সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী আপিল: আংশিক শ্রুত হিসেবে গণ্য হবে না
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ একটি গুরুত্বপূর্ণ আদেশ দিয়েছে, যেখানে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে করা পৃথক আপিল আংশিক শ্রুত হিসেবে গণ্য হবে না। প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আপিল বিভাগ রোববার এই আদেশ জারি করেন। ফলে, এই আপিলগুলোর ওপর নতুন করে একটি নতুন বেঞ্চে সুবিধাজনক সময়ে শুনানি হবে বলে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা জানিয়েছেন।
আপিল শুনানির পটভূমি ও বর্তমান অবস্থা
গত বছরের ৩ ডিসেম্বর থেকে আপিলগুলোর শুনানি শুরু হয় এবং ধারাবাহিকভাবে ৪, ৭, ৮ ও ১০ ডিসেম্বর শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। সর্বশেষ, গত বছরের ১১ ডিসেম্বর, তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন ছয় সদস্যের আপিল বিভাগ শুনানি চলতি বছরের ৫ মার্চ পর্যন্ত মুলতবি করেন। এরপর, পৃথক তিনটি আপিল আদেশের জন্য আপিল বিভাগের রোববারের কার্যতালিকায় ৫ থেকে ৭ নম্বর ক্রমিক পর্যন্ত অন্তর্ভুক্ত হয়।
আপিলকারী ও আইনজীবীদের অবস্থান
পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে মোট তিনটি আপিল করা হয়েছে। সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারসহ চার ব্যক্তি একটি আপিল করেন, নওগাঁর বাসিন্দা মো. মোফাজ্জল হোসেন আরেকটি আপিল করেন এবং জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার তৃতীয় আপিলটি করেন। আদালতে, সুজন সম্পাদকসহ চার ব্যক্তির পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শরীফ ভূইঁয়া ও আইনজীবী কারিশমা জাহান উপস্থিত ছিলেন। জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেলের পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির এবং রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেলের দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আরশাদুর রউফ ও অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক উপস্থিত ছিলেন।
আইনজীবীদের বক্তব্য ও ভবিষ্যৎ শুনানি
সুজন সম্পাদকসহ চার ব্যক্তির জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শরীফ ভূইঁয়া প্রথম আলোকে বলেন, 'আপিলগুলো তৎকালীন প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন ছয় সদস্যের আপিল বিভাগ শুনেছেন। বিষয়টি আংশিক শ্রুত হিসেবে ছিল। কিন্তু যে বেঞ্চ শুনেছেন, তা এখন বিদ্যমান নেই। তৎকালীন প্রধান বিচারপতিসহ দুজন বিচারপতি অবসরে গেছেন। যেহেতু সেই বেঞ্চ বিদ্যমান নেই, তাই নতুন করে নতুন বেঞ্চে শুনানি হবে। আদালত বলেছেন, আপিলগুলো আংশিক শ্রুত হিসেবে বিবেচিত হবে না। সুবিধাজনক সময়ে আপিলগুলো শুনানির জন্য কার্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত হবে।'
পঞ্চদশ সংশোধনীর ইতিহাস ও হাইকোর্টের রায়
২০১১ সালের ৩০ জুন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলোপসহ বেশ কিছু বিষয়ে পরিবর্তন এনে পঞ্চদশ সংশোধনী আইন জাতীয় সংসদে পাস হয়। এই সংশোধনীতে সংবিধানে মোট ৫৪টি ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা হয়েছিল। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর, পঞ্চদশ সংশোধনীর পুরো আইন ও আইনের কয়েকটি ধারার বৈধতা নিয়ে গত বছর হাইকোর্টে আলাদা দুটি রিট হয়। সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদকসহ পাঁচ ব্যক্তি একটি এবং নওগাঁর বাসিন্দা মো. মোফাজ্জল হোসেন আরেকটি রিট করেন। চূড়ান্ত শুনানি শেষে গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর হাইকোর্ট রায় দেন, যেখানে পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের কয়েকটি বিধান সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও বাতিল ঘোষণা করা হয়।
আপিল প্রক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা
হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে, রিট আবেদনকারীরা পৃথক লিভ টু আপিল করেন। আপিল বিভাগ গত বছরের ১৩ নভেম্বর লিভ মঞ্জুর করে আদেশ দেন, যা হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে পৃথক তিনটি আপিল করার পথ প্রশস্ত করে। এখন, নতুন আদেশ অনুযায়ী, এই আপিলগুলো আংশিক শ্রুত হিসেবে গণ্য হবে না এবং একটি নতুন বেঞ্চে ভবিষ্যতে শুনানি হবে, যা বাংলাদেশের সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।



