্ডল বলেন, "কাজ শুরু হওয়ার পর আমরা ভেবেছিলাম ভালো রাস্তা পাব। কিন্তু এখন রাস্তার অবস্থা এমন হয়েছে যে চলাচলই কঠিন হয়ে পড়েছে। মনে হয় প্রকল্পের কোনো শেষ নেই।"

হুদুবুনিয়া-চাঁদশিরচক সড়ক: চার বছরেও অগ্রগতি নেই

আমাদী ইউনিয়নের হুদুবুনিয়া-চাঁদশিরচক সড়কের চিত্রও ভিন্ন নয়। পল্লি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় দুই কিলোমিটার সড়ক কার্পেটিংয়ের জন্য ২০২১ সালে ১ কোটি ৭৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। দরপত্রের মাধ্যমে কাজ পায় রাকা-সিয়াম (জেভি)। কাজ শুরুর কিছুদিন পরই সড়ক খুঁড়ে রেখে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কার্যত কাজ বন্ধ করে দেয়। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে প্রায় চার বছর হতে চললেও প্রকল্পটির কাজ শেষ হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

জনজীবনে নেতিবাচক প্রভাব

স্থানীয়রা বলছেন, কাজের ধীরগতির কারণে শিক্ষার্থীদের স্কুলে যেতে, রোগীদের হাসপাতালে পৌঁছাতে এবং কৃষকদের উৎপাদিত পণ্য বাজারে নিতে বাড়তি দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। সময়মতো পণ্য আনা-নেওয়া সম্ভব না হওয়ায় ব্যবসায়িক ক্ষতির মুখেও পড়তে হচ্ছে অনেককে। কৃষকরাও তাদের উৎপাদিত ফসল বাজারজাত করতে নানা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন।

ভ্যানচালক মোশারাফ হোসেন বলেন, "প্রতিদিনই ঝুঁকি নিয়ে গাড়ি চালাতে হয়। অনেক সময় গর্তে পড়ে ভ্যান উল্টে যায়। যাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়েও শঙ্কায় থাকতে হয়।"

তদারকির অভাব ও ঠিকাদারদের গাফিলতি

স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগ, প্রকল্প বাস্তবায়নে তদারকির অভাব এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতির কারণেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হলে মানুষের এত দীর্ঘ ভোগান্তি পোহাতে হতো না। কয়রা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি বিদেশ রঞ্জন মৃধা বলেন, "উন্নয়নের নামে জনগণকে বছরের পর বছর দুর্ভোগে রাখা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। দ্রুত প্রকল্পগুলো শেষ না হলে মানুষের ক্ষোভ আরও বাড়বে।"

এলজিইডির ব্যাখ্যা ও পদক্ষেপ

তবে এলজিইডির কর্মকর্তারা বলছেন, কিছু প্রকল্পে কারিগরি জটিলতা, নকশা সংশোধন ও সমন্বয় সমস্যার কারণে কাজ বিলম্বিত হয়েছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি স্থগিত প্রকল্প বাতিল করা হয়েছে এবং কিছু প্রকল্প পুনরায় দরপত্রের মাধ্যমে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এলজিইডির খুলনা জেলা কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী গোলাম মোস্তফা বলেন, "যেসব প্রকল্প দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে সেগুলো দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না করলে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।"