৫০ বছরের পুরোনো অপরাধবোধ থেকে মুক্তি পেতে ট্রেনের বকেয়া ভাড়া শোধ করলেন বৃদ্ধ
গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার বাসিন্দা মফিজুল ইসলাম (৬০) দীর্ঘ ৫০ বছর আগে বিনা টিকিটে ট্রেনে যাতায়াতের ঘটনায় অনুশোচনা থেকে অবশেষে টিকিটের মূল্য পরিশোধ করেছেন। তিনি ২০ হাজার টাকা জমা দিয়ে নিজের সেই পুরোনো ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করেছেন, যা তাকে বছরের পর বছর যন্ত্রণা দিয়েছে।
স্টেশন মাস্টারের পরামর্শে ২০ হাজার টাকা জমা
বুধবার (৮ এপ্রিল) শ্রীপুর রেলস্টেশন মাস্টার মো. সাইদুর রহমানের পরামর্শে তিনি ২০ হাজার টাকা জমা দেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন স্টেশন মাস্টার নিজেই। মফিজুল ইসলাম গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার চন্নাপাড়া এলাকার আব্দুল মান্নান বেপারীর ছেলে।
জানা গেছে, ১৯৭৬ সালের দিকে তরুণ বয়সে মফিজুল ইসলাম কাঁঠালের ব্যবসা শুরু করেন। গাজীপুরের শ্রীপুর থেকে কাঁঠাল কিনে তিনি ঢাকায় নিয়ে বিক্রি করতেন। আর সেই কাঁঠাল গাজীপুর থেকে ঢাকায় আনা নেওয়া করতেন ট্রেনযোগে। কিন্তু ওই সময় তিনি বিনা টিকিটে ট্রেনে যাতায়াত করতেন। কোন কোন সময় ট্রেনে দায়িত্বপ্রাপ্তদের কিছু টাকা দিতেন। তবে সেই টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হতো না।
অপরাধবোধ থেকে মুক্তির চেষ্টা
তরুণ বয়সে বিনা টিকিটে কয়েক বছর ট্রেনে যাতায়াত করে বর্তমানে নিজেকে অপরাধী মনে করেন মফিজুল ইসলাম। সেই অপরাধ তাকে প্রতিনিয়ত যন্ত্রণা দিচ্ছিল। তার সেই যন্ত্রণা থেকে নিজেকে শান্ত করতে যোগাযোগ করেন গাজীপুরের শ্রীপুর রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার সাইদুর রহমানের সঙ্গে। পরে স্টেশন মাষ্টারের পরামর্শে তার কাছে ট্রেনের টিকিটের মূল্য বাবদ ২০ হাজার টাকা পরিশোধ করেন মফিজুল ইসলাম।
মফিজুল ইসলাম বলেন, ‘১৯৭৬ সালের দিকে ব্যবসায়িক প্রয়োজনে কাঁঠাল নিয়ে বিনা টিকিটে ট্রেনে ঢাকায় যাতায়াত করতাম। তখন বুঝতাম না এটা অপরাধ। কোন কোন সময় ট্রেনের দায়িত্বরতদের কিছু টাকা হাতে ধরিয়ে দিতাম। কিন্তু সেটা বৈধ ছিল না। এখন বৃদ্ধ বয়সে সেই অপরাধটা কুড়ে কুড়ে তীব্র যন্ত্রণা দিচ্ছিল। তাই নিজের ঋণ পরিশোধ করতে সেই ট্রেনের ভাড়া পরিশোধ করার সিদ্ধান্ত নেই। পরে স্টেশন মাস্টারের কাছে ২০ হাজার টাকা পরিশোধ করি। এখন নিজেকে অপরাধ মুক্ত মনে হচ্ছে। অনেক স্বস্তিবোধ করছি। সকলের কাছে অনুরোধ থাকলো কেউ যেন বিনা টিকিটে ট্রেনে বা কোন যানবাহনে যাতায়াত না করেন।’
রেলওয়ের আইনি বিধান অনুসরণ
রেলস্টেশন মাস্টার মো. সাইদুর রহমান বলেন, ‘গত ১ এপ্রিল ওই বৃদ্ধ স্টেশনে এসে টাকা পরিশোধ করেন। ওই টাকা ৬ এপ্রিল রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়া হয়।’ রেলস্টেশন মাস্টার আরও বলেন, ‘রেলওয়েতে এভাবে পুরোনো বকেয়া বা দায়মুক্তির টাকা পরিশোধের আইনি বিধান রয়েছে। মফিজুল ইসলাম এসে যখন বিষয়টি খুলে বললেন, আমরা তার মানসিকতায় মুগ্ধ হয়েছি।’
এই ঘটনা নৈতিক দায়িত্ববোধ ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। মফিজুল ইসলামের এই পদক্ষেপ শুধুমাত্র আর্থিক দায় পরিশোধই নয়, বরং একটি গভীর মানসিক শান্তি অর্জনের গল্প বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।



