নরসিংদীতে মর্মান্তিক রেল দুর্ঘটনা
ঈদের নতুন জামাকাপড় কিনে আর নিজের ঘরে ফেরা হলো না অবুঝ শিশু সাফওয়ান হাসেন ও তার মায়ের। বুধবার (২৭ মে) সন্ধ্যায় নরসিংদী রেলস্টেশনে ঢাকাগামী দ্রুতগতির একটি ট্রেনের ধাক্কায় এক হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারিয়েছেন মা ও ছেলে। পবিত্র ঈদুল আজহার ঠিক আগের মুহূর্তে এই আকস্মিক মৃত্যুতে পুরো এলাকায় নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।
নিহতদের পরিচয়
এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় নিহতরা হলেন—নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার কারারচর এলাকার দিনমজুর সুজন মিয়ার স্ত্রী সাথী বেগম (২৭) এবং তার মাত্র ১৮ মাস বয়সী শিশুপুত্র সাফওয়ান ওরফে হাসেন।
ঘটনার বিবরণ
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, শিবপুর উপজেলার কারারচর এলাকার বাসিন্দা সুজন মিয়া অত্যন্ত কষ্ট করে জীবিকা নির্বাহ করেন। কখনো ইজিবাইক চালিয়ে আবার কখনো রাজমিস্ত্রির সহযোগী হিসেবে কাজ করে সংসার টানতেন তিনি। পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে বুধবার বিকেলে দুই সন্তান ও স্ত্রীকে সাথে নিয়ে ঈদের কেনাকাটা করতে নরসিংদী শহরে এসেছিলেন সুজন মিয়া। সন্তানদের জন্য পছন্দের নতুন পোশাক কিনে আনন্দ মনেই তারা রেললাইন ধরে বাড়ির উদ্দেশ্যে ফিরছিলেন। কিন্তু রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্ম এলাকা অতিক্রম করার সময় কক্সবাজার থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী দ্রুতগতির ‘কক্সবাজার এক্সপ্রেস’ ট্রেনটি তাদের ধাক্কা দিলে মুহূর্তের মধ্যে ছিটকে পড়েন মা ও ছেলে।
প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা
দুর্ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সুজন মিয়া অশ্রুসিক্ত চোখে ও ভাঙা কণ্ঠে বলেন, চোখের পলকে নিজের অবুঝ সন্তান ও স্ত্রীকে চোখের সামনে শেষ হয়ে যেতে দেখেছেন তিনি। ট্রেনটি লাইনে চলে আসছে দেখে তিনি স্ত্রীকে সতর্ক করার জন্য চিৎকার করেছিলেন এবং টেনে ধরারও চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু শেষ রক্ষা আর হয়নি। ঈদের আগের দিন এখন তিনি কাকে নিয়ে বাঁচবেন—এমন বুকফাটা আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠেছে চারপাশ।
হাসপাতালে মৃত্যু ঘোষণা
দুর্ঘটনার পরপরই সুজন মিয়া স্থানীয়দের সহায়তায় স্ত্রী ও সন্তানকে উদ্ধার করে দ্রুত নরসিংদী জেলা হাসপাতালে নিয়ে যান। তবে সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে তাদের দুজনকেই মৃত ঘোষণা করেন। হাসপাতালে এই খবর পৌঁছানোর পর স্বজনদের কান্নায় বাতাস ভারী হয়ে ওঠে।
পুলিশের বক্তব্য
নরসিংদী রেলওয়ে পুলিশ ঘটনার বিবরণ দিয়ে জানিয়েছে, দুর্ঘটনার সময় প্ল্যাটফর্মের এক নম্বর লাইনে একটি লোকাল ট্রেন দাঁড়িয়ে ছিল। ঠিক ওই মুহূর্তেই কক্সবাজার থেকে ঢাকাগামী আন্তঃনগর কক্সবাজার এক্সপ্রেস ট্রেনটি দ্রুত গতিতে স্টেশন অতিক্রম করছিল। দাঁড়ানো ট্রেনের কারণে হয়তো সুজন মিয়ার পরিবার অন্য লাইনের ট্রেনের গতিবিধি ঠিকমতো বুঝতে পারেননি। লাইনের ওপর অবস্থান করার কারণে দ্রুতগতির ট্রেনটি তাদের ধাক্কা দিয়ে ছিটকে ফেলে এবং ঘটনাস্থলেই মা ও ছেলের মৃত্যু ঘটে। এই বিষয়ে নিহতের পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পরিবারের অন্যান্য সদস্য
উল্লেখ্য, সুজন মিয়া ও সাথী বেগম দম্পতির ৯ বছর বয়সী সামিয়া নামের আরও একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। দুর্ঘটনার সময় সে-ও পরিবারের সাথে একসাথেই হাঁটছিল। তবে অত্যন্ত অলৌকিক ও কাকতালীয়ভাবে এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা থেকে অক্ষত অবস্থায় বেঁচে যায় শিশু সামিয়া। চোখের সামনে মা ও ভাইকে হারিয়ে সে এখন স্তব্ধ।



