নরসিংদীর রায়পুরার নিলক্ষা ইউনিয়নে দুই পক্ষের দফায় দফায় সংঘর্ষে গুলি করে হত্যার পর নদীতে ফেলে দেওয়া আরেক যুবকের লাশ ভেসে উঠেছে। বুধবার বেলা তিনটার দিকে সদর উপজেলার মাধবদী থানার চরদীঘলদী ইউনিয়নে জিৎরামপুর এলাকায় তাঁর লাশ পাড়ে এসে ঠেকে। সন্ধ্যা সাতটার দিকে মাধবদী থানার উপপরিদর্শক আবদুল বারেক ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশটি উদ্ধার করেন।
নিহতের পরিচয়
লাশ উদ্ধার হওয়া যুবকের নাম কাউসার আহমেদ (৩৭)। রায়পুরার নিলক্ষা ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডে বীরগাঁও গ্রামের পূর্বপাড়া এলাকার শাহ আলমের ছেলে তিনি। তিন মাস আগে সৌদি আরব থেকে দেশে ফেরেন তিনি।
সংঘর্ষের বিবরণ
গতকাল মঙ্গলবার ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত রায়পুরা উপজেলার নিলক্ষা ইউনিয়নের হরিপুর ও দড়িগাঁও এলাকায় নাজিম উদ্দিন ও আলাল মুন্সির পক্ষের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। দেশীয় অস্ত্র, টেঁটা ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে দুই পক্ষের এই সংঘর্ষ চলে টানা কয়েক ঘণ্টা। ভাঙচুর আর অগ্নিসংযোগ করা হয় কয়েকটি বাড়িঘরে। এ ঘটনায় মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন অনিক (২২) নামের একজন তরুণ। এ ছাড়া এলাকার বেশ কয়েকজন তরুণ-যুবক এখনো নিখোঁজ। আজ সন্ধ্যায় লাশ উদ্ধার হওয়া কাওসার আহমেদও নিখোঁজ ছিলেন। তিনি আলাল মুন্সির সমর্থক ছিলেন।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, বুধবার বেলা তিনটার দিকে জিৎরামপুর ঘাট এলাকায় একজনের লাশ ভেসে এসে তীরে আটকে যায়। স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি ঘটনাটি মাধবদী থানায় জানান। খবর পেয়ে উপপরিদর্শক আবদুল বারেক ঘটনাস্থলে গিয়ে ওই ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করেন। এর আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাশ ভেসে থাকার খবর পেয়ে স্বজনেরা সেখানে গিয়ে লাশ শনাক্ত করেন।
যেহেতু রায়পুরা থানার নিলক্ষার সংঘর্ষে ওই ব্যক্তি নিহত হয়েছেন তাই তাঁর লাশ রায়পুরা থানা–পুলিশে হস্তান্তর করা হয়। রায়পুরা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) প্রবীর কুমার ঘোষ বলেন, ‘রায়পুরার নিলক্ষা থেকে ভেসে যাওয়া কাওসার নামের একজনের লাশ মাধবদীর জিৎরামপুর থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। গতকালের ওই সংঘর্ষের ঘটনায় আরও কয়েকজনের মৃত্যুর খবর শোনা যাচ্ছে। যতক্ষণ পর্যন্ত না তাদের লাশ উদ্ধার হয়, আমরা অফিশিয়ালি কিছু বলতে পারছি না।’
স্ত্রীর বক্তব্য
নিহত কাওসারের স্ত্রী সুরভী আক্তার বিকেলে প্রথম আলোকে জানান, গতকালের সংঘর্ষে সকাল সাড়ে আটটার দিকে কাওসারের ওপর হামলা চালানো হয়। ওই সময় তাঁর পায়ে দুটি গুলি করা হয় এবং টেঁটা দিয়ে শরীরে আঘাত করা হয়। তিনি কোনো রকমে দৌড়ে নদীতে লাফিয়ে প্রায় ওপারে চলে গিয়েছিলেন। পরে প্রতিপক্ষের লোকেরা নৌকায় করে তাঁকে ধরে এনে আবার গুলি করে হত্যা করে। পরে তাঁর লাশ আবার নদীতে ফেলে দেওয়া হয়।
সুরভী আক্তার বলেন, ‘গতকাল এবং আজ সারা দিন নৌকায় করে নদীতে তাঁর লাশ খুঁজেছি আমরা। পরে বেলা তিনটায় জানতে পারি তাঁর লাশ মাধবদীর চরদীঘলদীর জিৎরামপুরে ভেসে ওঠে। পরে সেখানে গিয়ে আমরা তাঁর লাশ শনাক্ত করি।’
পুলিশ ও প্রশাসনের তথ্য
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, পূর্ববিরোধের জেরে দীর্ঘদিন ধরেই আলাল মুন্সির সমর্থকেরা এলাকার বাইরে ছিলেন। মঙ্গলবার ভোরে তাঁরা স্পিডবোটে ভাড়াটে অস্ত্রধারীদের নিয়ে নিলক্ষায় প্রবেশ করে নাজিম উদ্দিনের সমর্থকদের ওপর অতর্কিত হামলা চালান। এরপরই দেশীয় অস্ত্র ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। সংঘর্ষ চলে ভোর ৬টা থেকে শুরু হয়ে সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত।
জানতে চাইলে রায়পুরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাসুদ রানা বলেন, গতকালের ওই সংঘর্ষে পর থেকে বুলবুল, লতিফসহ ৮ থেকে ১০ জন এখনো নিখোঁজ। আশঙ্কা করা হচ্ছে, তাঁদেরও হত্যা করা হয়েছে। লাশ উদ্ধার হওয়ার আগেই তো আমরা কিছু বলতে পারি না।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরও বলেন, এক সপ্তাহ ধরে উপজেলা প্রশাসনের লোকজন নিলক্ষার দ্বন্দ্ব নিরসনে কাজ করছিলেন। গত পরশু রাতে স্থানীয় সংসদ সদস্য লোকসহ ১৩-১৪ জন নিলক্ষায় গিয়ে উভয় পক্ষের সঙ্গে কথা বলেছেন। কথা হয়েছিল শুক্রবার বসে বিষয়টির মীমাংসা হবে। এর মধ্যেই ঘটনা ঘটে গেছে। শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হয়ে গেছে।



