ঢাকায় জিরো সিগন্যাল ম্যানেজমেন্ট: ১০৫ কিলোমিটার এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা
ঢাকায় জিরো সিগন্যাল ম্যানেজমেন্ট: ১০৫ কিলোমিটার এক্সপ্রেসওয়ে

ঢাকায় জিরো সিগন্যাল ম্যানেজমেন্ট: যানজটমুক্ত শহরের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে

ঢাকা শহরে যানজটের দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে সরকার একটি যুগান্তকারী প্রকল্প হাতে নিয়েছে। জিরো সিগন্যাল ম্যানেজমেন্ট মডেল নামের এই উদ্যোগের মাধ্যমে রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকার উত্তর-দক্ষিণ ও পূর্ব-পশ্চিমের ১০৫ কিলোমিটার রাস্তায় কোনো সিগন্যাল বা লাল-সবুজ বাতি থাকবে না, যা যানবাহনকে নিরবচ্ছিন্নভাবে চলাচলের সুযোগ দেবে।

প্রকল্পের মূল উপাদান ও নির্মাণ পরিকল্পনা

জিরো সিগন্যাল এক্সপ্রেসওয়ে বাস্তবায়নের জন্য বেশ কয়েকটি অবকাঠামো নির্মাণের প্রয়োজন হবে। প্রকল্পের প্রস্তাবনা অনুযায়ী, মোট ৪৩টি অবকাঠামোর মধ্যে ৬টি বর্তমানে বিদ্যমান, বাকি ৩৭টি নির্মাণ করতে হবে। তবে প্রাথমিকভাবে ৩০টি অবকাঠামো তৈরি হলেই কানেকটিভিটি চালু করা সম্ভব হবে। নির্মাণাধীন অবকাঠামোর তালিকায় রয়েছে:

  • নিমতলী বাসস্ট্যান্ড, হযরত গোলাপশাহ মোড়, কাকরাইল, শান্তিনগর
  • রামপুরা টিভি, নতুন বাজার, আজমপুর, জমজম টাওয়ার
  • ময়লার মোড়, মিরপুর ক্যান্টনমেন্ট, মিরপুর-১০, সনি সার্কেল
  • বাংলা কলেজ, টেকনিক্যাল মোড়, আড়ং, সাইন্সল্যাব
  • নীলক্ষেত মোড়, পলাশী মোড়, শহীদ মিনার, শিক্ষা ভবন-হাইকোর্ট মোড়
  • মৎস্য ভবন, তেজগাঁও সাউথ, তেজগাঁও নর্থ, মহাখালী বাসস্ট্যান্ড
  • গুলশান লিংকরোড, মহাখালী রেলক্রসিং, বনানী সাউথ, বনানী নর্থ
  • আগারগাঁও বাসস্ট্যান্ড, জিয়া উদ্যান-উড়োজাহাজ চত্বর, বিজয় সরণি
  • কারওয়ান বাজার, বাংলামটর, শাহবাগ মোড়, আবুল হোটেল, দিয়াবাড়ি, কাজিপাড়া

এই অবকাঠামোর মধ্যে ১৯টি ওভারপাস বা আন্ডারপাস অন্তর্ভুক্ত, যার মধ্যে ৩টি ইতিমধ্যে বিদ্যমান। বাকি ১৬টি নির্মাণে আনুমানিক খরচ ধরা হয়েছে ৮৬০ কোটি ১৬ লাখ টাকা। এছাড়া ১৬টি ইউলুপ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে, যার মধ্যে ৩টি বিদ্যমান। বাকি ১৩টি ইউলুপ নির্মাণে প্রায় ৬২৪ কোটি টাকা ব্যয় হবে। একটি ওভারপাস ইন্টারচেঞ্জ নির্মাণে ১৫৩ কোটি টাকা খরচের অনুমান করা হয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অর্থনৈতিক ব্যয় ও সম্ভাব্যতা যাচাই

প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২৩৭২ কোটি ১৬ লাখ টাকা, যার মধ্যে ৩০টি ফুট ওভারব্রিজ নির্মাণে ৩০০ কোটি টাকা আলাদাভাবে বরাদ্দ। ফ্লাইওভার নির্মাণের খরচ পৃথকভাবে নির্ধারণ করা হবে। প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই ও বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে একটি গুরুত্বপূর্ণ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, পুলিশ অধিদপ্তর, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এবং ডিটিসিএ-র প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

সভায় অংশগ্রহণকারী প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে তাদের লিখিত মতামত জমা দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে। একটি সূত্র মতে, ১০৫ কিলোমিটার জিরো সিগন্যাল এক্সপ্রেসওয়ের বাইরে রাজধানীর অন্যান্য সড়কগুলোতে অটোমেটেড ট্রাফিক লাইট ও সিগন্যাল ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে। এজন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তাবনা প্রণয়ন করা হয়েছে:

  1. স্বল্পমেয়াদি: ৩ মাসের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভিত্তিক ট্রাফিক লাইট ও সিগন্যাল অটোমেশন করা।
  2. মধ্যমেয়াদি: ১ থেকে ২ বছরের মধ্যে জিরো সিগন্যাল ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট চালু করা।
  3. দীর্ঘমেয়াদি: ঢাকা মহানগরের ভেতরের আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল শহরের বাইরে স্থানান্তর, নতুন বাইপাস সড়ক নির্মাণ, সিটি সার্ভিস চালু, ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন চালু করা।

যানজটের বর্তমান অবস্থা ও অর্থনৈতিক প্রভাব

ঢাকার যানজট সমস্যা দিন দিন তীব্র হয়ে উঠছে। গবেষণায় দেখা গেছে, যানজটের কারণে ঢাকায় যানবাহনের গড় গতি ঘণ্টায় মাত্র ৪ কিলোমিটারে নেমে এসেছে। এর ফলে প্রতিদিন ৯০ লাখ কর্মঘণ্টা অপচয় হয়, তেল অপচয় হয় ১.৮ কোটি লিটার। দৈনিক তেল অপচয়ের ব্যয় ২১৬ কোটি টাকা, যা বার্ষিক প্রায় ৭৮ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়ায়।

শুধু তাই নয়, যানজটের কারণে উৎপাদনশীলতা হ্রাস, জ্বালানি অপচয় ও স্বাস্থ্য সংক্রান্ত ব্যয়ের ফলে দেশের অর্থনীতিতে প্রতিবছর আনুমানিক ৭.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ক্ষতি হয়। এই ক্ষতি মোট জিডিপির প্রায় ৭ থেকে ১১ শতাংশ কমিয়ে দিচ্ছে। জিরো সিগন্যাল ম্যানেজমেন্ট প্রকল্পটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে এই বিশাল অর্থনৈতিক ক্ষতি হ্রাস পেতে পারে এবং ঢাকাবাসীর জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে।