ভারতে মীর জাফরের ৩৪৬ বংশধর ভোটার তালিকা থেকে বাদ, নাগরিকত্ব প্রমাণে ট্রাইব্যুনাল
ভারতে মীর জাফরের বংশধররা ভোটার তালিকা থেকে বাদ

ভারতে মীর জাফরের ৩৪৬ বংশধর ভোটার তালিকা থেকে বাদ, নাগরিকত্ব প্রমাণে ট্রাইব্যুনাল

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের ঐতিহাসিক জেলা মুর্শিদাবাদে মীর জাফরের প্রায় ৩৪৬ বংশধরকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে দেশটির নির্বাচন কমিশন। এই সিদ্ধান্তের ফলে ১৫তম প্রজন্মের এই সদস্যদের এখন আইনি ট্রাইব্যুনালের সামনে নতুন করে তাদের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে হবে। জেলার লালবাগের ১২১ নম্বর বুথের সর্বশেষ সম্পূরক তালিকা প্রকাশের পর এই গণ-বর্জনের বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে।

বাদ পড়াদের তালিকায় বিশিষ্ট ব্যক্তিরা

বাদ পড়াদের তালিকায় ৮২ বছর বয়সী সৈয়দ রেজা আলী মির্জা এবং তার ছেলে সৈয়দ মোহাম্মদ ফাহিম মির্জার মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিরাও রয়েছেন। ফাহিম মির্জা তৃণমূল কংগ্রেসের একজন বর্তমান পৌর কাউন্সিলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, পরিবারের পক্ষ থেকে এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জমা পড়েনি। তবে ভুক্তভোগীরা দাবি করেছেন, তাদের ভারতীয় পরিচয় ঐতিহাসিকভাবে এবং আইনত নথিভুক্ত এবং ইতোপূর্বে সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক তা বৈধতা পেয়েছে।

লালবাগ ভোটার তালিকায় গণ-বর্জন

মুর্শিদাবাদের লালবাগ নব আদর্শ হাই স্কুলের চূড়ান্ত ভোটার তালিকা থেকে নবাব পরিবারের ৩৪৬ সদস্যের নাম নিখোঁজ পাওয়া গেছে। ‘ছোট নবাব’ হিসেবে পরিচিত সৈয়দ রেজা আলী মির্জা টাইমস অব ইন্ডিয়াকে জানিয়েছেন, শুনানিতে ব্যক্তিগতভাবে উপস্থিত হওয়া এবং কর্মকর্তাদের কাছ থেকে আশ্বস্ত হওয়া সত্ত্বেও তার পরিবারের ৯ সদস্যের নাম তালিকা থেকে মুছে ফেলা হয়েছে। তার ছেলে সৈয়দ মোহাম্মদ ফাহিম মির্জা জানান, এই বর্জনের কারণ সম্পর্কে তারা সম্পূর্ণ অন্ধকারে রয়েছেন, অথচ ২০০২ সাল থেকে তাদের নাম নিয়মিত তালিকায় ছিল।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ঐতিহাসিক নাগরিকত্বের দাবি ও আইনি নজির

পরিবারটি জোর দিয়ে বলছে, ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত এবং বিচারিক স্বীকৃতি—উভয় দিক থেকেই তাদের ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রতিষ্ঠিত। সৈয়দ রেজা আলী মির্জা বলেন, দেশভাগের সময় তার পূর্বপুরুষ ওয়াসিফ আলী মির্জা পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি হওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে ভারতে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। পরিবারটি আরও দাবি করেছে যে, স্বাধীনতার পর তিন দিনের জন্য মুর্শিদাবাদ পাকিস্তানের অংশ হিসেবে চিহ্নিত হলেও তাদের হস্তক্ষেপে এটি ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। সৈয়দ মোহাম্মদ ফাহিম মির্জা অতীত আইনি বৈধতার কথা উল্লেখ করে বর্তমান এই বর্জন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং জানান যে সুপ্রিম কোর্ট ইতোপূর্বে তাদের বংশধারাকে স্বীকৃতি দিয়েছে।

প্রশাসনিক প্রতিক্রিয়া ও ট্রাইব্যুনাল প্রতিকার

জেলা প্রশাসন জানিয়েছে যে, আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জমা পড়লে তারা প্রতিষ্ঠিত আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিষয়টি মোকাবিলা করতে প্রস্তুত। মুর্শিদাবাদের জেলা শাসক আর অর্জুন বলেন, নবাব পরিবারের পক্ষ থেকে নাম বাদ পড়ার বিষয়ে আমরা বড় কোনো অভিযোগ এখনও পাইনি। যদি পাই, তবে আমরা তাদের ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে প্রতিকার পাওয়ার পদ্ধতি সম্পর্কে নির্দেশনা দেব। তবে পরিবারটি আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যে, ২৩ এপ্রিল জেলায় ভোট হওয়ার আগে ট্রাইব্যুনাল প্রক্রিয়া শেষ হওয়া সম্ভব নাও হতে পারে, যা কার্যত ২০২৬ সালের নির্বাচনে তাদের অংশগ্রহণ বাধাগ্রস্ত করবে।

মুর্শিদাবাদের নবাবী বংশের প্রেক্ষাপট

ভুক্তভোগীরা মীর জাফরের বংশধর, যিনি ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধের পর বাংলার নবাব হয়েছিলেন। এই পরিবার বর্তমানে লালবাগের ঐতিহাসিক কেল্লা নিজামতের কাছে বসবাস করে, যা এক সময় বাংলা, বিহার, ওড়িশা শাসনকারী রাজবংশের ক্ষমতার কেন্দ্র ছিল। সম্প্রতি একটি ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধনী’ প্রক্রিয়ায় তাদের অবস্থাকে 'বিচারাধীন' হিসেবে রাখা হয়েছিল এবং পরবর্তীতে সম্পূরক তালিকায় নাম বাদ পড়ার বিষয়টি নিশ্চিত হয়।

এসআইআর কী এবং এর প্রভাব

ভারতের ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধনী’ বা এসআইআর হলো দেশটির নির্বাচন কমিশন কর্তৃক পরিচালিত ভোটার তালিকা হালনাগাদ করার একটি গভীর ও ব্যাপক প্রক্রিয়া। সাধারণ বার্ষিক সংশোধনের তুলনায় এটি অনেক বেশি পুঙ্খানুপুঙ্খ, যেখানে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের তথ্য যাচাই করা হয়। এর মাধ্যমে মূলত ভারতের সংখ্যালঘু মুসলিমদের টার্গেট করা হচ্ছে বলে ব্যাপক অভিযোগ আছে এবং যাদের ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে তারা প্রায় সবাই মুসলিম।

২০২৬ সালের মার্চ মাসের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দিয়ে মুর্শিদাবাদের বহু নাগরিককে 'বিচারাধীন' রাখা হয়েছে, যেখানে অধিক সংখ্যক মুসলিম বসবাস করেন। মুর্শিদাবাদে প্রায় ১১ লাখ ১ হাজার ১৪৫ ভোটারের নাম 'বিচারাধীন' তালিকায় রাখা হয়েছে। এর অর্থ হলো তাদের নথিপত্র বর্তমানে বিচার বিভাগীয় পর্যবেক্ষণে রয়েছে এবং আইনি ছাড়পত্র না পাওয়া পর্যন্ত তারা ভোট দিতে পারবেন না।

সরকারিভাবে ধর্মীয় ভিত্তিতে কোনো তালিকা প্রকাশ না করা হলেও তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই প্রক্রিয়ার প্রভাব মুসলিম প্রধান জেলাগুলোতে সবচেয়ে বেশি পড়েছে। মুর্শিদাবাদ, মালদহ ও উত্তর দিনাজপুরের মতো সংখ্যালঘু (বিশেষত মুসলিম) অধ্যুষিত জেলাগুলোতেই বিচারাধীন ভোটারের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এছাড়া এসআইআরের আওতায় পশ্চিমবঙ্গে মোট ৬১ লাখ ৭৮ হাজার নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে শুধু মুর্শিদাবাদেই নাম বাদ পড়ার হার প্রায় ৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ।