আসিফ মাহমুদ: অন্তর্বর্তী সরকারে কিচেন কেবিনেট ছিল, আমি সদস্য ছিলাম না
আসিফ মাহমুদ: কিচেন কেবিনেট ছিল, আমি সদস্য নই

সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া বলেছেন, ওই সরকারে একটি 'কিচেন কেবিনেট' ছিল, তবে তিনি এর সদস্য ছিলেন না। আজ মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর বাংলামোটরে এনসিপির অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।

কিচেন কেবিনেটের অস্তিত্ব স্বীকার

সংবাদ সম্মেলনের শেষ পর্যায়ে একজন সাংবাদিক আসিফ মাহমুদের কাছে জানতে চান, তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের 'কিচেন কেবিনেটের' সদস্য ছিলেন কি না। জবাবে তিনি বলেন, 'কিচেন কেবিনেট ছিল। কিন্তু আমি সেটার সদস্য ছিলাম না।' উল্লেখ্য, রাষ্ট্র বা সরকার পরিচালনায় কিচেন কেবিনেট বলতে আনুষ্ঠানিক কোনো ফোরাম নেই। এই শব্দবন্ধ দিয়ে কোনো রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধানের কিছু বিশ্বস্ত সহকর্মীকে নিয়ে গঠিত একটি গোষ্ঠীকে বোঝায়, যাদের সঙ্গে তিনি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন ও সিদ্ধান্ত নেন।

সম্প্রতি সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেনের এক সাক্ষাৎকারের পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলকে দেওয়া ওই সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার পরিচালনায় সাত সদস্যের একটি কিচেন কেবিনেট সক্রিয় ছিল। গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো সেখান থেকেই আসত। প্রতি মঙ্গলবার যমুনায় (সাবেক প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন) বৈঠকে বসতেন তারা। এদের হস্তক্ষেপ ও মন্ত্রণালয়ের কাজে প্রভাব বিস্তারের কারণে তিনি তিনবার পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, কিন্তু সরকারের অস্বস্তির কথা ভেবে তা আর সম্ভব হয়নি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে বক্তব্য

সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সই করা বাণিজ্যচুক্তির বিষয়ে কেউ এনসিপির মতামত নেয়নি বলে মন্তব্য করেন আসিফ মাহমুদ। তিনি বলেন, 'আমরা মনে করি, এই চুক্তিটা বিএনপিই করেছে। কিন্তু সংসদ নির্বাচনের তিন দিন আগে তাদেরই বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে (খলিলুর রহমান) দিয়ে তারা এটা অন্তর্বর্তী সরকারের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছে। এখন একটা পলিটিক্যাল ব্লেম গেম চলছে।'

গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল জয় পায় বিএনপি। এর তিন দিন আগে ৯ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি সই করে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার। সেই চুক্তির নেপথ্যে সে সময়ের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা (বর্তমান বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী) খলিলুর রহমানের ভূমিকার বিষয়টি বেশ আলোচিত হয়।

এ বিষয়ে খলিলুর রহমান গত ৪ মার্চ সাংবাদিকদের বলেছিলেন, 'যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি আমাদের প্রধান দুটি দলের প্রধানের (বিএনপি-জামায়াতে ইসলামী) সঙ্গে নির্বাচনের আগেই কথা বলেছেন। তাঁরাও এতে সম্মতি দিয়েছিলেন। সুতরাং এমন নয় যে এটা আমরা অন্ধকারে করেছি।'

খলিলুর রহমানের ওই বক্তব্যের পর গত ৬ মার্চ সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান ফেসবুক পোস্টে লিখেন, 'বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সরকার কয়েকটি চুক্তি করেছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এ ধরনের কোনো চুক্তি নিয়ে আমাদের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা করা হয়নি।' এরপর ১৫ মে রংপুরে এক অনুষ্ঠানে তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যচুক্তির বিষয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কেউ জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে আলোচনা করেনি।

এবার চুক্তিটির বিষয়ে মুখ খুললেন জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের শরিক দল এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ। তিনি বলেন, 'যখন (৯ ফেব্রুয়ারি) যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি হয়, তখন আমি এনসিপির মুখপাত্র ছিলাম। ফলে চুক্তি সম্পর্কে আমার আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো কিছু জানা সম্ভব নয়।'

সাবেক এই উপদেষ্টা আরও বলেন, 'অনেকেই বলেন, বাণিজ্যচুক্তি সম্পর্কে সব দলকেই জানানো হয়েছে। আমি আমার দলের আহ্বায়কসহ সবার সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হয়েছি, চুক্তির বিষয়ে কেউ এনসিপির কনসার্ন নেয়নি। এটা আমি পরিষ্কারভাবে জানাচ্ছি।'

সরকারের উদ্দেশে এনসিপির মুখপাত্র বলেন, 'চুক্তিটি করেছেন বর্তমান বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। যদি অন্য কিছু হয়, তাহলে আপনারা এ চুক্তিটা পর্যালোচনা করুন, বাতিল করুন। চুক্তির যে যে অংশগুলো বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে, বাংলাদেশের স্বার্থ সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় আলোচনা চালান।'

সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আসিফ মাহমুদ বলেন, 'আপনারা বারবার অন্তর্বর্তী সরকার, এনসিপি, জামায়াত—এদের ওপর দায় দিতে চান। কিন্তু চুক্তি করেছে আপনার পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এ ব্লেম গেমের রাজনীতি, মানুষকে ভুলের মধ্যে রাখার চেষ্টা থেকে বের হয়ে আসতে হবে।'

ঈদুল আজহা ও বিসিবি প্রসঙ্গ

ঈদুল আজহা উপলক্ষে সারা দেশে বসা কোরবানির পশুর হাটের ইজারা নিয়েও কথা বলেন আসিফ মাহমুদ। তিনি বলেন, এবারের পবিত্র ঈদুল আজহায় দেশের প্রায় সব পশুর হাটের ইজারা বিএনপির লোকজন পেয়েছেন। এবার যাঁরা হাট পাননি, সেই নেতারাও বিভিন্ন জায়গায় পাড়ায় পাড়ায় হাট বসাচ্ছেন। হাসিল আদায় করছেন। মেট্রোস্টেশনের নিচেও হাটের বরাদ্দ হয়েছে বলে অভিযোগ করে তিনি বলেন, এই পুরো ব্যবস্থাটা বিএনপির স্থানীয় নেতা-কর্মীদের নিয়ন্ত্রণে হচ্ছে।

ঈদযাত্রায় অতিরিক্ত ভাড়া আদায়সহ অব্যবস্থাপনার কথাও উল্লেখ করেন এনসিপির মুখপাত্র।

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডে (বিসিবি) পরিবারতন্ত্রের প্রভাবের সমালোচনা করে সাবেক ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ বলেন, 'মনে হচ্ছে, আমরা একটা রাজতন্ত্রে বসবাস করছি। অথচ এর আগে বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের মুখে শোনা গিয়েছিল, তাঁরা ক্রীড়াক্ষেত্রকে দলীয়করণ করবেন না। তাঁরা আসলে সত্যি কথাই বলেছিলেন। তাঁরা দলীয়করণ নয়, পরিবারকরণ করেছেন। এখন সবাই ভয়ে চুপ করে আছে।'

সংবাদ সম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। এ সময় দলের যুগ্ম সদস্যসচিব আলাউদ্দীন মোহাম্মদ, এস এম সাইফ মোস্তাফিজ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।