চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনে নেওয়া প্রকল্পের মেয়াদ আরও দুই বছর বাড়ানো হচ্ছে। ২০১৭ সালে শুরু হওয়া তিন বছরের প্রকল্পটি এখন ১১ বছরে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) দ্বিতীয় দফা প্রকল্প সংশোধন করে নতুন মেয়াদ নির্ধারণ করেছে ২০২৮ সালের জুন। চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য গত জুনে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
প্রকল্পের ব্যয় ও সময় বৃদ্ধি
প্রকল্পটির নাম ‘চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে খাল পুনঃখনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন’। ২০১৭ সালের আগস্টে একনেকে অনুমোদনের সময় মূল ব্যয় ছিল ৫ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে প্রথম দফা সংশোধনে ব্যয় দাঁড়ায় ৮ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা। বর্তমান দ্বিতীয় সংশোধনে ব্যয় কমে হয়েছে ৮ হাজার ৫৯১ কোটি টাকা। সিল্টট্র্যাপ, নালা সম্প্রসারণ ও ফুটপাতসহ বিভিন্ন খাতে কাজের পরিমাণ কমানো হয়েছে।
কাজের অগ্রগতি ও অবশিষ্ট খাল
সিডিএর জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের গত মে পর্যন্ত অগ্রগতি ৯৮ শতাংশ। ৩৬ খালের মধ্যে হিজড়া ও জামাল খান খালের কাজ শেষ হয়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকল্পের পরিকল্পনায় ত্রুটি ছিল। বিস্তৃত মাঠ সমীক্ষা, পানিপ্রবাহ বিশ্লেষণ, জোয়ার-ভাটা বিবেচনা, খাল-নালা-জলাধারের সমন্বিত মূল্যায়ন যথাযথভাবে করা হয়নি।
অর্থায়ন কাঠামো পরিবর্তন
সিডিএর নির্বাহী প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক আহমদ মঈনুদ্দিন বলেন, ‘প্রকল্পের অধিকাংশ কাজ শেষ হয়েছে। তবে অর্থায়ন নিয়ে জটিলতা থাকায় সংশোধনের প্রয়োজন হয়েছে। আগে প্রকল্পের একটি অংশ সিডিএর নিজস্ব তহবিল (৭৫৩ কোটি টাকা) ও সরকারি ঋণ (৭৫৩ কোটি টাকা) থেকে দেওয়ার কথা ছিল। এখন প্রায় পুরো অর্থই সরকারি অনুদান হিসেবে পাওয়া যাবে। তবে এই অর্থ একসঙ্গে না দিয়ে দুই বছরে ধাপে ধাপে দেবে সরকার। সে কারণেই প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হচ্ছে।’
নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, মোট ৮ হাজার ৫৯১ কোটি টাকার মধ্যে ৮ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা সরকারি অনুদান হিসেবে পাওয়া যাবে। বাকি ১০৩ কোটি টাকা সরকার থেকে ৫ শতাংশ সুদে ঋণ নেওয়া হবে, যা ২০ বছরে পরিশোধ করতে হবে।
ব্যয় হ্রাস ও বৃদ্ধি
প্রকল্পের ব্যয় কমাতে সিল্টট্র্যাপ, ফুটপাত, বিটুমিন সড়কসহ কয়েকটি খাতে কাজ কমানো হয়েছে। এতে প্রায় ৪৮৮ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে। তবে ১৩টি খাতে ব্যয় বাড়ানো হয়েছে, যাতে বাড়তি খরচ হবে প্রায় ৪৫৩ কোটি টাকা। খালের মাটি উত্তোলন ও গভীরতা বৃদ্ধি, ড্রেনেজ অবকাঠামো সংরক্ষণ, আরসিসি সড়ক, নতুন নালা, আরসিসি গার্ডার সেতু, কালভার্ট নির্মাণে উল্লেখযোগ্য ব্যয় বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশের (আইইবি) চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সাবেক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার বলেন, ‘জলাবদ্ধতা নিরসন কাজ নিয়ে সিডিএর বাস্তব কোনো ধারণা ছিল না। সংস্থাটি অত্যন্ত তাড়াহুড়া করে এবং যথাযথ কোনো সমীক্ষা না করে প্রকল্পটি নিয়েছিল। এ কারণে প্রথম দুই বছর কাজই শুরু করা যায়নি। পরবর্তী সময়েও মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে নতুন নতুন সমস্যা ও জটিলতা চিহ্নিত হয়েছে। এ কারণে সময় বৃদ্ধি ছাড়া বিকল্প ছিল না।’
জলাবদ্ধতা নিরসনে ৮ থেকে ১০ বছর ধরে চারটি প্রকল্পের কাজ চলছে। গত মার্চ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ১০ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা। বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরেও জলাবদ্ধতা পুরোপুরি নিরসন হয়নি। চলতি বছর সবচেয়ে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা হয় গত ২৮ এপ্রিল।



