আশ্রয়হীনদের শেষ ঠিকানা ‘সাড়া মানবিক বৃদ্ধাশ্রম’
আশ্রয়হীনদের শেষ ঠিকানা সাড়া মানবিক বৃদ্ধাশ্রম

ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার হবিরবাড়ি গ্রামে নিরিবিলি পরিবেশে গড়ে উঠেছে ‘সাড়া মানবিক বৃদ্ধাশ্রম’। আশ্রয়হীন মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে এটি গড়ে তুলেছেন স্বপ্নবাজ সাইফুল মালেক, যিনি আব্দুল মালেক বা মালেক ভাই নামে পরিচিত। একসময় ঢাকায় পথশিশুদের নিয়ে কাজ করা মালেক জেলার ফুলপুর উপজেলার রামভদ্রপুর ইউনিয়নের গজন্দর গ্রামের বাসিন্দা হলেও ভালুকায় এই বৃদ্ধাশ্রম প্রতিষ্ঠা করেছেন।

বৃদ্ধাশ্রমে পরিচয়হীন ২৭ জন

২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বৃদ্ধাশ্রমে বর্তমানে ২২ জন বৃদ্ধ নারী ও ৫ জন বৃদ্ধ পুরুষ আছেন, যাঁরা সবাই পরিচয়হীন। এখন পর্যন্ত এখানে আসা ৫৭ জনের মধ্যে ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ঠিকানা পাওয়ার পর ১৩ জন পরিবারে ফিরে গেছেন।

মানসিক ভারসাম্যহীন মায়েদের সেবা

দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে সড়কের পাশে বা হাসপাতালে পরিচয়বিহীন অবস্থায় পড়ে থাকা মানসিক ভারসাম্যহীন মায়েদের এনে এখানে সেবা-শুশ্রূষা করে সুস্থ করে তোলার চেষ্টা করা হয়। সম্প্রতি বৃদ্ধাশ্রমে গিয়ে দেখা যায়, একজন কিশোরী ও একজন তরুণী বৃদ্ধদের সেবা করছেন। রান্নাবান্না ও অন্যান্য কাজ করছেন আরও এক নারী ও দুজন পুরুষ। সবাইকে গোসল করিয়ে বারান্দায় চেয়ারে বসানো হয়। কেউ চুপচাপ, কেউবা নিজের সঙ্গে কথা বলছেন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

রিপা আক্তারের করুণ কাহিনী

প্রায় চার বছর আগে ত্রিশাল থেকে রিপা আক্তার (৩০) নামের এক নারীকে আনা হয়। তিনি মা হয়েছেন, কিন্তু মাতৃত্বের স্বাদ পাননি। সন্তান জন্ম দেওয়ার পর মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। স্বামী শিশুসন্তানকে নিয়ে চলে যান। আবদুল মালেক জানান, রিপা যখন তার মায়ের পেটে ছিল, তখন তার বাবা সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। জন্মের তিন বছর পর মা অন্যত্র বিয়ে করেন। তিনি নানির বাড়িতে বড় হন এবং অল্প বয়সে মামারা তার বিয়ে দেন। সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মানসিক ভারসাম্য হারালে তাকে মামার বাড়ির জঙ্গলের ঝুপড়ি ঘরে রাখা হতো।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অষ্টমী রানী ও যশোদা বর্মণ

ষাটোর্ধ্ব অষ্টমী রানীকে দুই বছর আগে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে আনা হয়। তাঁর বাঁ পা ভাঙা ও পচন ছিল। দীর্ঘদিনের শুশ্রূষায় এখন তিনি হাঁটতে পারেন। স্বামী-সন্তানের কথা জিজ্ঞাসা করলে কিছু বলতে পারেন না, তবে বলেন, ‘এখানে খুব ভালো আছি।’ যশোদা বর্মণের বয়স প্রায় ৭০। প্রায় ৫ বছর আগে ভালুকা পৌর এলাকার একটি মন্দিরের পাশ থেকে পক্ষাঘাতগ্রস্ত অবস্থায় তাঁকে আনা হয়। এখন নিজে চলাফেরা করতে পারেন। তিনি জানান, স্বামী-সন্তান ও ভাই সবাই মারা গেছেন।

সেবিকার গল্প

বৃদ্ধাশ্রমের সূচনালগ্ন থেকে কাজ করছেন ২৪ বছর বয়সী জেরিন আক্তার (রিয়া)। ছোটবেলায় মায়ের মৃত্যুর পর ঢাকায় পথে পথে বেড়ে উঠেছেন। আবদুল মালেক তাঁকে রাস্তা থেকে তুলে এনে আশ্রয় দিয়েছেন। এখন বিয়ে করে সংসার করছেন। তিনি বলেন, ‘এখানে থাকা বৃদ্ধ মানুষগুলোকে গোসল করাই, খাবার দিই এবং তাদের প্রস্রাব-পায়খানা সবকিছু পরিষ্কার করি। আমার মা নেই। বৃদ্ধ মানুষগুলোকেই মা-বাবা মনে করে সেবা করি। এতে আমার কোনো কষ্ট হয় না।’

প্রতিষ্ঠাতার স্বপ্ন

আবদুল মালেক বেসরকারি সংস্থার কর্মী ছিলেন। ২০০৯ সালে পথশিশুদের নিয়ে কাজ শুরু করেন। ঢাকায় রেলস্টেশনে মানসিক ভারসাম্যহীন বৃদ্ধ মানুষ দেখে তাঁর মন বিচলিত হয়। ২০১৮ সালে ব্যক্তিগত অর্থায়নে ভাড়া বাড়িতে বৃদ্ধাশ্রমের কাজ শুরু করেন। তিন বছর পর বেসরকারি একটি সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা আবদুর রশিদ দুই একর জমি দান করেন। এখন পাঁচতলা ভিতের ওপর একতলা ভবনে কার্যক্রম চলছে।

পরিচালনা ও সমাজসেবা

মালেক জানান, তারা নিজেরাই দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ উদ্ধার করে আনেন। অনেক সময় বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশন, হাসপাতাল, সমাজসেবা কার্যালয় ও থানা থেকে পাঠায়। চিকিৎসার পর শরীরের পচন সারিয়ে তোলা হয়। পরিচালনার জন্য মানুষের কাছ থেকে কোনো টাকা নেওয়া হয় না। চার সদস্যের পরিচালনা কমিটির অর্থায়নে এটি পরিচালিত হচ্ছে। ভালুকা উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা রুবেল মন্ডল বলেন, কেন্দ্রটির এই মহতী কার্যক্রম অব্যাহত থাকুক এবং সমাজসেবা অধিদপ্তর সর্বদা তাদের পাশে আছে।