প্রতীকী ছবি: হুইলচেয়ার ব্যবহার করেন, এমন একজন মানুষ পরিবারের সঙ্গে রেস্তোরাঁয় যেতে চান। কিন্তু রেস্তোরাঁর প্রবেশমুখে কয়েক ধাপ সিঁড়ি। ভেতরে ঢোকার ব্যবস্থা নেই। কোনোভাবে ভেতরে নেওয়া গেলেও ব্যবহারযোগ্য টয়লেট নেই। নগরের অনেক রেস্তোরাঁ, আবাসিক হোটেল ও ক্যাফেতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য এটা এখনো স্বাভাবিক দৃশ্য।
এই বাস্তবতা বদলাতে এবার সিটি করপোরেশন এলাকায় থাকা রেস্তোরাঁ, আবাসিক হোটেল ও ক্যাফেতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য আলাদা র্যাম্প ও টয়লেট স্থাপন বাধ্যতামূলক করতে যাচ্ছে সরকার। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এসব ব্যবস্থা না করলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্স বাতিল অথবা নবায়ন বন্ধ রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা
স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে ১৪ মে দেশের সব সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের এ বিষয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, ১৩ মে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার সুরক্ষা ও সেবা নিশ্চিতকরণ-সংক্রান্ত সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দেন, সিটি করপোরেশন এলাকায় থাকা রেস্তোরাঁ, আবাসিক হোটেল ও ক্যাফেগুলোতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য আলাদা র্যাম্প নির্মাণ ও টয়লেট স্থাপন যৌক্তিক সময়ের মধ্যে নিশ্চিত করতে হবে।
ট্রেড লাইসেন্স বাতিলের নির্দেশনা
চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, যেসব রেস্তোরাঁ, আবাসিক হোটেল ও ক্যাফে এই নির্দেশনা পালনে ব্যর্থ হবে, তাদের ট্রেড লাইসেন্স বাতিল অথবা নবায়ন বন্ধ রাখা হবে। এ বিষয়ে পরবর্তী প্রয়োজনীয় কার্যক্রম নিতে সিটি করপোরেশনগুলোকে অনুরোধ করা হয়েছে।
প্রতিবন্ধী জনসংখ্যার পরিসংখ্যান
বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংখ্যা কম নয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জাতীয় প্রতিবন্ধী ব্যক্তি জরিপ ২০২১ অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যার ২ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো ধরনের প্রতিবন্ধিতার সঙ্গে বসবাস করেন। এই হিসাবে দেশে প্রতিবন্ধী মানুষের সংখ্যা প্রায় ৪৬ লাখ। জরিপে দেখা যায়, শহরাঞ্চলেও প্রতিবন্ধী মানুষের হার ২ দশমিক ৪৫ শতাংশ। অর্থাৎ নগরের রেস্তোরাঁ, ক্যাফে, হোটেল বা সেবাকেন্দ্রে তাঁদের প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করা কোনো দয়া বা বিশেষ সুবিধা নয়, এটি নাগরিক অধিকারের অংশ।
আইনি ও বিধিগত ভিত্তি
সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চলাচলের সুবিধার্থে র্যাম্প স্থাপন বাধ্যতামূলক করতে আইন প্রণয়নের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টেও রিট হয়। এরপর এ বিষয়ে রুল দেন হাইকোর্ট। রুলে ভবন নির্মাণ বিধিমালা, ২০০৮ এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩ অনুসারে প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করার বিষয়টি উঠে আসে।
প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩-এর ৩৪ ধারায় গণস্থাপনায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করার কথা বলা আছে। আইনে গণস্থাপনায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চলাচল, আরোহন, ব্যবহার ও সেবা গ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। শুধু আইন নয়, ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রেও প্রতিবন্ধীবান্ধব ব্যবস্থা রাখার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোডে ভবনের নিরাপত্তা, ব্যবহারযোগ্যতা ও সবার জন্য প্রবেশগম্যতার বিষয়টি বিবেচনার কথা বলা হয়েছে। বিশেষ করে গণব্যবহার্য ভবনে র্যাম্প, চলাচলের পথ ও ব্যবহারযোগ্য টয়লেটের মতো বিষয়গুলো প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমান পরিস্থিতি ও চ্যালেঞ্জ
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ঢাকা ও অন্য বড় শহরে অনেক রেস্তোরাঁ ও ক্যাফে ভবনের দোতলা বা তিনতলায়। কোথাও প্রবেশপথ সরু, কোথাও সিঁড়িই একমাত্র ভরসা। অনেক আবাসিক হোটেলেও হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীদের ওঠানামার মতো ব্যবস্থা নেই। ফলে একজন প্রতিবন্ধী মানুষকে বাইরে খেতে যাওয়া, অতিথি হয়ে থাকা বা সামাজিক আয়োজনে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রেও বাধার মুখে পড়তে হয়।
প্রতিবন্ধী অধিকার নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিদের মতে, প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করা মানে শুধু একটি র্যাম্প বানানো নয়। র্যাম্পটি ব্যবহারযোগ্য কি না, ঢাল কতটা, দরজা যথেষ্ট প্রশস্ত কি না, টয়লেটে হুইলচেয়ার ঘোরানোর জায়গা আছে কি না—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় নিয়ম মানার নামে এমন র্যাম্প করা হয়, যা বাস্তবে ব্যবহার করা যায় না।
কার্যকর পদক্ষেপ
সরকারের নতুন নির্দেশনা কার্যকর হলে সিটি করপোরেশনগুলোকে ট্রেড লাইসেন্স দেওয়া ও নবায়নের সময় বিষয়টি যাচাই করতে হবে। এতে নতুন রেস্তোরাঁ, ক্যাফে ও আবাসিক হোটেলগুলো শুরু থেকেই প্রতিবন্ধীবান্ধব অবকাঠামো তৈরিতে বাধ্য হবে। পুরোনো প্রতিষ্ঠানগুলোকেও ধাপে ধাপে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে হবে।
স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য
স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘নগরের সেবা সবার জন্য। একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি যদি রেস্তোরাঁ, হোটেল বা ক্যাফেতে স্বাভাবিকভাবে প্রবেশ করতে না পারেন, সেটি শুধু অবকাঠামোগত ঘাটতি নয়, এটি নাগরিক অধিকারের প্রশ্ন। সিটি করপোরেশনগুলোকে বলা হয়েছে, লাইসেন্স দেওয়া ও নবায়নের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধীবান্ধব ব্যবস্থা গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে।’



