বাগেরহাটের মাজারের দিঘিতে কুকুর-কুমির ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন
বাগেরহাটের হজরত খানজাহান (রহ.)-এর মাজারের দিঘিতে একটি কুকুরকে কুমিরের টেনে নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় জেলা প্রশাসন একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। শনিবার (১১ এপ্রিল) সকালে এই কমিটি গঠনের পাশাপাশি কুকুরটির নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে, যা পরবর্তীতে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হচ্ছে।
তদন্ত কমিটির গঠন ও কার্যক্রম
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে, যার নেতৃত্বে রয়েছেন সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আতিয়া খাতুন। কমিটির অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা এবং সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি)। কমিটি ইতিমধ্যেই তদন্তকাজ শুরু করেছে এবং দ্রুত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা জানিয়েছে।
জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন বলেন, ‘প্রাণীটির শরীরে কুমিরের আঘাত ছাড়া আর কোনও আঘাত আছে কিনা, তা পরীক্ষা করা হচ্ছে। তদন্ত কমিটি সবার সঙ্গে কথা বলে প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করবে এবং আজকেই প্রতিবেদন দেবে। এরপর আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
কুকুরের নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মোহাম্মদ ছাহেব আলী জানান, কুকুরটির মাথার স্যাম্পল ঢাকার সেন্ট্রাল ডিজিজ ইনভেস্টিগেশন ল্যাবরেটরিতে (সিডিআইএল) পরীক্ষার জন্য পাঠানো হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘সিডিআইএল থেকে রিপোর্ট পাওয়ার পর কুকুরটি অসুস্থ ছিল কিনা বা জলাতঙ্ক রোগে আক্রান্ত ছিল কিনা—সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাবে।’ শনিবার দুপুরে মাটিচাপা দেওয়া কুকুরের মৃতদেহ থেকে এই নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের তত্ত্বাবধানে।
ঘটনার পটভূমি ও সামাজিক মাধ্যমের আলোচনা
গত ৮ এপ্রিল মাজারের দিঘিতে এই ঘটনা ঘটে, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচিত হয়। ভিডিও ও ছবি শেয়ার করে অনেকে দাবি করেন, কুকুরটিকে পা বেঁধে কুমিরকে খাওয়ানোর জন্য ফেলা হয়েছে। তবে মাজারের খাদেমরা এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলছেন, ঘটনাটি ভিন্নভাবে ঘটেছে।
মাজারের খাদেম, নিরাপত্তাপ্রহরী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, ঘটনার দিন একটি অসুস্থ কুকুর শিশুসহ কয়েকজনকে কামড় দেয়। এরপর কুকুরটিকে তাড়াতে লাঠি ছুড়ে মারা হয়, এবং তা দৌড়ে মূল ঘাটে গিয়ে নিরাপত্তাপ্রহরী ফোরকানকে আঁচড় দেয়। ফোরকান পা ঝাড়া দিলে কুকুরটি পানিতে পড়ে যায় এবং কুমিরটি তাকে ধরে টেনে নিয়ে যায়। প্রায় আধা ঘণ্টা পর মৃত অবস্থায় দিঘির অন্য পাশে ভেসে ওঠে কুকুরটি, যা পরে মাটিচাপা দেওয়া হয়।
প্রতিক্রিয়া ও ব্যবস্থা
জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন উল্লেখ করেন, ‘মাজারের দিঘিতে কখনও কুমিরকে কুকুর খেতে দেওয়া হয় না। তবে ভক্তরা কখনও কখনও মুরগি ছুড়ে দিতে চান, যা বন্ধ করা দরকার। খাদেম ও দায়িত্বশীলদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যেন জীবন্ত প্রাণী কুমিরের খাবার হিসেবে দিঘিতে না ফেলা হয়।’
জেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি ও মাজারের প্রধান খাদেম ফকির তারিকুল ইসলাম বলেন, ‘ঘটনাটি অনাকাঙ্ক্ষিত ছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার নেশায় ভুল ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, যা খুবই দুঃখজনক। ভুল তথ্য ছড়ানোর প্রতিক্রিয়ায় আমরা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেছি। কুকুরটি নিজে থেকে ঘাটে গিয়েছিল, কেউ তাকে বেঁধে বা ঠেলে দিঘিতে ফেলেনি।’
এই ঘটনায় জেলা প্রশাসনের দ্রুত তদন্ত ও নমুনা সংগ্রহ প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে, এবং সামাজিক মাধ্যমের গুজবের বিরুদ্ধে সচেতনতা বৃদ্ধির উপর জোর দেওয়া হচ্ছে।



