হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন অবরোধের হুমকিতে ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তায় গভীর সংকট
পারস্য উপসাগরের কৌশলগত জলপথ হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অবরোধের হুমকি দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম অর্থনীতি ভারতের জন্য মারাত্মক জ্বালানি সংকটের পূর্বাভাস দিচ্ছে। ইতিমধ্যে ইরানের নিয়ন্ত্রণে থাকা এই প্রণালিতে চলাচল সীমিত হওয়ায় ভারতের তেল ও গ্যাস আমদানি ব্যাহত হচ্ছে, আর মার্কিন হস্তক্ষেপ এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
ইরানের নিয়ন্ত্রণ ও মার্কিন হুমকির পটভূমি
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলা শুরুর পর থেকেই হরমুজ প্রণালির ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে তেহরান। বিশ্বব্যাপী তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবহন করা হয় এই জলপথ দিয়ে, যা বর্তমানে অচলপ্রায় অবস্থায় রয়েছে। যদিও ইরান নিজস্ব জাহাজ চলাচল চালু রেখেছে এবং কিছু বিদেশি জাহাজকে সীমিতভাবে অনুমতি দিচ্ছে, তবুও সামগ্রিক নৌ-চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
গত শনিবার পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত স্থায়ী যুদ্ধবিরতি আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর মার্কিন সামরিক বাহিনী ঘোষণা করেছে যে তারা সোমবার থেকে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের বন্দরগুলোতে প্রবেশ ও প্রস্থানকারী সমস্ত নৌ-চলাচলের ওপর পূর্ণ অবরোধ আরোপ করবে। এই হুমকির প্রতিক্রিয়ায় ইরান পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের বন্দরগুলো নিয়ে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে, যা আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ভারতের জন্য জ্বালানি নিরাপত্তার মারাত্মক ঝুঁকি
১৪০ কোটি জনসংখ্যার দেশ ভারত তার জ্বালানি চাহিদার সিংহভাগ মেটায় মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাস আমদানির মাধ্যমে। হরমুজ প্রণালি এই সরবরাহ শৃঙ্খলের কেন্দ্রীয় ধমনী হিসেবে কাজ করে। এই পথে যে কোনো বিঘ্ন ভারতের জন্য তীব্র জ্বালানি সংকট সৃষ্টি করতে পারে এবং দেশটির দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতিকে স্থবির করে দিতে পারে।
ইরান কর্তৃক হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধের পর ভারত ছিল সেই অল্প কয়েকটি দেশের মধ্যে একটি, যাদের বিশেষ নিরাপদ যাতায়াতের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। ভারত সরকারের বিবৃতি অনুযায়ী, গত শনিবার পর্যন্ত ভারতীয় পতাকাবাহী ৯টি জাহাজ এই প্রণালি নিরাপদে অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অবরোধ হুমকি কার্যকর হলে এই সামান্য সুযোগটুকুও বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব
গ্যাসের মজুদ ফুরিয়ে আসায় ভারত সরকার বাণিজ্যিক খাতের পরিবর্তে সাধারণ পরিবারগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে বাধ্য হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে অনেক রেস্তোরাঁ বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফা ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে।
অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানির ক্রমবর্ধমান দাম কোটি কোটি ভারতীয় নাগরিকের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে, বিশেষ করে নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রাকে চরম সংকটে ফেলেছে। মুম্বাই ও দিল্লির মতো মহানগরীতে অনেক অভিবাসী শ্রমিক খাদ্য ও রান্নার গ্যাসের সিলিন্ডারের ক্রমবর্ধমান মূল্য মেটাতে না পেরে নিজ গ্রামে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছেন।
কূটনৈতিক জটিলতা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
ভারত সরকার এই প্রণালি দিয়ে যাতায়াতের জন্য কোনো প্রকার অর্থ প্রদানের বিষয়টি অস্বীকার করেছে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সাম্প্রতিক হুমকি নয়াদিল্লি ও তেহরানের মধ্যকার কূটনৈতিক চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
বর্তমানে পারস্য উপসাগর থেকে বের হওয়ার অপেক্ষায় ভারতের এক ডজনেরও বেশি জাহাজ আটকে আছে। মার্কিন অবরোধ কার্যকর হলে এই জাহাজগুলো মাঝসমুদ্রে আটকা পড়ে যেতে পারে, যা ভারতকে এই ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের আরও গভীরে টেনে নিয়ে যাবে।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করে দিচ্ছেন যে হরমুজ প্রণালিতে চলমান এই সংকট শুধু ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তাকেই নয়, বরং সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকেও হুমকির মুখে ফেলেছে। এই পরিস্থিতিতে ভারত সরকার বিকল্প জ্বালানি সরবরাহের উৎস খুঁজতে জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বিবেচনা করছে।



