ফিলিস্তিনে রমজান: সংগ্রাম ও সম্প্রীতির এক অনন্য মিশেল
ফিলিস্তিনের রমজান মাস এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের চিত্র তুলে ধরে। একদিকে পবিত্র আল-আকসা মসজিদের মোহনীয় পরিবেশে তারাবি নামাজের আধ্যাত্মিকতা, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের অবরোধ ও সংঘাতের ছায়া। কিন্তু এই প্রতিকূলতার মধ্যেও ফিলিস্তিনিরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অন্ধকার জয় করতে চায়, যা রমজানের প্রকৃত চেতনাকে প্রতিফলিত করে।
খ্রিষ্টানদের ইফতার বিতরণ: সম্প্রীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত
রমজানে ফিলিস্তিনের বেথলেহেম শহরে এক অসাধারণ দৃশ্য দেখা যায়। মাগরিবের আজান হতে মাত্র কয়েক মিনিট আগে, শহরের ‘কবর হিলওয়াহ’ মোড়ে দাঁড়িয়ে একদল তরুণ গাড়ি থামিয়ে খেজুর, জল ও দই বিতরণ করে। এই তরুণরা লাতিন খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের ‘টেরাসান্টা স্কাউট’ দলের সদস্য। বেথলেহেমের এই মোড়টি জেরুসালেম ও হেবরন যাওয়ার প্রধান সংযোগস্থল, যেখানে ইসরায়েলি চেকপোস্টের কারণে অনেক মুসলিমের বাড়ি ফিরতে দেরি হয়। তাদের রোজা ভাঙার দায়িত্ব নেন এই খ্রিষ্টান তরুণেরা, যা সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
গাজায় মোমবাতির আলোয় ইফতার: বেদনার চিত্র
এই সময়ে গাজার চিত্র অনেক বেশি বেদনাদায়ক। বছরের পর বছর অবরোধ ও সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে গাজায় বিদ্যুৎ এখন এক বিলাসিতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গৃহিণীরা মোমবাতির সামান্য আলোয় সাহরি ও ইফতার প্রস্তুত করেন, এবং অনেক সময় অন্ধকারেই রাতের খাবার সারতে হয়। মোমবাতি ব্যবহারের ফলে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে, যা গাজার মানুষের জীবনকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।
ফিলিস্তিনি ঐতিহ্যের প্রতীক: মাকলুবা
ফিলিস্তিনের ইফতার টেবিলের মধ্যমণি হলো ‘মাকলুবা’। মাংস, ভাত ও ভাজা সবজি (বেগুন বা ফুলকপি) দিয়ে রান্না করা এই খাবারটি পরিবেশনের সময় পাত্রটি উল্টে দেওয়া হয়, কারণ আরবিতে ‘মাকলুবা’ শব্দের অর্থ উল্টানো। এটি ফিলিস্তিনি ঐতিহ্যের এক শক্তিশালী প্রতীক। এর সাথে থাকে ‘দাক্কা’ নামক টমেটো ও শসার সালাদ, আর পানীয় হিসেবে তেঁতুলের শরবত। মিষ্টি হিসেবে ‘কাতায়েফ’ ছাড়া ফিলিস্তিনিদের ইফতার যেন অপূর্ণই থেকে যায়।
জেরুসালেমের মমতা: ক্যানসার আক্রান্ত শিশুদের জন্য ইফতার
জেরুসালেমের ওয়াদি আল-জোজ এলাকায় অবস্থিত কাওয়াসমি পরিবারের বাড়িটি রমজানে এক বিশাল রান্নাঘরে পরিণত হয়। ‘বাইতুল আয়লা’ নামক এই উদ্যোগের মাধ্যমে প্রতিদিন অন্তত ৫০ জন ক্যানসার আক্রান্ত শিশু ও তাদের অভিভাবকদের জন্য পুষ্টিকর ইফতার তৈরি করা হয়। বিশেষ করে গাজা ও পশ্চিম তীর থেকে জেরুসালেমে চিকিৎসা নিতে আসা অসহায় পরিবারগুলো এখানে ঘরের স্বাদ পায়, যা মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
আকাশছোঁয়া দাম ও ক্ষুধার লাইন: অর্থনৈতিক সংকট
এ–বছর পশ্চিম তীরে ইফতারের খরচ ১১% বৃদ্ধি পেয়েছে, যেখানে জলপাই তেলের দাম লিটার প্রতি ৩০ শেকেল থেকে বেড়ে ৫৫ শেকেল হয়েছে। উত্তর গাজার জাবালিয়া ক্যাম্পে ক্ষুধার্ত মানুষের লাইন প্রতিদিন দীর্ঘ হচ্ছে। দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও অনেক সময় এক বাটি সুপ জুটছে না ভাগ্যে, এবং শুধু একটু পানি ও ‘জাতার’ (মশলা) দিয়ে ইফতার করতে হচ্ছে অনেক পরিবারকে।
ফিলিস্তিনে রমজান মাস শুধু ধর্মীয় আচার নয়, বরং সংগ্রাম, সম্প্রীতি ও ঐতিহ্যের এক অনন্য মিশেল, যা বিশ্বকে এক গভীর বার্তা দেয়।



