কুশিয়ারা নদীর ভাঙনে জকিগঞ্জের অস্তিত্ব হুমকির মুখে
সিলেটের সীমান্তবর্তী জকিগঞ্জ উপজেলা কুশিয়ারা নদীর ভয়াবহ ভাঙনের কবলে পড়েছে। নদীর তীব্র স্রোত ও ভাঙনে উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম, জনপদ, হাটবাজার, মাদ্রাসা, স্কুল, মসজিদ, দোকানপাট, কৃষিজমি, সড়ক, পুকুর, বৃক্ষরাজি ও বাঁশবাগানসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংসের মুখোমুখি। এলাকার শত শত মানুষ এখন দিশেহারা হয়ে পড়েছেন, তাদের বসতভিটা ও জীবিকা নির্বাহের উপায় ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে।
সংসদ সদস্যের হুঁশিয়ারি: ভূখণ্ডের মানচিত্র বদলে যাচ্ছে
সিলেট-৫ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আবুল হাসান গত সপ্তাহে জাতীয় সংসদে বিষয়টি উত্থাপন করে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন, 'জকিগঞ্জের নদী ভাঙন আমাদের ভূখণ্ডের মানচিত্র বদলে দিচ্ছে। অন্যান্য স্থানে নদী ভাঙনে একদিকে ভাঙে, অন্যদিক ভরাট হয়। কিন্তু এখানে ভাঙন শুধু জকিগঞ্জের দিকেই হচ্ছে।' তিনি জোর দিয়ে বলেন, পুরোপুরি বর্ষা নামার আগেই ভাঙন ঠেকানো জরুরি, নয়তো জানমালের ব্যাপক ক্ষতি হবে।
ভারতীয় গ্রোয়েনের প্রভাব: বাংলাদেশের ভূখণ্ড ভারতের দিকে সরে যাচ্ছে
জকিগঞ্জের নদীভাঙনের পেছনে একটি বড় কারণ হলো ভারতের করিমগঞ্জ জেলা রক্ষায় নদীতীরে নির্মিত শক্ত গ্রোয়েন। ১৯৭১ সালের দিকে ভারত করিমগঞ্জ সুরক্ষার জন্য কুশিয়ারা নদীর তীরে গ্রোয়েন নির্মাণ করে, যার ফলে করিমগঞ্জ এলাকা সুরক্ষিত হলেও নদীর সীমানা ক্রমশ বাংলাদেশের দিকে সরে আসছে। এতে জকিগঞ্জের বিশাল ভূখণ্ড এখন ভারতের করিমগঞ্জ জেলার অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়েছে।
জকিগঞ্জের বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষ সতর্ক করে বলেন, 'এখুনি উচ্চ পর্যায়ে উদ্যোগ না নিলে একসময় পুরো জকিগঞ্জ ভারত সীমানার অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে।' তারা নদীর অন্য তীরের চর দেখিয়ে বলেন, 'সেখানে আমাদের বাপ-দাদার কৃষিজমি, ভিটামাটি, নারিকেল ও সুপারি বাগান ছিল। নদীভাঙনে সেগুলো এখন আরেক দেশের হয়ে গেছে।'
ভাঙনের বিস্তারিত চিত্র: ১৯ স্থানে ৮ হাজার ২২০ মিটার ক্ষতি
সূত্রমতে, জকিগঞ্জের আমলসীদ, গদাধর, জামডহর, হাইদ্রাবন্ধ, বারোজনি, পিলালাকান্দি, লালগ্রাম, সেনাপতির চক, কুনাগ্রাম, মানিকপুর, ছবরিয়া, লোহার মহল, সুপ্রাকান্দি, পরচকসহ মোট ১৯ স্থানে ৮ হাজার ২২০ মিটার নদীভাঙন ঘটেছে। এসব স্থানে মেরামতের জন্য ৯৬৬.২৭ লাখ টাকার প্রয়োজন।
কুনাগ্রামের বাসিন্দা আব্দুল্লাহ (৪৭) বলেন, 'আমরা বড়ই অসহায়। নদীর ভাঙন আমার বাড়ির পুকুর পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। গ্রামের পাশের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধটিও ক্ষয়ে নিচু হয়ে গেছে। কখন যে পুরো গ্রামই চলে যায়, কে জানে।' তিনি মিনতি করে বলেন, 'আমাদের গ্রাম, বসতভিটা রক্ষা করুন।'
পানি উন্নয়ন বোর্ডের উদ্বেগ: বন্যার আগে মেরামত জরুরি
পানি উন্নয়ন বোর্ডের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী কাইসার আলম এলাকা পরিদর্শন করে বলেন, দীর্ঘ ২৪ বছর আগে নির্মিত 'আপার সুরমা-কুশিয়ারা প্রকল্প' প্রতি বছর বন্যার আগে ও পরে মেরামত করতে হয়। ক্ষতিগ্রস্ত বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ মেরামত করা না হলে ২০২৬ সালের বন্যায় ব্যাপক এলাকায় নদীভাঙন ও প্লাবনের সম্ভাবনা রয়েছে।
জকিগঞ্জে কুশিয়ারা নদীর ডান তীরে ৪১ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের বিভিন্ন স্থান ভেঙে পড়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সেকশন অফিসার মো. মাহফুজুর রহমান ভূইয়া বলেন, কোথাও বাঁধ জমির সঙ্গে মিশে গেছে, তাই বাঁধ উঁচু করাও প্রয়োজন।
বরাদ্দ সংকট: বারবার আবেদনেও সাড়া মেলেনি
ভাঙন ঠেকাতে বারবার বরাদ্দ চেয়েও পাওয়া যায়নি। ২০২২, ২০২৪ ও ২০২৫ সালের ঢলে সিলেট অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হয়। ২০২৫ সালে বন্যাপরবর্তী সময়ে মেরামত খাতে পর্যাপ্ত টাকা পাওয়া যায়নি। তখন ১০টি স্থানে ৪.৩৬০ কিলোমিটার মেরামতের জন্য ৩৪৯.১০ লাখ টাকা জরুরিভাবে চাওয়া হয়, তাও বরাদ্দ আসেনি।
পরে সিলেট-৫ আসনের তৎকালীন সংসদ সদস্যের মৌখিক নির্দেশনায় ১৫টি স্থানের ভাঙন ঠেকাতে ৮২৩.২৪ লাখ টাকা চেয়ে পুনরায় নোটিশ পাঠানো হয় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বরাবর, কিন্তু কোনো বরাদ্দ আসেনি। চলতি মৌসুমে এই অরক্ষিত এলাকায় ভয়াবহ বন্যার আশঙ্কায় এলাকাবাসী ও পানি উন্নয়ন বোর্ড উভয়েই শঙ্কিত।
ভৌগোলিক প্রেক্ষাপট: বরাক নদের প্রবাহ ও চর জাগার প্রভাব
কুশিয়ারার ডান তীরে জকিগঞ্জ ও বাম তীরে ভারতের করিমগঞ্জ জেলা অবস্থিত। জকিগঞ্জের অমলসীদ পয়েন্টে বরাক নদ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে এক ভাগ সোজা নেমে গেছে কুশিয়ারায়, অন্য ভাগ 'ইউ টার্ন' নিয়ে সুরমা নাম ধারণ করেছে। বর্ষায় বরাক নদের ৭০ ভাগ পানি জকিগঞ্জ হয়ে কুশিয়ারায় আর ৩০ ভাগ পানি সুরমায় প্রবাহিত হয়।
হেমন্তে কুশিয়ারা প্রবহমান থাকলেও সুরমা কানাইঘাটের উজানে শুকিয়ে যায়। অমলসীদের নিকট নেমে আসা বরাক-সুরমা-কুশিয়ারার তিন মোহনায় বিশাল চর জেগেছে, যার কারণে শুষ্ক মৌসুমে সুরমা ও কুশিয়ারাসহ ভাটির দিকে পানির সংকট তীব্র হয়ে ওঠে।
বিএসএফের বাধা: নদীতীরে কাজ করতে গেলেই সমস্যা
ভারতের করিমগঞ্জ এলাকায় কুশিয়ারার তীরে বিশাল এলাকা জুড়ে বিএসএফ নদীতীরে চৌকি বসিয়েছে। জকিগঞ্জের ভাঙনকবলিত এলাকাবাসী জানান, নদীর তীরে ডাইক বা প্রতিরক্ষা কাজ করতে গেলেই বিএসএফ বাধা দেয়, যা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক বলে তারা মনে করেন। এই বাধার কারণে ভাঙন রোধে কার্যকরী ব্যবস্থা নেওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়ছে।



