জামায়াত-এনসিপির স্থানীয় নির্বাচনে আসন সমঝোতা নিয়ে দরকষাকষি, তৃণমূলে নারাজি
জামায়াত-এনসিপির স্থানীয় নির্বাচনে আসন সমঝোতা নিয়ে দরকষাকষি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসন সমঝোতার পর এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরেও ভেতরে ভেতরে নতুন হিসাব-নিকাশে নেমেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। প্রকাশ্যে এককভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতির কথা বললেও, কয়েকটি সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে দুই দলের মধ্যে চলছে দরকষাকষি। তবে এক্ষেত্রে জামায়াতের তৃণমূল থেকে ‘নারাজি’ রয়েছে বলেও জানা গেছে। তাই শেষ পর্যন্ত স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ভোটের মাঠের এই জোট নিয়ে এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাতে পারছেন না সংশ্লিষ্টরা।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আসন সমঝোতা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপিসহ মোট ১১টি রাজনৈতিক দল আসন সমঝোতার ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করেছেন। দলগুলোর পক্ষ থেকে এটিকে কেবল ‘নির্বাচনী সমঝোতা’ হিসেবেই দাবি করা হয়েছে। তবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি সরকার গঠনের ৪ মাস পরও ১১ দল ঐক্যবদ্ধভাবে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছে।

বিশেষ করে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও সংস্কার এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের বিচারের দাবিতে এই জোটের একতা দৃশ্যমান। এমনকি ১১ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, এই দুটি বিষয় বাস্তবায়নের আগ পর্যন্ত তারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলন সংগ্রাম চালিয়ে যাবেন। এছাড়াও সরকারের ইতিবাচক কাজে সাধুবাদ এবং নেতিবাচক কাজের সমালোচনা করার কথাও জানানো হয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সম্ভাব্য সমঝোতা

আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও ১১ দলীয় ঐক্যজোট সমঝোতার ভিত্তিতে নির্বাচন করার আভাস পাওয়া গেছে। যদিও জামায়াত এবং এনসিপি পৃথকভাবে জানিয়েছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য স্বতন্ত্রভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছে দল দুটি। তবে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দুই দলের মধ্যে শেষ পর্যন্ত সমঝোতা হতে পারে। এজন্য ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) জন্য জামায়াত-এনসিপির মধ্যে দরকষাকষি চলছে।

দেশের আট সিটিতে জামায়াতের প্রাথমিক প্রার্থী চূড়ান্ত, এনসিপির পাঁচটিতে

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনসহ দেশের ১৩টি সিটি করপোরেশনের মধ্যে আটটিতে মেয়রপ্রার্থী প্রাথমিকভাবে চূড়ান্ত করেছে জামায়াত। অন্যদিকে ইতিমধ্যেই ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনসহ মোট পাঁচটি সিটিতে নিজেদের চূড়ান্ত প্রার্থী ঘোষণা করেছে এনসিপি।

জামায়াত সূত্রে জানা যায়, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে দলটির ঢাকা মহানগর উত্তরের আমির সেলিম উদ্দিন এবং ঢাকা দক্ষিণে ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েমকে মেয়র প্রার্থী হিসেবে প্রাথমিকভাবে চূড়ান্ত করা হয়েছে। অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও ঢাকা উত্তর সিটিতে দলটির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীবকে প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্তভাবে ঘোষণা করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপি।

প্রাথমিকভাবে চূড়ান্ত হওয়া জামায়াতের অন্য প্রার্থীরা হলেন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে নগর জামায়াতের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক কাউন্সিলর মুহাম্মদ শামসুজ্জামান হেলালী, গাজীপুরে তোকাত গাজী উসমান পাশা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সহকারী অধ্যাপক হাফিজুর রহমান, রংপুরে মহানগর শাখার আমির এ টি এম আজম খান, বরিশালে দলের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুয়াযযম হোসাইন হেলাল, খুলনায় কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও খুলনা মহানগরীর আমির মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান এবং নারায়ণগঞ্জে মহানগর শাখার আমির মোহাম্মদ আবদুল জব্বার।

অন্যদিকে সিলেট সিটিতে অ্যাডভোকেট আব্দুর রহমান আফজাল, রাজশাহীতে মোবাশ্বের আলী এবং কুমিল্লা সিটিতে জাতীয় যুবশক্তির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট তরিকুল ইসলামকে চূড়ান্তভাবে সিটি করপোরেশনের প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছে এনসিপি। দলীয় সূত্র জানায়, শিগগিরই বাকি সিটি করপোরেশনগুলোতে প্রার্থী ঘোষণা করবে এনসিপি।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে স্বতন্ত্রের চিন্তা, তবে সিটি করপোরেশনে সমঝোতা

স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিষয়ে এনসিপির শীর্ষ নেতারা জানান, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ১১ দলীয় ঐক্যের ব্যানারে অংশগ্রহণ করলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এককভাবে করার প্রস্তুতি নিয়েই কার্যক্রম এগোচ্ছে। তাদের মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সব জায়গায় প্রার্থী থাকলে নতুন দল হিসেবে একেবারেই তৃণমূল পর্যায়ে পর্যন্ত পৌঁছতে পারবেন তারা।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনী পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান সারজিস আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এনসিপি এককভাবে অংশগ্রহণের জন্য সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিচ্ছে। ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচন করলে যে সংখ্যক আসনে জয়ের সম্ভাবনা থাকতো, এককভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে সেই সংখ্যা কমে যেতে পারে। তারপরও দল নিজস্ব সাংগঠনিক শক্তির ওপর ভর করে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি অব্যাহত রেখেছে।’

১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ও জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সরকার তো স্থানীয় নির্বাচন দেওয়ার কথাই চিন্তা করছে না। তারা তাদের দলীয় লোকদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। আমরা বারবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনের কথা বলে আসছি, কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে এখনও সুস্পষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি।’

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জোটের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা এককভাবেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছি। জোট হবে কি হবে না সেসব পরের বিষয়। যেহেতু ১১ দলীয় জোটের মধ্যে একটা নির্বাচনী সমঝোতা আছে, স্থানীয় সরকারের দিন-তারিখ ঠিক হলে তখন এ নিয়ে কথা হবে।’

একই কথা জানান, এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুইয়াও। তিনি বলেন, ‘এনসিপি স্থানীয় সরকার নির্বাচন এককভাবে করার প্রস্তুতি নিয়ে এগোচ্ছে। শুধু এনসিপি নয়, ১১ দলীয় জোটের সব দলই সেটা করছে। সবাই দলগতভাবে যার যার শক্তি নিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন করবে।’

দক্ষিণ সিটি কোনোভাবেই ছাড়বে না এনসিপি, দ্বিধাদ্বন্দ্বে জামায়াত

এনসিপির একজন যুগ্ম আহ্বায়ক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা যদিও এককভাবে নির্বাচনের‌ প্রস্তুতি নিচ্ছি কিন্তু দিন শেষে আমাদের মধ্যে সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে সমঝোতার আলোচনা চলছে। ঢাকার দুই সিটি বিশেষ করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন আমাদের লাগবেই। সিটি নির্বাচনে সমঝোতার প্রথম ধাপ হবে দক্ষিণ সিটি। এছাড়া যেহেতু কুমিল্লায় আমাদের হাসনাত আব্দুল্লাহ আছে, সেক্ষেত্রে কুমিল্লা সিটিও আমাদের চাহিদার শীর্ষে থাকবে।’

এদিকে এনসিপিকে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আসন ছেড়ে দিতে নারাজ তৃণমূলের জামায়াত নেতাকর্মীরা। জামায়াতের একজন রোকন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জামায়াতের ঘাড়ে চেপে সংসদে গিয়েছে এনসিপির নেতারা। এবার জামায়াতের ঘাড়ে বসে নগরপিতা হওয়ার খায়েশ জমেছে তাদের। যদিও দেশের স্বার্থে ১১ দলীয় জোটের ঐক্যবদ্ধ থাকার ইঙ্গিত দিয়েছেন জামায়াতের শীর্ষ নেতারা।’

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জামায়াত কখনোই ক্ষমতার লোভে রাজনীতি করেনি। বরং সবসময় দেশ ও জাতির কল্যাণে কাজ করে গেছে। জামায়াতের নেতাকর্মীদের মাঝে ক্ষমতার লোভ নেই। তা আমাদের দলীয় কার্যক্রম দিয়ে আমরা বহুবার প্রমাণ করেছি। জাতীয় নির্বাচন পূর্ববর্তী সময়ে তো ১১ দল জোট হয়ে আসন সমঝোতার একটা পর্যায়ে গিয়েছে। এখন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কি করবে, এটার সিদ্ধান্ত দলীয়ভাবেই আসবে।’