চট্টগ্রাম নগরীর বায়েজিদ বোস্তামি থানাধীন রৌফাবাদ কলোনির সরু গলিতে এখনও আতঙ্কের ছাপ। এই গলিতেই হঠাৎ গোলাগুলিতে বদলে গেছে ১১ বছরের শিশু রেশমি আক্তারের জীবন। চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ুয়া হাসি-খুশিতে ভরা প্রাণচঞ্চল মেয়েটি এখন চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের আইসিইউতে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে।
ঘটনার বিবরণ
বৃহস্পতিবার (৭ মে) রাতে ঘর থেকে দোকানে যাওয়ার পথে দুর্বৃত্তদের গুলির মুখে পড়ে যায় রেশমি। একটি গুলি তার চোখের নিচ দিয়ে ঢুকে মাথার ভেতরে আটকে যায়। একই ঘটনায় নিহত হন হাসান ওরফে রাজু (৩২) নামে এক যুবক। রাজু রাউজান উপজেলার কদলপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা। ওই উপজেলায় সম্প্রতি নাসির নামে এক ব্যক্তি নিহতের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় তাকেও আসামি করা হয়। এরপর থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে বায়েজিদে বোনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিল রাজু।
রেশমির পরিচয়
রেশমি আক্তার রৌফাবাদ কলোনির দরিদ্র প্রতিবন্ধী সবজি বিক্রেতা রিয়াজ আহমেদ প্রকাশ গুড্ডুর মেয়ে। তার দুই ছেলে ও তিন মেয়ের মধ্যে সবার ছোট রেশমি। স্থানীয় ব্যারিস্টার মিল্কি মেমোরিয়াল স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী সে।
চিকিৎসা অবস্থা
চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীন জানান, গুলিবিদ্ধ শিশু রেশমির অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। তাকে আইসিইউতে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। পরিবার সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার রাতে রেশমির মা তাকে পাশের দোকানে জিনিস কিনতে পাঠান। দোকান থেকে ফেরার সময় হঠাৎ কলোনির গলিতে গোলাগুলি শুরু হয়। আতঙ্কিত মানুষ ছুটোছুটি শুরু করলে গুলির সামনে পড়ে যায় রেশমি। মুহূর্তেই একটি গুলি এসে লাগে রেশমির চোখের নিচে। গুলিবিদ্ধ রেশমি হঠাৎ মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।
স্থানীয়রা দ্রুত তাকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। প্রথমে ২৮ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসা দেওয়া হলেও অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকরা আইসিইউ সাপোর্টের কথা জানান। কিন্তু তখন চমেকে আইসিইউ বেড খালি না থাকায় পরিবারের সদস্যরা গভীর রাতে তাকে নগরীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যান।
পরিবারের দুর্ভোগ
রেশমির বড় ভাই ফয়সাল আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘চিকিৎসকরা বলেছিলেন, আইসিইউ ছাড়া বাঁচানো কঠিন। তাই রাত ১২টার দিকে তাকে বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাই। সেখানে শুক্রবার বিকাল পর্যন্ত আইসিইউতে ছিল। পরে চমেকে বেড খালি হলে আবার এখানে নিয়ে আসি। কেননা বেসরকারি হাসপাতালে এত টাকা ব্যয় করার মতো আমাদের সামর্থ্য নেই।’
তিনি জানান, বেসরকারি হাসপাতালে একদিনের চিকিৎসায় বিল আসে ৪৫ হাজার ১৬ টাকা। পরিবারের পক্ষে সেই টাকা জোগাড় করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। পরে জেলা প্রশাসকের সহায়তায় ২৫ হাজার টাকা পাওয়া যায়। বাকি টাকা আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে ধার করে পরিশোধ করতে হয়েছে।
শিশুটির বাবা রিয়াজ আহমেদ প্রকাশ গুড্ডু বলেন, ‘আমি কলোনির মুখে শাকসবজি বিক্রি করি। কোনোভাবে সংসার চলে। মেয়েটাকে তার মা দোকানে পাঠিয়েছিল। ফেরার পথে গুলির মধ্যে পড়ে যায়। ডাক্তার বলছে, গুলি চোখ দিয়ে ঢুকে মাথার ভেতরে আটকে গেছে।’
কথা বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। বলেন, ‘আমার দুই ছেলে, তিন মেয়ে। রেশমি সবার ছোট। খুব আদরের মেয়ে। লেখাপড়ায়ও ভালো ছিল। তাকে নিয়ে আমাদের অনেক স্বপ্ন ছিল। সবই শেষ।’
হাসপাতালের আইসিইউর সামনে দাঁড়িয়ে বড় ভাই ফয়সাল আহমেদের চোখে শুধু আতঙ্ক আর অসহায়ত্ব। তিনি বলেন, ‘আমার চঞ্চল বোনটার কোনও নড়াচড়া নাই। মাথার একপাশে ব্যান্ডেজ। ঠিকমতো শ্বাসও নিতে পারছে না। আমরা ওর দিকে তাকাতে পারছি না। ডাক্তাররা শনিবার সকালে বোর্ড বসিয়েছিলেন। তারা বলছেন, অবস্থা খুব খারাপ।’
প্রশাসনের পদক্ষেপ
এদিকে, গুলিবিদ্ধ রেশমি আক্তারকে শুক্রবার (৮ মে) চমেক হাসপাতালের আইসিইউ বেডে দেখতে যান চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম। এ সময় তিনি রেশমির চিকিৎসার খোঁজ-খবর নেন। তাকে চিকিৎসকরা জানান, শিশুটির অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন। গুলিটি চোখের ভেতর দিয়ে ঢুকে মস্তিস্কে মারাত্মক ক্ষতি করেছে। জেলাপ্রশাসক চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার অনুরোধ জানান।
পরে জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘একজন শিশুর এভাবে সন্ত্রাসের শিকার হওয়া অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। এই ঘটনা মানবিকভাবে আমাদের সবাইকে নাড়া দিয়েছে। কোনও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডকেই ছাড় দেওয়া হবে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘ঘটনার খবর পাওয়ার পর থেকে আমি নিয়মিত খোঁজখবর নিচ্ছি। এটি অবশ্যই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির একটি ঘটনা। বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও পুলিশ সুপারের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কাজ করছে। যারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে, তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার জন্য আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করছি।’
উল্লেখ্য, বায়েজিদ থানাধীন রৌফাবাদের বাঁশবাড়িয়া বিহারি কলোনিতে বোনের বাসায় বেড়াতে এসে দুর্বৃত্তদের গুলিতে বৃহস্পতিবার রাতে নিহত হন রাউজানের বাসিন্দা হাসান রাজু। একই ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয় শিশু রেশমি আক্তার।



