প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেছেন, সীমান্তে আর নতজানু হবে না বাংলাদেশ। তিনি বলেন, ‘এ বাংলাদেশ আর সেই বাংলাদেশ নেই। বাংলাদেশের মানুষ ও সরকার কাঁটাতারের বেড়ার ভয় পায় না। বাংলাদেশেরও সীমান্ত নিয়ে পরিকল্পনা রয়েছে।’
আজ সোমবার বিকেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেন হুমায়ুন কবির। পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসা বিজেপি সরকার বাংলাদেশের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের জন্য ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী–বিএসএফকে ৪৫ দিনের মধ্যে জমি বুঝিয়ে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। আজ পশ্চিমবঙ্গের হাওড়ায় রাজ্য সচিবালয়ে নতুন সরকারের মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকের পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এ ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, ‘৪৫ দিনের মধ্যে বিএসএফের কাছে প্রয়োজনীয় জমি বুঝিয়ে দেওয়া হবে। এ জন্য মুখ্য সচিব এবং ভূমি ও রাজস্বসচিবকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।’
বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকারের এ সিদ্ধান্তের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেন, ‘কিছু চ্যালেঞ্জের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নিতে চাইলে দুই দেশের নেতৃত্বের অবশ্যই ইতিবাচক মনোভাব দরকার। অবশ্যই দুই দেশের সম্পর্কে চ্যালেঞ্জ রয়েছে, কিছু রয়েছে কঠিন। তবে যতক্ষণ আলোচনার দরজা খোলা রয়েছে, ততক্ষণ তা সমাধানের সুযোগ রয়েছে। কিছু ইস্যু রয়েছে তা দ্রুত সমাধান হতে পারে, আর কিছু ইস্যু সময় লাগতে পারে। পশ্চিমবঙ্গে যে সরকার গঠন হয়েছে, তারা নির্বাচনে উগ্র ও অশোভন ভাষায় বক্তৃতা করেছে।’
অনেক সময় নির্বাচনে জয়ের জন্য এ ধরনের ভাষা ব্যবহার করা হয় উল্লেখ করে হুমায়ুন কবির বলেন, ‘তবে একটি সরকার পরিচালনা করা ভিন্ন বিষয়। দেখি, তাদের একটু সময় দেই, নির্বাচনের বক্তৃতা ও সরকার পরিচালনা একই ধরনের হয় কি না।’
এ প্রসঙ্গে হুমায়ুন কবির বলেন, বাংলাদেশের সম্পর্ক ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে। তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ঢাকা হস্তক্ষেপ করবে না।
কাঁটাতার দিয়ে বাংলাদেশের মতো দেশকে ভয় দেখানোর মতো কোনো জায়গা নেই উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর এ উপদেষ্টা বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ কাঁটাতারের ভয় পায় না। বাংলাদেশের সরকারও কাঁটাতারের ভয় পায় না। যেখানে কথা বলার দরকার সেখানে ঢাকা কথা বলবে।’
মানুষে মানুষে সম্পর্ক বাড়াতে হলে ভারতকেও সীমান্তে নিরাপত্তার ক্ষেত্রে মানবিকতা দেখাতে হবে বলে মন্তব্য করেন হুমায়ুন কবির। তিনি বলেন, ‘শেখ হাসিনার সময়ে সীমান্তে আমরা যে রকম দেখেছি, ওই নমুনায় সীমান্ত আর কোনো দিন আসবে না। ওই নমুনায় কেউ যদি সীমান্তে কিছু করতেও চায়, এই বাংলাদেশ আর সেই বাংলাদেশ নেই যে বসে দেখবে। বাংলাদেশেরও পরিকল্পনা রয়েছে, কী করতে হবে। আশা করি, ভারত ওই পথে যাবে না।’
প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা বলেন, প্রতিবেশী দেশগুলোকে অবশ্যই আঞ্চলিক শান্তি বজায় রাখতে হবে। আমরা আন্তরিক পরিবেশে থাকতে চাই। সম্পর্কে চ্যালেঞ্জ অবশ্যই থাকবে। দেড় হাজার মানুষকে হত্যা করে পালিয়ে যাওয়া এক সন্ত্রাসী শেখ হাসিনা এখন ভারতে রয়েছেন। মনে রাখতে হবে ভারতে থেকে বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করতে না দেওয়াই ভালো। তাঁকে (শেখ হাসিনা) যাতে সে সুযোগ না দেওয়া হয়। আশা করি এবং ভারতের সরকার আশ্বস্ত করেছে, শেখ হাসিনাকে এ সুযোগটি তারা দেবে না।
তিস্তা প্রকল্পে ভারত ও চীন নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান জানতে চাইলে হুমায়ুন কবির বলেন, ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) সরকার গঠন করেছে। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার সব সময় বলে আসত পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের কারণে তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি সই করা যায়নি। এখন তৃণমূল কংগ্রেস পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় নেই। আর কেন্দ্রে ও রাজ্যে বিজেপি সরকার। আমরা আশা করছি, এখন এ বিষয়ে আলোচনা এগিয়ে নিতে কম প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হওয়ার কথা।
বাংলাদেশ ও চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক নিয়ে জানতে চাইলে হুমায়ুন কবির বলেন, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ঐতিহাসিক। আর এ সম্পর্কের সূচনা করেছিলেন সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। এটি নতুন সরকারের পক্ষ থেকে প্রথম বেইজিং সফর। চীন বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় অংশীদার। এ সম্পর্ককে আরও জোরদার করব। নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার। চীনও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী।
বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কী ধরনের সহায়তা চাওয়া হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা সম্পর্কের সব বিষয়েও আলোচনা করেছি। বিস্তারিত না হলেও তিস্তা ইস্যুতে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে, চীনের এক্সিম ব্যাংক এতে অর্থায়ন করবে।’
তিস্তা প্রকল্পের কাজ কবে থেকে শুরু হবে জানতে চাইলে উপদেষ্টা বলেন, বর্তমানে সমীক্ষার প্রতিবেদন সুপারিশে নিতে হবে। আরও আলোচনা বাকি রয়েছে। বিস্তারিত আলোচনার জন্য আরও সময় লাগবে।
প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর ও সফরের সময় তিস্তা চুক্তি সইয়ের সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফর এখনো চূড়ান্ত হয়নি, কোথায় প্রথম যাবেন, কবে যাবেন, যখন চূড়ান্ত হবে, তখন জানানো হবে। চীন গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে অবশ্যই প্রধানমন্ত্রী বেইজিং সফর করবেন। ভবিষ্যতে আলোচনার মাধ্যমে সুবিধাজনক সময়ে সফর চূড়ান্ত করা হবে।



