ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার দৌরাত্ম্যে রাজপথে বাড়ছে দুর্ঘটনা ও যানজট
রাজধানীর অলিগলি থেকে বেরিয়ে এখন প্রধান সড়কেও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। এলাকাভিত্তিক সড়কে চলাচলের অনুমতি থাকলেও এসব রিকশা নির্ভয়ে ও বেপরোয়াভাবে চলছে ব্যস্ততম রাজপথগুলোতে। এতে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার ঝুঁকি যেমন বাড়ছে, তেমনি তীব্র হচ্ছে যানজটের সমস্যা। নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে এই যানবাহনের অবাধ চলাচল নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ক্রমাগত বাড়ছে। প্রশ্ন উঠছে— এই বিশৃঙ্খলার লাগাম টানবে কে, আর কবে কার্যকর হবে আইনি নিয়ন্ত্রণ?
সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ছে অটোরিকশা, বাড়ছে নিরাপত্তা ঝুঁকি
কেবল ঢাকা নয়, ব্যাটারিচালিত এই অটোরিকশা এখন ছড়িয়ে পড়েছে সারাদেশে। ফলে দেশজুড়েই দুর্ঘটনার সংখ্যা ও নিরাপত্তা ঝুঁকি উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। অটোরিকশার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয়ভাবে তৈরি নসিমন, করিমন, ভটভটি, মাহিন্দ্রা ও টমটমের অবাধ চলাচল সড়ক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। এদিকে রাজধানীর সড়কে অটোরিকশার দৌরাত্ম্য কমাতে বিগত অন্তর্বর্তী সরকার কিছু বিকল্প পরিকল্পনা নিয়েছিল। এর অংশ হিসেবে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) অনুমোদিত নতুন মডেলের ব্যাটারি-রিকশা নামানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। একই সঙ্গে চালকদের প্রশিক্ষণের পরিকল্পনাও হাতে নেওয়া হয়েছিল। তবে মাঠপর্যায়ে এর কোনও দৃশ্যমান প্রভাব এখনও লক্ষ্য করা যায়নি।
দুর্ঘটনার ভয়াবহ চিত্র: রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদন
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত মার্চ মাসে দেশে ৫৭৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৫৩২ জন নিহত এবং ২ হাজার ২২১ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ৬৬ জন নারী ও ৯৮ জন শিশু। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই প্রাণহানির মধ্যে ১১৭ জনই মারা গেছেন অটোরিকশা ও সমজাতীয় যানবাহনের কারণে। দুর্ঘটনায় সম্পৃক্ত যানবাহনের পরিসংখ্যানে দেখা যায় ট্রাক-কাভার্ডভ্যান-পিকআপসহ ভারী যান— ২৪ দশমিক ৬০ শতাংশ। মোটরসাইকেল— ২৪ দশমিক ২০ শতাংশ। থ্রি-হুইলার (ইজিবাইক-সিএনজি-অটোরিকশা-লেগুনা)— ১৯ দশমিক ৮৪ শতাংশ। যাত্রীবাহী বাস— ১৩ দশমিক ১৯ শতাংশ। স্থানীয়ভাবে তৈরি যান (নসিমন-ভটভটি-টমটম)— ৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ।
নিহতের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মোটরসাইকেল চালক ও আরোহী ২০৪ জন (৩৮.৩৪%), বাসের যাত্রী ৪৫ জন (৮.৪৫%), ট্রাক-পিকআপ-ট্রাক্টর আরোহী ২৮ জন (৫.২৬%), প্রাইভেটকার-মাইক্রোবাস আরোহী ৪৬ জন (৮.৬৪%), থ্রি-হুইলার যাত্রী (ইজিবাইক-সিএনজি-অটোরিকশা-অটোভ্যান-লেগুনা) ৯৪ জন (১৭.৬৬%), স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহনের যাত্রী (নসিমন-পাখিভ্যান-ভটভটি-টমটম-মাহিন্দ্র) ২৩ জন (৪.৩২%) এবং বাইসাইকেল আরোহী ১৩ জন (২.৪৪%) নিহত হয়েছেন। এছাড়া রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রকাশিত আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়, এবারের ঈদুল ফিতরের আগে-পরে ১৫ দিনে (১৪ মার্চ থেকে ২৮ মার্চ এপ্রিল) দেশে ৩৭৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৯৮ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে শুধু থ্রি-হুইলারে (ইজিবাইক- সিএনজি-অটোরিকশা-অটোভ্যান) ২২ দশমিক ৩৩ শতাংশ এবং স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহনে (নসিমন-ভটভটি-মাহিন্দ্র-টমটম) ৬ দশমিক ৭৯ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটে। যার মধ্যে থ্রি-হুইলারে ৫০ জন যাত্রী অর্থাৎ ১৬ দশমিক ৭৭ শতাংশ এবং স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহনে ৯ জন যাত্রী অর্থাৎ ৩ দশমিক ০২ শতাংশ নিহত হয়েছেন।
ক্ষুব্ধ নগরবাসী: অভিযোগের পাহাড় ও নিরাপত্তা উদ্বেগ
অটোরিকশার দৌরাত্ম্যে অতিষ্ঠ রাজধানীর বাসিন্দারা কেবল সড়ক নিরাপত্তা নয়, এদের চার্জ দেওয়ার পদ্ধতি নিয়েও অভিযোগ তুলেছেন। বিশেষ করে জনাকীর্ণ স্থানে বা রাস্তার পাশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়ে চার্জ দেওয়ার ফলে বড় ধরনের অগ্নিদুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন তারা। মোটরসাইকেল চালক কাওসার হোসেন বলেন, “আগের প্যাডেল রিকশাই ভালো ছিল। চালকরা জানতেন তাদের গতি কতটুকু এবং নিয়ন্ত্রণ কীভাবে করতে হয়। এখনকার অটোরিকশা চালকদের গতি বা ব্রেক সম্পর্কে কোনও ধারণাই নেই। তারা শুধু দ্রুত যেতে চায়, কোনও নিয়ম মানে না। ছোট-বড় সব রাস্তায় এদের কারণে বাইক চালানো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।”
সারোয়ার হোসেন নামের এক মোটরসাইকেল যাত্রী বলেন, “এই রিকশাগুলোর ডিজাইন অত্যন্ত বিপজ্জনক। লোহার কাঠামো দিয়ে তৈরি এসব যান মানুষের গায়ে বা অন্য গাড়িতে লাগলে ব্যাপক ক্ষতি হয়, অথচ রিকশার কিছুই হয় না।” অপর এক বাসিন্দা মাহফুজুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “অটোরিকশা দ্রুত বন্ধ করা উচিত। এরা রাস্তায় যে বিশৃঙ্খলা তৈরি করে, তাতে প্যাডেল রিকশাই অনেক নিরাপদ ছিল।” মিরপুরের বাসিন্দা কামরুল ইসলাম অভিযোগ করেন এদের চার্জ দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে। তিনি বলেন, “রাস্তার পাশে মেইন লাইন থেকে অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ সংযোগ নিয়ে এরা চার্জ দেয়। বৃষ্টির মধ্যেও এমন খোলা লাইনে চার্জ দিতে দেখেছি, যা যেকোনও সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটাতে পারে।”
দায়িত্বশীলদের বক্তব্য: নিয়ন্ত্রণ ও সমাধানের প্রচেষ্টা
একসময় সরকার ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা বন্ধের সিদ্ধান্ত নিলেও আন্দোলনের মুখে তা শিথিল করা হয়। শর্ত ছিল এগুলো কেবল গলির রাস্তায় চলবে, মূল সড়কে উঠবে না। কিন্তু বাস্তবে হাইওয়েতেও এদের দাপট দেখা যাচ্ছে। এ বিষয়ে ‘ব্যাটারি রিকশা-ভ্যান ও ইজিবাইক সংগ্রাম পরিষদ’-এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক খালেকুজ্জামান লিপন বলেন, “এটি নিয়ন্ত্রণের জন্য দ্রুত সরকারি নীতিমালা দরকার। লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া চালু করলে তাদের নির্দিষ্ট বিধিনিষেধের আওতায় আনা সম্ভব হবে। এখন বৈধতা নেই বলেই নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। আমরাও চাই তারা মূল সড়কে না উঠুক, তবে সরকারকেই ফিডার রোড বা সার্ভিস রোড নিশ্চিত করতে হবে।”
সংকটের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “কোনটা প্রধান সড়ক, সেটাই স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হয়নি। ফলে ফিডার রোডগুলোতেও তারা চলাচল করছে। যদি শুরুতেই একটা সিস্টেমের মধ্যে আনা যেতো, তাহলে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হতো। এখন যেভাবে উৎপাদন হচ্ছে এবং রাস্তায় নামছে— কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই, প্রশাসনিক নজরদারি নেই। যে যেভাবে পারছে, চলছে।” সিটি করপোরেশন থেকে যে চালকদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, সেটার কোনও অগ্রগতি আছে কিনা এবং কাউকে কি প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “না, এখন পর্যন্ত নতুন কোনও অগ্রগতি নেই। আর প্রশিক্ষণের বিষয়ে আমাদের কাছে এমন কোনও রিপোর্ট নেই। তখন যেটুকু হয়েছিল, সেটুকুই হয়েছে।”
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) এক কর্মকর্তা জানান, বিষয়টি নিয়ে ট্রাফিক বিভাগ ও সিটি করপোরেশন যৌথভাবে কাজ করছে। তিনি আরও বলেন, “বুয়েট ডিজাইনকৃত ই-রিকশা প্রকল্পের কাজ চলছে। ৫টি প্রতিষ্ঠানের ফ্যাক্টরি ভিজিট শেষ করে রিপোর্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। মন্ত্রণালয় অনুমোদন দিলে নির্ধারণ করা হবে কতগুলো রিকশা কোন এলাকায় চলবে।” চালকদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের বিষয়ে এই কর্মকর্তা জানান, প্রায় ২০ হাজার চালককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। গত অর্থবছরের শেষদিকে অর্থ বরাদ্দ পাওয়ায় সীমিত সময়ে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হয় এবং পরে অব্যবহৃত অর্থ মন্ত্রণালয়ে ফেরত দেওয়া হয়। ভবিষ্যতে নতুন করে অর্থ বরাদ্দ পেলে আবার প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালু হতে পারে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান বলেন, “আমরা প্রতিনিয়ত এগুলো নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছি। শতভাগ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন কারণ পর্যাপ্ত ফিডার রোড নেই। যদি আমরা একেবারে শতভাগ ছেড়ে দিতাম, তাহলে রাস্তায় ওঠাই যেতো না। এখন যেটা আপনারা দেখেন, সেটা মোট সংখ্যার মধ্যে সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশ। তবুও আমরা নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছি ও জরিমানা করছি। দুর্ঘটনার হার কমাতে আমরা সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করছি এবং আশা করছি দ্রুতই এর সমাধান আসবে।”
নিজেদের সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, “আমরা ধীরে ধীরে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছি। যেমন— বড় বড় দোকানের অবৈধ এক্সটেনশন অপসারণ করেছি। আগে যেখানে কখনও অভিযান হয়নি, সেখানে আমরা ২৪৮টির বেশি অবৈধ কাউন্টার বন্ধ করেছি। এখন কল্যাণপুর এলাকাতেও অভিযান চলছে, তালা লাগানো হচ্ছে। তবে আমাদের সক্ষমতার সীমা আছে। সবকিছু একদিনে করা সম্ভব না।”



