রাজধানীর বিভিন্ন পাসপোর্ট অফিসে দালালচক্রের দৌরাত্ম্যে সাধারণ সেবাপ্রত্যাশীদের ভোগান্তি চরম আকার ধারণ করেছে। দালাল ছাড়া সরাসরি আবেদন জমা দিতে গেলে কর্মকর্তারা নানা অযৌক্তিক প্রশ্ন করেন এবং সামান্য ভুল বা তথ্যের গরমিল পেলেই আবেদনপত্র ফিরিয়ে দেন। অথচ দালালের মাধ্যমে গেলে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানোর ভোগান্তি ছাড়াই মুহূর্তের মধ্যে সব কাজ সম্পন্ন হয়ে যায়।
যাত্রাবাড়ী পাসপোর্ট অফিস
১২ মে বেলা ১১টায় যাত্রাবাড়ী পাসপোর্ট অফিসের মূল গেটের দুপাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন ৭-৮ জন যুবক। ভেতরে ঢুকতেই তারা পেছন থেকে প্রশ্ন ছুড়েন: কী কাজে এসেছেন? জবাব শোনার অপেক্ষায় না থেকে কয়েকজন পাল্লা দিয়ে অফিসের ভেতরে ঢুকে পড়েন। কর্মকর্তারা দাবি করেন, এরা দালাল নয়, বরং আশপাশের কম্পিউটারের দোকানের মালিক যারা ফরম পূরণের বিনিময়ে অল্প টাকা নেন। তবে সেবাপ্রত্যাশীদের অভিযোগ, এখানে ভোগান্তি সীমাহীন। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ফরম জমা দিতে হয়, ছবি তোলার লাইন আরও দীর্ঘ, এমনকি পাসপোর্ট ডেলিভারি নিতেও সিরিয়াল করতে হয়। কিন্তু আশপাশের কম্পিউটার ও ফটোকপির দোকানে গেলে সব মুশকিল আসান হয়ে যায়—একটি ওয়ান স্টপ সার্ভিস মেলে, যেখানে দালালচক্রের সদস্যরা যে কোনো সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান দেন।
একাধিক সেবাগ্রহীতা অভিযোগ করেন, দালাল ছাড়া আবেদনপত্র জমা দিতে গেলে কর্মকর্তারা নানা প্রশ্নে বিরক্ত করেন। আবেদনপত্র দফায় দফায় সংশোধন করেও তাদের মনঃপূত হয় না। ফলে ভোগান্তি এড়াতে অনেকেই দালালের দ্বারস্থ হন। সরেজমিনে দেখা যায়, অফিসের প্রধান ফটকসহ ভেতরের বিভিন্ন জায়গায় দালালদের অবাধ বিচরণ। তারা ফরম পূরণ ও ছবি তোলা থেকে শুরু করে সব কাজ করে দেওয়ার আশ্বাস দিচ্ছেন। যুগান্তরের প্রতিবেদক সেবাগ্রহীতা পরিচয়ে কথা বললে এক দালাল সাধারণ সমস্যা সমাধানে সরকারি ফি’র বাইরে ২ থেকে ৫ হাজার টাকা বাড়তি দাবি করেন। তবে বয়স পরিবর্তন, নতুন এনআইডি অনুসারে পাসপোর্ট করাসহ বড় ভুলের জন্য ৫০ হাজার থেকে লাখ টাকা নেওয়া হয় বলে জানান তিনি।
শ্যামপুরের এক বাসিন্দার আবেদন জমা না নিয়ে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। পরে অফিসের মূল গেটের সামনেই তিনি দালালকে দুই হাজার টাকা দেন। এরপর ফের অফিসের ভেতরে গিয়ে লাইনে দাঁড়ান এবং এবার তিনি সফল হন—আবেদন জমা দিয়ে হাসিমুখে বেরিয়ে আসেন। পঞ্চম তলায় এক নারী অভিযোগ করেন, ছোট ভাইয়ের পাসপোর্ট করতে এসে তিনি কর্মকর্তাদের অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছেন। এক কর্মকর্তা তাকে ব্যক্তিগত প্রশ্ন করেন, যেমন: আপনি বিবাহিত কিনা, আপনার বড় বোনের বিয়ে হয়েছে কিনা ইত্যাদি।
দালালচক্রের দৌরাত্ম্য প্রসঙ্গে যাত্রাবাড়ী পাসপোর্ট অফিসের সহকারী পরিচালক অরূপ রতন চাকী দাবি করেন, অফিস চত্বরে দালালদের দৌরাত্ম্য নেই। তবে বাইরের বিষয়ে তাদের কোনো এখতিয়ার নেই—এটি প্রশাসনের বিষয়।
উত্তরা পাসপোর্ট অফিস
১৩ মে সকালে উত্তরা পাসপোর্ট অফিসে ঢুকতেই হালিম নামে এক দালাল এগিয়ে এসে খাতির জমানোর চেষ্টা করেন। তিনি আগ বাড়িয়ে সহায়তার প্রস্তাব দেন এবং জানান, পাসপোর্ট করতে চাইলে তিনি কম খরচে সব ব্যবস্থা করে দেবেন। অতিরিক্ত কোনো কাগজপত্র লাগলেও তিনিই সব ম্যানেজ করবেন। পরিচয় গোপন রেখে পাসপোর্ট করার কথা জানালে তিনি দরদাম শুরু করেন। একটি সাধারণ আবেদনের জন্য তিনি ৮ হাজার টাকা দাবি করেন, যাতে কোনো সিরিয়াল লাগবে না, তাৎক্ষণিকভাবে আবেদন জমা দেওয়ার পরপরই ফিঙ্গার প্রিন্ট দেওয়া যাবে এবং মাত্র আধা ঘণ্টার মধ্যে সব প্রক্রিয়া শেষ হবে। চাইলে নির্ধারিত সময়ের আগেই কাঙ্ক্ষিত পাসপোর্ট হাতে পাওয়া যাবে, তবে সেক্ষেত্রে অতিরিক্ত চার্জ দিতে হবে।
এক দালালের কাছে নামের ভুল সংক্রান্ত একটি সমস্যা উপস্থাপন করা হলে তিনি সহজেই সমাধানের আশ্বাস দেন। একপর্যায়ে খোদ পাসপোর্ট অফিসের এক কর্মকর্তার সঙ্গে ফোনে কথা বলিয়ে দেন তিনি। এরপর নিয়ে যান পাসপোর্ট অফিসের পেছনের সড়কে ‘সুমন এন্টারপ্রাইজ’ নামে একটি কম্পিউটার ও ফটোকপির দোকানে। সেখানে আগে থেকেই অবস্থান করা সুমন নামের আরেক দালাল বলেন, এত কম টাকায় আর কেউ সমস্যার সমাধান দিতে পারবে না।
সেবাপ্রত্যাশীরা বলছেন, আবেদনকারীদের দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। দালালের মাধ্যমে না গিয়ে সরাসরি গেলে ভোগান্তির মাত্রা কয়েকগুণ বাড়ে। লাইনে অপেক্ষমাণ সিরাজুল ইসলাম নামে এক ভুক্তভোগী যুগান্তরকে বলেন, একবার বিদ্যুৎ বিলের কপি নেই বলে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। পরে বিলের কপি জমা দেওয়ার পর তারা বলে, মূল কপি দেখাতে হবে। এভাবে নানা অজুহাতে হয়রানি করা হয়। রিয়াদ ইবনে জাবেদ নামে আরেকজন জানান, বিভিন্ন কাগজপত্র চেয়ে তাকেও কয়েকবার ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এরপর ফিঙ্গার প্রিন্ট দিতে গিয়ে তিনি জানতে পারেন, অধিকাংশ লোক দালালকে অতিরিক্ত টাকা দিয়ে বিনা হয়রানিতে পাসপোর্ট করাচ্ছেন।
আফতাবনগর পাসপোর্ট অফিস
আফতাবনগর পাসপোর্ট অফিসে ঢুকতেই দালালদের হাঁকডাক শোনা যায়। সমস্যার ধরন অনুযায়ী তারা ভিন্ন ভিন্ন রেট দিচ্ছেন। যেমন: নামের বানান সংশোধনে ৩ হাজার টাকা, ঠিকানা ভুল ঠিক করতে আড়াই হাজার টাকা। এক্ষেত্রে বিদ্যুৎ বা পানির বিলের মূল কাগজ না থাকলেও কোনো সমস্যা নেই—শুধু দিতে হবে আরও দুই হাজার টাকা। এছাড়া মাত্র দুই হাজার টাকায় লাইনে না দাঁড়িয়েই আবেদন জমা দেওয়া যাবে।
১৩ মে সরেজমিনে দেখা যায়, অফিস চত্বরে ঘোরাফেরা করছেন দালালচক্রের ১০-১৫ জন। তারা সেবাপ্রার্থীদের সঙ্গে দেনদরবার চালিয়ে যাচ্ছেন। কাউকে নিয়ে যাচ্ছেন পাশের কম্পিউটারের দোকানে। সেখানে দরকষাকষি চূড়ান্ত হলে সংশ্লিষ্ট ফাইল নিয়ে দালালচক্রের সদস্য সোজা অফিসে ঢুকে পড়েন। পরিচয় গোপন রেখে পাসপোর্ট আবেদনে ঠিকানা ভুল হয়েছে উল্লেখ করে এক দালালের সহায়তা চাইলে তিনি সমস্যার সমাধানের আশ্বাস দেন। বলেন, কাগজপত্র দেন, কোথায় কী সমস্যা, সেটা আগে দেখতে হবে। এরপর বলতে পারব কত টাকা লাগবে।
পাসপোর্টপ্রত্যাশীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নামের বানান ও ঠিকানা সংশোধনে ভোগান্তি সবচেয়ে বেশি। সেক্ষেত্রে বাধ্য হয়ে অনেকেই দালালচক্রের দ্বারস্থ হন। রুবেল নামের এক যুবক যুগান্তরকে বলেন, কয়েকদিন আগে তার ভাইয়ের পাসপোর্ট করেছেন, কিন্তু তাতে বাবার নামে ভুল হয়েছে। পাসপোর্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কয়েক দফা যোগাযোগ করেও সমাধান মেলেনি। শেষে দালাল ধরে নতুন পাসপোর্ট করতে হয়েছে।
এ বিষয়ে আফতাবনগর পাসপোর্ট অফিসের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ তাজ বিল্লাহ যুগান্তরকে বলেন, পুরো এলাকা সিসি ক্যামেরায় নজরদারিতে আছে। কোনো ধরনের অনিয়ম পেলেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়।



