পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত তথাকথিত ‘ভাইপো ট্যাক্স’ বন্ধে এবার কঠোর অবস্থান নিয়েছে নবগঠিত বিজেপি সরকার। লোকসভা নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, রাজ্যের মহাসড়কজুড়ে গড়ে ওঠা অবৈধ চাঁদাবাজি ও তোলাবাজি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অভিযান শুরুর নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন
গত এপ্রিলে নির্বাচনী প্রচারে ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ঘোষণা দিয়েছিলেন, বিজেপি সরকার ক্ষমতায় এলে পশ্চিমবঙ্গের মানুষকে ‘ভাইপো ট্যাক্স’ থেকে মুক্তি দেওয়া হবে। বুধবার সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে জেলা প্রশাসনকে মহাসড়কের সব অবৈধ কালেকশন পয়েন্ট উচ্ছেদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
‘ভাইপো ট্যাক্স’ কী?
তৃণমূল কংগ্রেসের শাসনামলে প্রতিবেশী রাজ্য থেকে পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করা ট্রাকচালক ও পরিবহন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বিভিন্ন স্থানে জোরপূর্বক টাকা আদায়ের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। মহাসড়কের পাশে বাঁশের ব্যারিকেড বসিয়ে অবৈধ চেকপোস্ট তৈরি করে চালকদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে। এই চাঁদাবাজিকে রাজনৈতিক মহলে ‘ভাইপো ট্যাক্স’ নামে আখ্যা দেওয়া হয়। বিজেপি ও বামপন্থী দলগুলো তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, যিনি পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাইপো, তাকে ঘিরেই এই শব্দটি ব্যবহার করে আসছিল।
বিজেপির অভিযোগ
বিজেপির অভিযোগ ছিল, রাজ্যের তোলাবাজি সিন্ডিকেটগুলোর সঙ্গে অভিষেকের প্রভাব ও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। নির্বাচনী প্রচারে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং অমিত শাহ বারবার ‘পিসি-ভাইপো’ জুটি উল্লেখ করে তৃণমূল নেতৃত্বের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও তোলাবাজির অভিযোগ তোলেন। বিজেপির ভাষ্য অনুযায়ী, রাজ্যে কোনও বড় কাজ বা প্রশাসনিক কার্যক্রম এগোতে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রভাব অপরিহার্য হয়ে উঠেছিল।
আসামের মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য
এ প্রসঙ্গে আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মাও অভিযোগ করেছিলেন, আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে চলাচলকারী ট্রাকচালকদের কাছ থেকে নিয়মিত ‘অভিষেক ট্যাক্স’ আদায় করা হতো। তার দাবি, পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়ার পেছনে এই অবৈধ আদায়ের বড় ভূমিকা ছিল।
মহাসড়কে চাঁদাবাজির চিত্র
ভারতের সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন মহাসড়ক—বিশেষ করে পশ্চিম বর্ধমান ও পুরুলিয়ার রুট—গত কয়েক বছরে ‘ডান্ডা ট্যাক্স’ ও ‘ভাইপো ট্যাক্স’-এর জন্য কুখ্যাত হয়ে ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, এসব এলাকায় প্রভাবশালী সিন্ডিকেট সদস্যরা লাঠিসোঁটা নিয়ে চেকপোস্ট নিয়ন্ত্রণ করত এবং টাকা না দিলে ট্রাকচালকদের ভয়ভীতি দেখানো হতো। ট্রাকচালকদের অভিযোগ, অনেক সময় টাকা না দিলে গাড়ির কাঁচ ভেঙে দেওয়া, টায়ার ফুটো করা কিংবা যানবাহনের ক্ষতি করার মতো ঘটনাও ঘটত। ফলে পণ্য পরিবহনে বিলম্বের পাশাপাশি চালকদের আয়েও বড় ধরনের প্রভাব পড়ছিল।
পরিবহন খাতে প্রভাব
পূর্ব ভারত, উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও বাংলাদেশের সঙ্গে সংযোগের গুরুত্বপূর্ণ করিডর হওয়ায় পশ্চিমবঙ্গ দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৫০ হাজার ট্রাক চলাচল করে। ফলে এই অবৈধ চাঁদাবাজি দীর্ঘদিন ধরেই পরিবহন খাতে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে ছিল।
বিজেপি সরকারের এই কঠোর পদক্ষেপ পরিবহন ব্যবসায়ী ও চালকদের মধ্যে স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছে বলে জানা গেছে। তবে তৃণমূল কংগ্রেস এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, তারা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে মিথ্যা প্রচারণা চালাচ্ছে।



