রাজশাহীতে ফুটপাত দখল: কোটি টাকার চাঁদাবাজি, যানজট ও পথচারীদের ভোগান্তি
রাজশাহীতে ফুটপাত দখল: চাঁদাবাজি ও যানজটে পথচারীদের দুর্ভোগ

রাজশাহীতে ফুটপাত দখল: কোটি টাকার চাঁদাবাজি ও পথচারীদের দুর্ভোগ

রাজশাহী মহানগরীর সড়ক ও ফুটপাতগুলো অবৈধভাবে দখল করে চলছে নানা ধরনের ব্যবসা, যা শহরের যানজট ও পথচারীদের ভোগান্তির অন্যতম কারণ। ফুল, ফল থেকে শুরু করে ভাতের হোটেল পর্যন্ত এসব দোকানপাট স্থানীয়দের দৈনন্দিন চলাচলে বাধা সৃষ্টি করছে। মাঝেমধ্যে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলেও কয়েকদিনের মধ্যেই আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়, যার পেছনে রয়েছে কোটি টাকার চাঁদাবাজি ও রাজনৈতিক মদত।

ফুটপাত দখলের বিস্তারিত চিত্র

নগরীর মোট ৪১০ কিলোমিটার পাকা সড়কের মধ্যে মাত্র ১৫ কিলোমিটারে ফুটপাত থাকলেও সেগুলোও দখল হয়ে গেছে। আলুপট্টি থেকে রাজশাহী কলেজ, রেলগেট থেকে গণকপাড়া, লক্ষ্মীপুর থেকে রেলগেট, শিরোইল, ভদ্রা, তালাইমারী, কাজলা, বিনোদপুর, কোর্ট স্টেশন, শালবাগান, নওদপাড়া এলাকার অধিকাংশ ফুটপাত এখন দোকানের সম্প্রসারিত অংশ, হকার, অস্থায়ী দোকানপাট ও পার্ক করা যানবাহনে ভরপুর। অনেক জায়গায় ফুটপাতগুলো কার্যত অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্যিক স্থানে পরিণত হয়েছে, ফলে পথচারীদের হাঁটার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা নেই।

স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা ঝুঁকি

রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের উত্তর পাশের ফুটপাত, যা মুমূর্ষু রোগী নিয়ে আসা স্বজনদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সেটিও প্লাস্টিকের সামগ্রী ও ফল ব্যবসায়ীদের দখলে। অবশিষ্ট জায়গায় রিকশা ও অটোরিকশা দাঁড়িয়ে থাকে, ফলে চলাচল প্রায় অসম্ভব। সাহেব বাজার এলাকায় ফুল ও ফলের দোকানসহ তালাচাবি মেরামত, গামছা-লুঙ্গি, সুতা-দড়ি, টুপি, বেল্ট, আতর-সুরমার দোকান ফুটপাত জুড়ে বিস্তৃত।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এ অবস্থায় পথচারী ও শিশু শিক্ষার্থীরা ব্যস্ত রাস্তায় চলন্ত যানবাহনের পাশ দিয়ে হাঁটতে বাধ্য হচ্ছেন, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। স্কুলশিক্ষক শওকত হোসেন বলেন, ‘নগরীর ফুটপাতগুলো ব্যবহারযোগ্য না। আমাদের প্রতিদিন রাস্তায় হাঁটতে হয়, এতে ব্যাটারিচালিত রিকশার ভয় আছে।’ অভিভাবক ফেরদৌসী রহমানও উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘ফুটপাত দখল হওয়ায় ব্যস্ত রাস্তা দিয়ে মেয়েকে স্কুলে নিয়ে যেতে হয়, সারাক্ষণ শঙ্কায় থাকতে হয়।’

চাঁদাবাজি ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা

স্থানীয়দের অভিযোগ, অবৈধ দখলের ধারাবাহিকতায় চাঁদাবাজি ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা রয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা এসব দোকান থেকে প্রতিদিন কোটি টাকা চাঁদা আদায় করেন। সচেতন নাগরিক কমিটির রাজশাহীর সভাপতি দীপক দাস বলেন, ‘যারা ফুটপাত দখল করে তারা রাজনৈতিক মদতে করে। হকাররাও ব্যবসা চালাতে চাঁদা দিতে বাধ্য হচ্ছেন।’

রিসার্চগেটে প্রকাশিত একটি সমীক্ষায় রাজশাহীর হাঁটার উপযোগিতাকে ১০০-এর মধ্যে মাত্র ৪৩ দশমিক ২০ রেটিং দেওয়া হয়েছে, যা ‘হাঁটার অনুপযোগী’ বিভাগে স্থান পেয়েছে। জনগোষ্ঠীর জন্য অবকাঠামোগত স্কোর আরও কম, যা শহরের পরিকল্পনাগত দুর্বলতা নির্দেশ করে।

উচ্ছেদ অভিযান ও চ্যালেঞ্জ

রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক মুহাইমিনুল ইসলাম বলেন, ‘মাঝেমধ্যে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়, কিন্তু ধারাবাহিক নজরদারির অভাবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ফুটপাতগুলো পুনরায় দখল হয়ে যায়। অনানুষ্ঠানিক হকারদের জন্য পুনর্বাসন পরিকল্পনার অভাবে দখলের চক্র অব্যাহত আছে।’

রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাউল করিম জানান, ‘নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান ও ভ্রাম্যমাণ আদালত চালানো হয়, কিন্তু ফুটপাত পরিষ্কার রাখতে সব অংশীজনের সহযোগিতা প্রয়োজন। দখলকৃত ফুটপাত উদ্ধার করাও বড় চ্যালেঞ্জ।’

ব্যবসায়ী জিএম বাবুল চৌধুরীর মতে, ‘ফুটপাতগুলো যদি পথচারীর জন্য উন্মুক্ত হয়, তাহলে অনেক দুর্ঘটনা কমে যাবে এবং পথচারীরা শান্তিতে চলাফেরা করতে পারবেন।’ এই সমস্যা সমাধানে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কার্যকর আইন প্রয়োগের উপর জোর দিচ্ছেন স্থানীয়রা।