চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা: সমন্বয়হীন প্রকল্পেই মূল সমস্যা
চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা: সমন্বয়হীন প্রকল্পেই সমস্যা

চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা সমস্যা বহুদিনের। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যে বিপুল অর্থ ব্যয় করে একাধিক প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, সেগুলোর পরও স্থায়ী সমাধান আসেনি। এর প্রধান কারণ, সমস্যাটিকে সমন্বিতভাবে না দেখে ভিন্ন ভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে খণ্ডিতভাবে সমাধানের চেষ্টা করা হয়েছে। বর্তমানে সিডিএ, সিটি করপোরেশন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড—এই তিন সংস্থার অধীনে চারটি বড় প্রকল্প চলছে। কিন্তু এগুলো একক পরিকল্পনার অংশ না হয়ে আলাদা কাঠামোয় বাস্তবায়িত হচ্ছে। ফলে একটি প্রকল্পের কাজ অন্যটির সঙ্গে পুরোপুরি সংযুক্ত নয়।

সমন্বিত ড্রেনেজ নেটওয়ার্কের অভাব

জলাবদ্ধতা একটি সমন্বিত ড্রেনেজ নেটওয়ার্কের বিষয়। খাল, নালা, জলাধার, নদী, জোয়ার-ভাটা—সবকিছু একসঙ্গে কাজ করে। সেখানে যদি এক সংস্থা খাল খনন করে, আরেক সংস্থা ড্রেন তৈরি করে, কিন্তু তাদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় না থাকে, তাহলে পানিনিষ্কাশনের ধারাবাহিকতা ভেঙে যায়। বর্তমান প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রেও সেই সীমাবদ্ধতা দেখা যাচ্ছে।

পরিকল্পনার গলদ

এই প্রকল্পের গোড়ায় কিছু গলদ ছিল। নগরের চিহ্নিত ৭৪টি খালের মধ্যে মাত্র ৩৬টি খাল একটি প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। অন্য খালগুলো রয়ে গেছে অবহেলিত। ফলে পানি চলাচলের স্বাভাবিক পথ কোথাও না কোথাও আটকে যাচ্ছে। একইভাবে ১৯৯৫ সালের ড্রেনেজ মহাপরিকল্পনায় প্রস্তাবিত রিটেনশন পন্ড বা জলাধারগুলো বাদ দেওয়াও একটি বড় ভুল। অতিরিক্ত পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা না থাকলে খাল-নালা দ্রুত উপচে পড়বে—এটাই স্বাভাবিক। এখন দেখা যাচ্ছে, একদিকে খাল খনন করা হচ্ছে, অন্যদিকে জলাধার ও নিচু জমিগুলো হারিয়ে যাচ্ছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সমন্বয়হীনতার ফল

এবারের জলাবদ্ধতার ঘটনাও এই সমন্বয়হীনতার ফল। দুটি খাল সংস্কারকাজের জন্য আলাদা আলাদা জায়গায় অস্থায়ী বাঁধ রাখা হয়েছিল। এসব বাঁধ সময়মতো অপসারণ করা হয়নি। এতে পানি চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অপরিষ্কার নালা-নর্দমা এবং খালের ভেতরে জমে থাকা বর্জ্য। ফলে স্বল্প সময়ে ভারী বৃষ্টিতে পানি দ্রুত জমে গিয়ে দীর্ঘ সময় স্থির থেকেছে।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা

আরেকটি বড় সমস্যা হলো বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা। একদিকে খাল সংস্কার করা হচ্ছে, অন্যদিকে সেখানে নিয়মিত প্লাস্টিক, পলিথিন ও কঠিন বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। এতে অল্প সময়ের মধ্যেই খালের কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ড্রেনেজ ব্যবস্থাকে যদি বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত করা না যায়, তাহলে কোনো প্রকল্পই টেকসই হবে না।

জোয়ার-ভাটার প্রভাব

চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা জোয়ার-ভাটার সঙ্গেও সম্পর্কিত। জোয়ারের সময় খাল দিয়ে পানি নামা কঠিন হয়ে পড়ে। তখন রেগুলেটর ও পাম্পিং ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু বিভিন্ন প্রকল্পে এসব অবকাঠামো নির্মাণ হলেও তাদের সক্ষমতা ও সমন্বিত ব্যবহার নিয়ে এখনো স্পষ্ট ধারণা নেই।

রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি

সবচেয়ে বড় ঘাটতি রয়ে গেছে রক্ষণাবেক্ষণে। প্রকল্প শেষ হওয়ার পর খাল পরিষ্কার, সিল্ট অপসারণ, পাম্প পরিচালনা—এসব কাজ কে করবে, কীভাবে করবে, এই প্রশ্নগুলোর পরিষ্কার উত্তর নেই। তিন সংস্থা আলাদা আলাদা প্রকল্প করলেও একক কোনো পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ কাঠামো এখনো তৈরি হয়নি।

সমন্বিত সমাধানের প্রস্তাব

আমার দৃষ্টিতে, চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধান পেতে হলে সব প্রকল্পকে একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনতে হবে। প্রকল্পের বাইরে থাকা খালগুলো অন্তর্ভুক্ত করা, জলাধার পুনরুদ্ধার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা এবং জোয়ার-ভাটা বিবেচনায় পাম্পিং ব্যবস্থা কার্যকর করা—এই কাজগুলো একসঙ্গে করতে হবে। পাশাপাশি একটি শক্তিশালী ও একক রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থাও গড়ে তুলতে হবে।

এই সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি ছাড়া যত প্রকল্পই নেওয়া হোক, চট্টগ্রাম নগরের মানুষকে প্রতি বর্ষায় একই দুর্ভোগের মুখোমুখি হতে হবে। অবশ্য এ রকম নানা পরামর্শ আমরা প্রকল্প নেওয়ার শুরুতেই দিয়েছিলাম। এমনকি প্রথম আলোতে লিখেও জানিয়েছিলাম। কিন্তু কেউ কর্ণপাত করেনি। এবার কী হবে, তা দেখার বিষয়।