পশ্চিমবঙ্গে ভোটযুদ্ধের প্রস্তুতি: ইভিএম নিয়ে কর্মকর্তাদের যাত্রা, নিরাপত্তায় আধা সামরিক বাহিনীর ব্যাপক মোতায়েন
পশ্চিমবঙ্গে ভোটযুদ্ধ: ইভিএম নিয়ে কর্মকর্তাদের যাত্রা, নিরাপত্তায় আধা সামরিক বাহিনী

পশ্চিমবঙ্গে ভোটযুদ্ধের প্রস্তুতি: ইভিএম নিয়ে কর্মকর্তাদের যাত্রা শুরু

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম দফা আগামীকাল বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। রাজ্যে রীতিমতো ‘যুদ্ধের মতো’ পরিস্থিতি বিরাজ করছে। ভোট ঘিরে কেন্দ্রীয় আধা সামরিক বাহিনীর হাজার হাজার নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। জাতীয় নির্বাচন কমিশন প্রতিদিন নতুন নতুন নিষেধাজ্ঞা জারি করছে, যা নিয়ে বাংলার সমাজ ও ভোটার স্পষ্টতই বিভক্ত হয়ে পড়েছে। রাজ্যের রাজনীতিতে তীব্র মেরুকরণ ঘটেছে।

উত্তরবঙ্গের পার্বত্য অঞ্চল থেকে দক্ষিণবঙ্গের সমতল: ভোটের বিস্তার

এ অবস্থায় উত্তরবঙ্গের পার্বত্য অঞ্চল থেকে দক্ষিণবঙ্গের সমুদ্রঘেঁষা সমতল পর্যন্ত বিধানসভার ২৯২ আসনের মধ্যে ১৬ জেলার ১৫২ আসনে নির্বাচন হতে চলেছে আগামীকাল বৃহস্পতিবার। দ্বিতীয় দফায় ২৯ এপ্রিল বাকি ১৪২ আসনে ভোট হবে। ফল ঘোষণা করা হবে ৪ মে। প্রথম দফায় যে রাজ্যের ১৬ জেলায় ভোট হবে, তার মধ্যে রয়েছে দার্জিলিং ও দার্জিলিং–সংলগ্ন পার্বত্য অঞ্চল। এর মধ্যে পড়েছে প্রধানত পাঁচ জেলা—কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ি, কালিম্পং ও দার্জিলিং। এই পাঁচ জেলায় মোট আসনসংখ্যা ২৭।

এই পাঁচ জেলা তৃণমূল কংগ্রেসের দুর্বলতম জায়গা হিসেবে বিবেচিত। সর্বশেষ ২০২১ সালের নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস এই অঞ্চলে ২৭ আসনের মধ্যে মাত্র ৫টি পেয়েছিল। অন্যদিকে এই অঞ্চলকে বিজেপির দুর্গ বলা যেতে পারে। কারণ, গতবার ২৭ আসনের মধ্যে বিজেপি পেয়েছিল ২১টি, পাহাড়ের দল গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার বিচ্ছিন্ন এক গোষ্ঠী পেয়েছিল একটি আসন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

রাজনৈতিক বিশ্লেষণ: উত্তরবঙ্গের চা-বাগান অঞ্চল

রাজনীতি পর্যবেক্ষক রূপম দেব বলছেন, উত্তরবঙ্গের চা-বাগান অঞ্চলে দুই দলেরই কিছু সুবিধা-অসুবিধা আছে। তিনি বলেন, ‘মানুষের মধ্যে প্রতিবারের মতোই বিজেপিকে ভোট দেওয়ার জোঁক আছে। কারণ, কলকাতার বিরুদ্ধে সব সময়ই পাহাড়ে বৈষম্যমূলক আচরণের বোধ থাকে। আবার এটাও ঠিক, বিজেপিকে এখানে মানুষ ধারাবাহিকভাবে ভোট দিলেও তারা কী করেছে, কত দরিদ্র মানুষকে সহায়তা করেছে, সেটা একটা বড় প্রশ্ন।’

রূপম মনে করেন, ৫ জেলার প্রায় ১০টি চা–বাগানের শ্রমিকদের রোজ মজুরি তৃণমূল অন্তত ৩০ টাকা বৃদ্ধি করলে সেখানকার ভোট তাদের পক্ষে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতো। আসামের চা–বাগানে কী হচ্ছে, তার দিকে দার্জিলিং ও ডুয়ার্সের চা-শ্রমিকেরা নজর রাখেন। আসামে নির্বাচনের আগে চা-শ্রমিকদের ৩০ টাকা মজুরি বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু তৃণমূল বলছে, নির্বাচনের পর বাড়ানো হবে। এতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

মধ্যবাংলার চিত্র: মুর্শিদাবাদের গুরুত্ব

মধ্যবাংলার চার জেলা—উত্তর দিনাজপুর, দক্ষিণ দিনাজপুর, মালদা ও মুর্শিদাবাদ। এই অঞ্চলে তৃণমূল অপেক্ষাকৃত বেশ শক্তিশালী। চার জেলায় মোট ৪৯ আসনের মধ্যে তৃণমূল গতবার জিতেছিল ৩৬টি, বিজেপি জিতেছিল ১১টিতে। দুটিতে ভোট হয়নি।

মুর্শিদাবাদের অবস্থা সম্পর্কে এক প্রবীণ সাংবাদিক বলেন, তৃণমূল আগেরবার মুর্শিদাবাদের ২২ আসনের মধ্যে ২০টি পেয়েছিল। এবার আসনসংখ্যা কমার যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছে। মুর্শিদাবাদে বুধবার ভোর পর্যন্ত ভোটার তালিকা থেকে ৭ লাখ ৪৮ হাজার ৯৫৯ জন বাদ পড়েছে। এই হার মোট ভোটারের ১৫ শতাংশ। ধরে নেওয়া হচ্ছে, এঁরা তৃণমূলেরই ভোটার। এ কারণে এবার মুর্শিদাবাদে প্রধানমন্ত্রীসহ বিজেপির সব বড় নেতা গেছেন।

দক্ষিণবঙ্গের অবস্থা: বিজেপির চ্যালেঞ্জ

দক্ষিণবঙ্গের সাতটি জেলায় ভোট হতে চলেছে আগামীকাল। এসব জেলা হচ্ছে পূর্ব মেদিনীপুর ও পশ্চিম মেদিনীপুর, পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, পশ্চিম বর্ধমান, ঝাড়গ্রাম ও বীরভূম। এখানে রয়েছে ৭৬টি আসন। এই অঞ্চলের ৭৬টি আসনের মধ্যে ২০২১ সালে তৃণমূল ৪৯টি আসন পেয়েছিল, বিজেপি পেয়েছিল ২৭টি।

পূর্ব মেদিনীপুর জেলার মিষ্টির ব্যবসায়ী অনিন্দ্য প্রধান বলেন, ‘বিজেপি এবার অনেক গুছিয়ে প্রচার চালাচ্ছে। শুভেন্দুর জন্য এই অঞ্চলটা ‘প্রেস্টিজ ফাইট’। কারণ, অনেকেই মনে করছেন, বিজেপি জিতলে তিনিই হবেন মুখ্যমন্ত্রী। এটা তাঁর অঞ্চল। এখানে তাঁকে বড় কিছু করতে হবে।’

আধা সামরিক বাহিনীর ব্যাপক মোতায়েন

এবারের নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে যে পরিমাণে কেন্দ্রীয় আধা সামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে, তা স্বাধীনতার পর কখনো হয়নি। পশ্চিমবঙ্গে প্রথম দফার নির্বাচনে ২ হাজার ৪০৭ কোম্পানি আধা সামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে বলে জানিয়েছে কলকাতার পত্রিকা ‘দ্য টেলিগ্রাফ’। এর অর্থ, মোটামুটিভাবে আড়াই লাখ কেন্দ্রীয় বাহিনী প্রথম দফার নির্বাচনে নির্বাচনী কেন্দ্র এবং বুথে থাকবে।

নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ১৫২টি বিধানসভা আসনের জন্য মোট ২ হাজার ১৯৩টি ‘কুইক রেসপন্স টিম’ পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি থাকবে মুর্শিদাবাদে। সেখানে থাকবে ২৮৮টি কুইক রেসপন্স টিম। এরপরই সবচেয়ে বেশি এ ধরনের বাহিনী থাকবে শুভেন্দু অধিকারীর জেলা পূর্ব মেদিনীপুরে, ২৫৩টি।

রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও ভোটারদের উদ্বেগ

মহারাষ্ট্রের শিবসেনা দলের প্রধান উদ্ধব ঠাকরে বলেছেন, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাঘিনীর মতো লড়ছেন। কিন্তু দেখেশুনে যা মনে হচ্ছে, তাতে নির্বাচনের দিনে পশ্চিমবঙ্গে ভোটারদের থেকে বেশি নিরাপত্তাকর্মী থাকবে। এ অবস্থায় কীভাবে ভোটাররা বাড়ি থেকে বেরিয়ে নির্ভয়ে ভোট দেবেন, সেটা আমার প্রশ্ন।’ এই মুহূর্তে সেই প্রশ্ন প্রথম দফার ৩ কোটি ৬০ লাখ ভোটারেরও।