নেপালে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করছে রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি
নেপালে এ সপ্তাহেই নতুন সরকার দায়িত্ব নিতে যাচ্ছে, যেখানে রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি) দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করবে। সদ্য শেষ হওয়া সাধারণ নির্বাচনে ২৭৫ সদস্যের ‘প্রতিনিধি সভা’য় তাদের সদস্য সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৮২ জনে, যা একটি সুপার মেজরিটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
নেপালের মিশ্র নির্বাচনী পদ্ধতি
নেপালের নির্বাচনী ব্যবস্থা একটি অনন্য মিশ্র পদ্ধতি অনুসরণ করে, যেখানে ভোটাররা দুটি ব্যালট পেপার ব্যবহার করেন। প্রথম ব্যালটে তারা এলাকাভিত্তিক প্রার্থীদের ভোট দেন, যার মাধ্যমে ১৬৫ জন এমপি সরাসরি নির্বাচিত হন। দ্বিতীয় ব্যালটে ভোটাররা জাতীয় দল হিসেবে তাদের পছন্দের দলকে নির্বাচন করেন, যা থেকে বাকি ১১০ জন এমপি সংখ্যানুপাতিক হিসাবে নির্বাচিত হন।
এই নির্বাচনে আরএসপি সরাসরি ভোট পেয়েছে ৪৪ শতাংশ, অন্যদিকে জাতীয় দল হিসেবে পছন্দের ভোট পেয়েছে প্রায় ৪৮ শতাংশ। এটি নির্দেশ করে যে, বিভিন্ন আসনে তাদের প্রার্থীরা যত ভোট পেয়েছেন, তার চেয়েও বেশি মানুষ তাদের ভোট দিয়েছেন জাতীয়ভিত্তিক দল হিসেবে। বিপরীতে, বিরোধী নেপালি কংগ্রেসের প্রার্থীরা প্রার্থীভিত্তিক ভোট পেয়েছে ১৯ শতাংশ, কিন্তু জাতীয় দল হিসেবে পেয়েছে মাত্র ১৬ শতাংশ।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রাসঙ্গিকতা
নেপালের ভোটারদের এ রকম বিচিত্র পছন্দের সুযোগ দেখে বাংলাদেশের গণ-অভ্যুত্থানের সময় নির্বাচনী ব্যবস্থার পরিবর্তন তথা সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতি নিয়ে উঠে আসা বিতর্কের কথা স্মরণ করা যায়। তখন এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধবাদীরা বলতেন, সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতে ঝুলন্ত পার্লামেন্ট হয় এবং সরকার গঠনের বেলায় নানা দলের টানাপোড়েনে পড়ে দেশ।
কিন্তু নেপালে মিশ্র ব্যবস্থায় আরএসপি কেবল সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নয়, পার্লামেন্টে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আসন তথা সুপার মেজরিটি পেয়েছে। এককভাবেই তারা সরকার গঠন করতে পারবে এবং চাইলে পুরো মেয়াদ একাই নির্বিঘ্নে চালিয়ে নিতে পারবে দেশকে। ভোট পদ্ধতির সঙ্গে রাজনৈতিক বা সরকার গঠনজনিত অস্থিতিশীলতার যে চিরস্থায়ী কোনো সম্পর্ক নেই, সেটাই দেখা যাচ্ছে এখানে।
প্রতিনিধিত্বশীলতার গুরুত্ব
অন্যদিকে, সংখ্যানুপাতিক ব্যবস্থা থাকায় নেপালে আসনভিত্তিক নির্বাচনে আরএসপির জোয়ারের মধ্যেও অন্য কয়েকটি দল পার্লামেন্টে স্বাস্থ্যকর উপস্থিতি বজায় রাখতে পেরেছে। এমনও ঘটেছে যে, একটি দল মূল ভোটে একটি আসন পেয়েছে, কিন্তু দ্বিতীয় ব্যালটের হিসাবে আরও চারটি আসন পেয়ে পার্লামেন্টে তাদের পাঁচজন এমপি হয়েছেন এখন।
নেপালিরা মিশ্র পদ্ধতি রেখেছে পার্লামেন্টে সর্বোচ্চসংখ্যক ভোটারের জনপ্রতিনিধিকে নিয়ে আসার জন্য। তারপরও এবার নির্বাচনে অংশ নেওয়া ৬৪টি দলের মধ্যে কেবল ছয়টি দলের উপস্থিতি থাকছে পার্লামেন্টে, কারণ নিয়ম অনুযায়ী ৩ শতাংশের কম ভোট পাওয়ায় অন্য দলগুলো কোনো আসন পাচ্ছে না। এই অভিজ্ঞতা নেপালের নির্বাচনী ব্যবস্থায় আরও উদারনৈতিক সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতির প্রয়োজনীয়তার কথা বলে।
বাংলাদেশের নির্বাচনী ফল বিশ্লেষণ
নেপালের এসব অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থার সংস্কার বিষয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলের তিক্ত বিতর্ক স্মরণ করা যায়। বাংলাদেশের নির্বাচনী ফল বিশ্লেষণ করলে প্রথমেই যেটা চোখে পড়ে, ‘বিজয়ী’রা (যে দলেরই হোন না কেন) আসনভিত্তিক মোট ভোটারের সংখ্যালঘু একাংশের প্রতিনিধিত্ব করছেন। প্রদত্ত বৈধ ভোটারদের বিশাল একাংশের সংসদে কোনো প্রতিনিধিই থাকছেন না।
উদাহরণস্বরূপ, ময়মনসিংহ-১ থেকে ময়মনসিংহ-৫ পর্যন্ত আসনগুলোর ফলাফলে দেখা যায়, সেখানে ভোটারসংখ্যা ছিল মোট ২৪ লাখ ৪১ হাজার ৩৮২। বিজয়ী প্রার্থীরা পেলেন তার মাত্র ২৬ শতাংশ (৬ লাখ ৩৮ হাজার ৩৫৩ ভোট)। এই পাঁচ আসনে প্রদত্ত বৈধ ভোট ছিল ১৩ লাখ ৬০ হাজার ৬৮৫, যার মধ্যে বিজয়ীরা পেয়েছেন ৪৭ শতাংশ। অর্থাৎ প্রদত্ত বৈধ ভোটেরও সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ তাঁরা পাননি, যা আমাদের নির্বাচনী ব্যবস্থার একটি ত্রুটি নির্দেশ করে।
দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপট
শ্রীলঙ্কাও নির্বাচনী ব্যবস্থাকে প্রতিনিধিত্বশীল করতে অনেক সংস্কার করেছে এবং সেখানেও একধরনের মিশ্র পদ্ধতিতে নির্বাচন হচ্ছে, যা সংসদকে অনেক বেশি প্রতিনিধিত্বশীল করে তুলেছে। গত চার বছরে দক্ষিণ এশিয়ায় গণ-অভ্যুত্থান হওয়া তিন দেশেই প্রধান একটা প্রত্যাশা ছিল জনস্বার্থে প্রয়োজনীয় রাষ্ট্র সংস্কার।
নেপাল ও শ্রীলঙ্কায় নির্বাচনী ব্যবস্থা যেহেতু আগেই অনেকখানি সংস্কার করা ছিল, সেই সূত্রে তারা এখন অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কারে মনোযোগী হচ্ছে। বাংলাদেশের বেলায় ঐকমত্য কমিশনের বিতর্কে বন্দী হয়ে গেছে অভ্যুত্থানের অনেক প্রত্যাশা, যদিও নতুন সরকার চাইলে নতুন সংসদে জনস্বার্থে নির্বাচনী ব্যবস্থাকে আরও প্রতিনিধিত্বশীল করতে আলাপ তুলতে পারে।
নেপালের নির্বাচনী ফল দেখে বোঝা যায়, ভবিষ্যৎ নির্বাচনে তাদের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার যে মোটেই কোনো ঝুঁকি নেই, তা একটি মোটাদাগের নজির। অন্যদিকে, নির্বাচনী ব্যবস্থা যদি ক্রমেই পরিবর্তনের ধারক না হয়ে ওঠে এবং বর্তমান ধাঁচের নির্বাচন ও সংসদের ওপর কাঠামোগত কারণেই জনগণ যদি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে, তাহলে শাসক সমাজের জন্য প্রকৃতই দূরবর্তী বিপদ আছে।
স্থিতিশীলতার বুদবুদের বাইরে এসে নীতিনির্ধারকদের দূরদর্শী হওয়ার তাগিদ বইছে দক্ষিণ এশিয়ার বাতাসে, যেখানে নতুন প্রজন্ম স্থিতিশীলতার মোহ অতিক্রম করে পরিবর্তন চাইছে। পাঁচ বছর আগেও দক্ষিণ এশিয়া জানত না কী ধরনের রক্তাক্ত গণ-অভ্যুত্থান আসছে, এবং একইভাবে ধারণা করা কঠিন যে, অর্থবহ পরিবর্তন না হলে গণ-অভ্যুত্থানকারী জনতা পরের পাঁচ বছর পর কী চেহারা নেবে।



